ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ক্যান্সার

মালবী গুপ্ত ছবির কপিরাইট মালবী গুপ্ত

এ কোন অতলান্তিক অন্ধকারে আমরা ডুবে যাচ্ছি! যখন তার হামাগুড়ি দেবার বয়স, যখন তার টলমলে পায়ে সদ্য হাঁটতে পারার বয়স, যখন মায়ের কোল ছেড়ে প্রথম ঘরের বাইরে গুটি গুটি পায়ে নার্সারিতে যাবার বয়স, ঠিক তখনই তার শরীরে বসে যাচ্ছে যৌন নির্যাতনের হিংস্র থাবা।

যে থাবার বিষাক্ত নখরে ছিঁড়ে যাচ্ছে তার সুকোমল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। যে থাবায় ক্ষত বিক্ষত যৌনাঙ্গের রক্তে ভেসে যাচ্ছে যন্ত্রণা দীর্ণ ছোট্ট শরীর, মন, তার অপাপবিদ্ধ শৈশব!

কোয়েম্বাটর থেকে কলকাতা, দিল্লি থেকে মুম্বাই ভারতের যে কোনও শহরে, যে কোনও প্রান্তে যৌন হিংসার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না দুধের শিশুরাও।

প্রত্যহ শিউরে উঠছি পাঁচ, চার, তিন বছরের এমনকি আট মাসের শিশুকন্যারও যৌন অত্যাচারের শিকার হওয়া, সেই নিষ্ঠুর অনিবার্যতা তাদের অনেকেরই কচি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার খবরে।

ভয় পাচ্ছি এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলির বেশির ভাগই ঘরের অন্দরে, স্কুলের মধ্যে তথাকথিত 'নিরাপদ' আশ্রয়ে ঘটছে জেনে। ভয় পাচ্ছি অতি পরিচিত, নিকট আত্মীয়, কখনও বা পরিবারেরই বয়স্ক সদস্যদের দ্বারা ঘটছে বলে।

ছবির কপিরাইট MONEY SHARMA
Image caption নিত্য ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ: সুপ্রিম কোর্টের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন দিল্লি কমিশন ফর উইমেন'র চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়াল ।

শিশুদের যৌন লালসার শিকার হওয়া একদম নতুন ঘটনা নয় জানি। সেই দূর অতীতেও তা ঘটত। তবে বেশিরভাগই একান্নবর্তী পরিবারে কদাচিৎ ঘটে যাওয়া সেই অন্যায় অপরাধ অন্দরমহলেই চাপা থাকত।

পরবর্তীতে একক পরিবারেও বাবা মা'রা সন্তানদের কাছে কখনও এই ধরনের অভিযোগ শুনলে তাদের বকে ধমকে থামিয়ে দিচ্ছেন, তারা ভুল ভাবছে, তেমন কিছুই ঘটে নি বলে।

এভাবেই অসহায় শিশুদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে অভিভাবকদের তর্জন গর্জনের নীচে। এভাবেই সত্যের দিকে তাঁরাও পিছন ফিরেই থাকছেন।

অথচ সংবাদ মাধ্যম অহরহ আমাদের জানাচ্ছে, দেশের নানা জায়গায় প্রতিদিন অরক্ষিত শিশুর ওপর ঘটে যাওয়া বীভৎস সব যৌন অত্যাচারের খবর।

সম্প্রতি দেখছি দিল্লিতে এমনকি দেড় বছর ও আঠেরো মাসের শিশুও একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ব্যাঙ্গালোরে ছয় বছরের শিশু তার ৩৭ বছরের শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষিত, ৬৩ বছরের শিক্ষক ধর্ষণ করেছে তার আট বছরের ছাত্রীকে।

তালিকা দীর্ঘ না করেও সাম্প্রতিক ঝাড়খণ্ডের ঘটনাটি স্মরণ না করলেই নয়। সেখানে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ৬৭ বছরের প্রিন্সিপাল সাত বছরের একটি মেয়েকে যৌন নিগ্রহের কথা স্বীকার করেছেন।

তবে 'বৃদ্ধ বলে শিশুটির সঙ্গে কোনও সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স হয়নি' বলেও দাবি করেছেন। দাবি করেছেন, 'এটা একটা দুর্ঘটনা', 'এটা কোনও বড় ভুলই নয়।'

ছবির কপিরাইট NOAH SEELAM
Image caption ভারতে সামাজিক প্রতিবাদে সত্ত্বেও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন বেড়েই চলছে।

আবার কলকাতার দুটি নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মধ্যে দুই শিক্ষক ও স্কুলকর্মী দ্বারা সদ্য ঘটে যাওয়া তিন ও চার বছরের দুই শিশুকন্যার ওপর যৌন নির্যাতনের কথা স্কুল কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে।

এটা এখন অকথিত সত্য যে, বহু শিশু প্রায়শই স্কুলে যৌন হিংসার শিকার হয়। তবে এই ধরনের অপরাধকেও ব্যক্তিগত ভাবে, কখনও ইনস্টিটিউশনগত ভাবে অস্বীকার বা তুচ্ছ করে দেখার প্রবণতা, আসলে কিন্তু তাকে স্বীকৃতি দেবারই নামান্তর।

অবশ্য কলকাতায় এই নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়া হাজার হাজার অভিভাবকের রাস্তায় নেমে আন্দোলনের ফলে স্কুল শেষ পর্যন্ত নির্যাতনকারীদের প্রতি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।

আমার মনে হচ্ছে, বাবা মা'দের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।

এতদিন সন্তানদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যে ঘটনাকে তাঁরা সত্য বলে মানতে চান নি, যাকে বোতলবন্দী করে রাখতে চেয়েছেন, সেই সত্যই আজ দৈত্য হয়ে বেরিয়ে এসেছে। ঢুকে গেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

আগে যা কদাচিৎ খুব নিভৃতে, খুব গোপনে ঘটত, আজ দেখছি দেশে প্রতি দুটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুই এই যৌন হিংসার শিকার। শুধু তাই নয়, হিংসাকারীরা বুক ফুলিয়ে বলতেও পারছে - এটা ততও অপরাধ নয়!

আমরা জানি দেশের রাজধানীর গায়ে এখন 'ধর্ষণের রাজধানী'র তকমা এঁটে গেছে। সেখানে প্রতিকারহীন নিত্য ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ, 'দিল্লি কমিশন ফর উইমেন'র চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়াল তো রাতের পর রাত পথে ঘাটে, পাবলিক টয়লেটে, রেল স্টেশনে, থানায় টহল দিয়ে ফিরছেন মেয়েদের নিরাপত্তার হালহাকিকত দেখতে।

তাঁর অভিজ্ঞতা, এই শহরের প্রায় প্রতিটি শিশু কন্যা ও বালিকা নিরাপত্তার অভাবে এতটাই ভীত, সন্ত্রস্ত যা তাঁর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। শেষপর্যন্ত মিজ মালিওয়াল সেখানে সদ্য ঘটে যাওয়া দেড় ও সাত বছরের শিশু কন্যার ধর্ষণকারীকে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবিতে গত ৩ নভেম্বর সত্যাগ্রহ শুরু করেন।

আবার ১৮ মাসের একটি শিশু ধর্ষিত হওয়ায় গত ১৪ নভেম্বর শিশু দিবসেই অসাড়, বধির প্রশাসনের ঘুম ভাঙাতে ইউনিয়ন হোম মিনিস্টারের বাড়ির সামনে ধর্ণায় বসে পড়েন স্বাতী মালিওয়াল।

কিন্তু মনে হচ্ছে, শুধু যৌন ক্ষুধা চরিতার্থের জন্য এমনকি দুধের শিশুর ওপরও যে বল্গাহীন নিষ্ঠুর আচরণ, তার প্রতিবিধানে সমাজ, সরকার এত উদাসীন কেন? মনে হচ্ছে যে ট্রমা নিয়ে ওই নির্যাতিত শিশুরা বড় হবে, ভবিষ্যতে পারিবারিক, সামাজিক সম্পর্কগুলিকে কি তারা বিশ্বাস করতে পারবে? সম্মান করতে পারবে? সেই সম্পর্কগুলিতে শেষাবধি তাদের কোনও আস্থা জন্মাবে কি?

যদিও সাম্প্রতিক প্রতিবাদ আন্দোলনে কিছুটা হলেও আশা জাগছে। মনে হচ্ছে, এই শিশুদের ওপর নির্মম অত্যাচারের রক্তের দাগ যে আমাদের প্রত্যেকের হাতেও লেগে যাবে, যদি না আমরা সবাই তার বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হই।

মনে হচ্ছে ক্যান্সার রোগীকে সুস্থ করতে আক্রান্ত সেলগুলিকে যেমন সমূলে উৎপাটন করতে হয়, সমাজে ছড়িয়ে পড়া ওই ক্যান্সার সেলগুলিকেও তেমনি উপড়ে ফেলতে হবে।

তবে আমার মনে একটা ভয়ও জাগছে, স্বাতী মালিওয়াল তাঁর পোস্টে আর কতদিন?

কারণ হাজার হাজার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চাপা দেওয়া কঠিন। কিন্তু একক বা মুষ্টিমেয় লড়াই আন্দোলন সহজেই থামিয়ে দেবার লম্বা হাত যে সব সময়েই আস্তিনে গোটানো থাকে এ আমরা বারম্বার প্রত্যক্ষ করছি।?