সমকামী যৌনতা কি অপরাধ? পুনর্বিবেচনা করবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption দিল্লিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

ভারতীয় দন্ডবিধির যে ৩৭৭ ধারা সমকামী যৌনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, সেই ধারাটির বৈধতাই পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট আজ ঘোষণা করেছে।

ব্রিটিশ জমানার এই বিতর্কিত আইনটির সুবাদে 'অপ্রাকৃতিক যৌনতা'র অপরাধে ভারতে কোনও ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদন্ড পর্যন্ত হতে পারে, তবে সুপ্রিম কোর্ট এখন বলছে অধিক সংখ্যক বিচারপতির এক সাংবিধানিক বেঞ্চ এখন এটি খতিয়ে দেখবেন।

ভারতে সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গভুক্তদের অধিকার অর্জনের জন্য যারা আন্দোলন করছেন, তারা সুপ্রিম কোর্টের এদিনের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছেন - তবে ৩৭৭ ধারা বিলোপ করার প্রশ্নে ভারতে বর্তমান সরকারের কী ভূমিকা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ভারতে এলজিবিটি শ্রেণীভুক্ত পাঁচজন ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা তাদের আবেদনে বলেছিলেন, ভারতীয় দন্ডবিধির সেকশন ৩৭৭ এমন একটি আইন যে কারণে সব সময় তাদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হয় - কারণ তাদের যৌনতার দোহাই দিয়ে পুলিশ যখন খুশি তাদের গ্রেফতার করতে পারে।

সেই পিটিশনের শুনানিতেই প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র-র নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ বিষয়টি সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী আনন্দ গ্রোভার মনে করছেন, বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানি হলে রায় অবশ্যই তাদের পক্ষে আসবে। দেড়শো বছরেরওে বেশি পুরনো এই আইনের বিরুদ্ধে তারা আরও দু-এক বছর লড়তে প্রস্তুত বলেও জানাচ্ছেন তিনি।

আর যেহেতু এই সুপ্রিম কোর্টই সম্প্রতি ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে - তাই ৩৭৭ ধারা বিলোপের প্রশ্নে তাদের সওয়ালও অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে থাকবে বলেই তার অভিমত।

সুপ্রিম কোর্টের এদিনের পর্যবেক্ষণে ভারতে এলজিবিটি সম্প্রদায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন ঠিকই - আর এই আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় মুখ আদিত্য ব্যানার্জি মনে করছেন এখান যে বিচারপতিদের মানসিকতার যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে সেটাই আসলে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

মিরপুর স্টেডিয়াম কি নিষিদ্ধ হবার শঙ্কা আছে?

বাংলাদেশে তাপমাত্রা নেমে এসেছে তিন ডিগ্রিরও নীচে

শিক্ষকদের হাতে বেদম মার খেলেন অভিভাবক

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতের ব্যাঙ্গালোর শহরে সমকামী অধিকারকর্মীদের একটি মিছিল

তার কথায়, "এর আগেও সুপ্রিম কোর্ট পাঁচজন বিচারপতিকে নিয়ে এ বিষয়ে একটি বেঞ্চ গড়ার কথা বলেছিল, কাজেই আজ তাদের বক্তব্য একেবারে নতুন কিছু নয়। তবে এদিন বিচারপতিদের বক্তব্যগুলো থেকে সুপ্রিম কোর্টের যে মুড টের পাওয়া যাচ্ছে সেটা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক!"

সুপ্রিম কোর্ট এদিন অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারকেও এ ব্যাপারে তাদের মতামত জানাতে বলেছে। এদিকে বিজেপি নেতা ও এমপি সুব্রহ্মণ্যম স্বামী এদিনও বলেছেন, সমকামিতাকে উদযাপন করার মতো কিছু আছে বলে তারা মনে করেন না।

মি স্বামী বলছেন, "আমি মনে করি সমকামিতা একটি জিনগত ত্রুটি এবং এটা কোনও স্বাভাবিক জিনিস নয়। তবে যারা এই ত্রুটি নিয়ে জন্মেছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনও বৈষম্য কাঙ্ক্ষিত নয়, চাকরি বা সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চিত করাও উচিত নয়।"

"তবে তাই বলে সমকামিতা সেলিব্রেট করা বা ফলাও করে দেখানো, গে বার খোলার দাবি জানানো এগুলো অবশ্যই অপরাধের সামিল!"

বস্তুত দেশের ভিতরে ও বাইরে গত কয়েক বছরে বর্তমান বিজেপি সরকার সমকামীদের অধিকারের প্রশ্নে যে ধরনের ভূমিকা রেখেছে তাতে এলজিবিটি আন্দোলন তাদের কাছ কিছু আশা করে না বলেই বলছিলেন আদিত্য ব্যানার্জি।

তার কথায়, "ভারতে ক্ষমতাসীন দল এ ব্যাপারে বারে বারে যে দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দিয়েছে তাতে আমরা কিছুতেই আশাবাদী হতে পারছি না।"

বিভিন্ন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলছিলেন, সমকামীদের নিয়ে অধিকার নিয়ে কংগ্রেস এমপি শশী থারুরের আনা বিলটি যেভাবে পার্লামেন্টে পেশই করতে দেওয়া হয়নি, জাতিসংঘ বা অন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত যেভাবে এলজিবিটি অধিকারের বিরুদ্ধে বারবার ভোট দিয়েছে বা সম্প্রতি পার্লামেন্টে আনা ট্রান্সজেন্ডার বিলটিকেও ৩৭৭ ধারার আওতাতেই রাখা হয়েছে তাতে এ বিষয়ে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট!

ফলে ৩৭৭ ধারা অচিরেই বিলুপ্ত হতে পারে বলে ভারতে সমকামী বা তৃতীয় লিঙ্গভুক্তরা যে আশা করছেন তার পুরোটাই নিহিত আছে দেশের বিচারবিভাগের ওপর - যেখানে সুপ্রিম কোর্ট নিজেরাই তাদের পাঁচ বছরের পুরনো রায় পুনর্বিবেচনা করতে যাচ্ছেন।

কিন্তু দেশে যে রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী দলটি এখন ক্ষমতায়, সেই বিজেপির ওপর তাদের এ ক্ষেত্রে ভরসা রাখার কোনও কারণ নেই।

সম্পর্কিত বিষয়