পুরুষবিহিন যৌথ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যে লেসবিয়ান নারীরা

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ইতিহাসের সাক্ষী

একদল কট্টরপন্থী লেসবিয়ান ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিরাট বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন একসঙ্গে যৌথজীবন-যাপনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে। পুরুষদের থেকে একেবারে আলাদা হয়েও যে বাঁচা যায়, সেটা দেখানোই ছিল ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের সেই যৌথজীবনের লক্ষ্য। এই নারীবাদীরা তাদের নাম দিয়েছিলেন দ্য ফিউরিজ' বলে। সেই ঘটনা নিয়ে লুসি বার্নসের তৈরি ইতিহাসের সাক্ষীর এবারের পর্ব পরিবেশন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন:

শার্লোট বাঞ্চ তখন বিবাহিতা। স্বামী-সংসার সব আছে। নিজেকে তিনি 'হেটারোসেক্সুয়াল' বা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট বলেই জানতেন।

তখন তিনি ধীরে ধীরে নারীবাদের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। ১৯৬৮ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে নারী মুক্তি আন্দোলনের স্থানীয় শাখা যারা প্রতিষ্ঠা করলেন, তাদের একজন শার্লোট।

তবে আজকে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নারীবাদী নেত্রী শার্লোট বাঞ্চের সঙ্গে সে সময়ের শার্লোট বাঞ্চের তখনো অনেক তফাৎ। ওয়াশিংটনের মূলধারার মধ্যবিত্ত পরিবারের ভদ্র মেয়ে বলে পরিচিত।

কিন্তু খুব দ্রুতই শার্লোট বদলে যেতে শুরু করলেন। নতুন যুগের নতুন চিন্তা-ভাবনা তাদের চেনা জগত সম্পর্কে ধারণাটা আমূল পাল্টে দিল।

"আমাদেরকে বলতে পারেন সেই যুগের তরুণ তুর্কী। নতুন কোন চিন্তা ভাবনা জানার সুযোগ হলেই আমরা সেটা লুফে নিচ্ছিলাম। ঠিক এই পটভূমিতেই আমি প্রথম লেসবিয়ান অধিকার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু করি। পরে আমি নিজেও একজন লেসবিয়ান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি", বলছিলেন শার্লোট।

যার সঙ্গে পরিচয়ের পর শার্লোট নিজেকে লেসবিয়ান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন আরেক নারীবাদী লেখিকা এবং লেসবিয়ান রীটা মে ব্রাউন।

শার্লোট যে পটভূমি থেকে এসেছেন, রীটা মে ব্রাউন ছিলেন তার একেবারে বিপরীত মেরুর। এই লেসবিয়ান লেখিকা ততদিনে অনেক খ্যাতি বা কুখ্যাতি কুড়িয়েছেন তার প্রথাবিরোধী জীবন-যাপন এবং চিন্তাভাবনার কারণে।

নিউইয়র্ক থেকে আসা এই লেসবিয়ান যেন শার্লোটকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন। তারা দুজনে পরিণত হলেন এই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই সংগঠকে।

বিয়ে-সংসার ভেঙ্গে শার্লোট চলে এলেন রীটার কাছে। এরপর রীটা এবং অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে তারা একটি লেসবিয়ান নারীবাদী গ্রুপ গঠন করলেন।

"নিজেকে লেসবিয়ান হিসেবে আবিস্কার করার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল, আমার সত্ত্বার এই দিকটাকে জানার মধ্যে এমন কিছু ছিল, তা যেন আমার চোখ খুলে দিল। ১৯৭০ এর দশকের সেই নারী আন্দোলনের আগে পর্যন্ত যেন নারীকে এমনভাবে গড়ে তোলা হতো, যাতে তারা কেবল পুরুষ, সন্তান, সংসার, পরিবারকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এখন আমরা বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলাম কেন আমরা এতদিন পর্যন্ত নারীকে এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রাখিনি।"

এই লেসবিয়ানরা তখন যেসব ধ্যান-ধারণার প্রকাশ ঘটাচ্ছিল, তাকে কেবল মাত্র বিতর্কিত বা বিপ্লবাত্মক বললে কম বলা হবে। তখনকার সমাজে তাদের চিন্তাভাবনা বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করলো।

ছবির কপিরাইট Joan E Biren
Image caption যৌথগৃহে সংবাদপত্রের কাজে ব্যস্ত নারীবাদীরা

"লেসবিয়ানরা যখন ঘোষণা করলো, যৌনক্রিয়া করার জন্যও আর পুরুষের দরকার নেই, তখন আমাদের মনে হলো, বাহ, এখন আমরাই আমাদের সঙ্গে থাকতে পারি, পুরুষকে আমাদের আর দরকার নেই!"

যুক্তরাষ্ট্রে সমাজ-রাজনীতিতে তখন নানা ধরণের আন্দোলন বিরাট আলোড়ন তুলেছে। কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা বিচ্ছিন্নতাবাদের কথা বলছে। তাদের এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব গিয়ে পড়লো লেসবিয়ান নারীবাদীদের আন্দোলনেও। তারাও পুরুষদের কাছ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিন্ন ধরণের সমাজ গড়ার কথা বলছিল।

এই লেসবিয়ান নারীবাদীরা পুরুষদের দেখছিলেন সমাজের উৎপীড়ক হিসেবে, কাজেই তাদের বাদ দিয়ে আলাদা সমাজের কথা বলতে শুরু করলেন তারা। কিন্তু তাদের এই জঙ্গী নারীবাদকে অন্য নারীবাদীরাও ভালোভাবে নিলেন না।

"এই নারীবাদীরা বলছিল, সমাজ যেখানে আমাদের নারীবাদকেই গ্রহণ করছে না, সেখানে আমরা নিজেদের লেসবিয়ান বলে পরিচিত করে আরও ঝামেলা পাকাতে চাই না। তখন আমরা যারা খুব কট্টরপন্থী লেসবিয়ান ছিলাম, আমরা ঠিক করলাম, আমরা আলাদা হয়ে যাবে, আলাদাভাবে আমাদের আন্দোলন চালাবো। আমরা আমাদের আন্দোলনের নাম দিলাম, 'ওই মেয়েরা'। আমাদেরকে অন্যরা তখন সেভাবেই বর্ণনা করছিল, 'ওই মেয়েগুলো উন্মাদ'।

১৯৭১ সালে এই লেসবিয়ান নারীবাদীরা তাদের গোষ্ঠীর নাম দিলেন 'দ্যা ফিউরিজ'। প্রতিহিংসার তিন গ্রীক দেবীকে এই নামে ডাকা হতো। সেখান থেকেই এই নাম।

"আমাদের লেসবিয়ান বেজবল টিম ছিল, ছিল লেসবিয়ান ফুটবল ক্লাব। আমরা মেয়েদের জন্য অটোমেকানিক প্রশিক্ষণ ক্লাস চালু করলাম। ঠিক করলাম, গাড়ির টায়ার কিভাবে বদলাতে হয়, প্রত্যেকটা মেয়েকে সেটাও শিখতে হবে। পুরুষদের ওপর আমরা আর কোন কিছু নিয়েই নির্ভর করতে চাই না।"

শার্লোট, রীটা এবং তাদের নারীবাদী গোষ্ঠীর ১২ জন সদস্য এরপর একটি কালেক্টিভ বা যৌথগৃহ স্থাপন করে সেখানে গিয়ে থাকা শুরু করলেন। ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের ঠিকানা ছিল সাউথ ইস্টের ইলেভেনথ স্ট্রীট, ২১৯ নম্বর বাড়ি।

"আমাদের মধ্যে যাদের চাকুরি ছিল, তারা সবাই তাদের বেতনের টাকা এখানে দিচ্ছিল। ওয়াশিংটনের একটি এনজিও আমাদের একটি প্রিন্টিং প্রেস দিয়েছিল। আমরা সেই প্রিন্টিং প্রেস দিয়ে বাড়ির বেজমেন্ট একটা পত্রিকা চালু করলাম। কিভাবে একটা কালেক্টিভ বা যৌথগৃহে সম্মিলিতভাবে বসবাস করা যায়, সেটা নিয়ে আমরা কথা বলা শুরু করলাম।"

অনেকটা কমিউনের মতো এই কালেক্টিভের সদস্যরা যে ধরণের জীবন-যাপনের নিরীক্ষা শুরু করলেন, তাকে বেশ বিপ্লবীই বলতে হবে। তারা সবাই মিলে একটাই আলমারি ব্যবহার করতেন, যেখানে সবাই তাদের কাপড়চোপড় রাখতেন। কিন্তু এই অভিনব ব্যবস্থা খুব বেশিদিন টেকেনি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption শার্লোট বাঞ্চ এখন রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

"আমার মনে পড়ছে, আমরা তিনজন মিলে বলেছিলাম, আমাদের প্রত্যেকের আলাদা টেবিল দরকার। আমরা এক টেবিলে ভাগাভাগি করে বসতে রাজী নই, আমরা একই টুথব্রাশ ব্যবহার করতে রাজী নই। একসঙ্গে থাকার একটা সীমারেখা নিশ্চয়ই আছে, যেটা আপনি অতিক্রম করতে চাইবেন না। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, আমরা যাই করি, একসঙ্গে করবো। এখন বারো জন মিলে যদি একটা সিনেমা দেখতে চাই, কোন সিনেমা দেখতে যাব, সেটা ঠিক করতে করতে দেখা গেল শো'র সময় পেরিয়ে গেছে!"

কেবল একসঙ্গে থাকা সংসার করা নয়, এই মহিলারা তখন নানা ধরণের বিপ্লবী চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

"আমরা যারা নারীবাদী আন্দোলন থেকে লেসবিয়ানিজমের দিকে ঝুঁকেছিলাম, তারা শুরুর দিকে বলতাম, ইচ্ছে করলে যে কেউ লেসবিয়ান হতে পারে! কারণ আমরা সেভাবেই নিজের ইচ্ছাতে লেসবিয়ান হয়েছিলাম। কিন্তু যারা সত্যি সত্যি লেসবিয়ান, যারা তখনো পর্যন্ত তাদের যৌনপ্রকৃতি গোপন রাখতে বাধ্য হচ্ছিল সেসময়ের রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে, তারা আমাদেরকে সতর্ক করে দিতো এই বলে যে, এটা ঠিক নয়, লেসবিয়ান হওয়ার ব্যাপারটা আসলে সবার মধ্যে থাকে না!"

কাজেই তখন লেসবিয়ানিজম নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু করলো দ্য ফিউরিজ। তারা মেনে নিলে যে, কেউ চাইলেই লেসবিয়ান হতে পারে না, এটা কারও প্রকৃতির মধ্যেই থাকতে হয়!

কালেক্টিভে যদিও এই গ্রুপের সদস্যরা প্রচুর সময় এক সঙ্গে কাটাচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে পছন্দের সঙ্গীর সাথে জুটিও বাঁধছিলেন অনেকে।

"বারো জন মানুষ যদি এত ঘনিষ্ঠভাবে এত কাছাকাছি থাকে, তখন কিন্তু তাদের মধ্যে কেবল একটা মানুষকে চাওয়ার আকাঙ্খা তৈরি হয়। একজন মানুষের সঙ্গেই তখন আপনি সম্পর্ক তৈরি করতে চান।"

কিন্তু ১২ জন লেসবিয়ান নারীর এই যৌথ সংসারকে বাইরের দুনিয়া কিভাবে দেখছিল? তাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

"আমাদের চারপাশের বেশিরভাগ মানুষ, আমাদের বন্ধু-বান্ধব, তাদের ধারণা হলো, আমরা উন্মাদ। সবাই বলতো, আমরা খুব বেশি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছি। আসলেই আমরা এরকমই ছিলাম। যেমন আমাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে ছিল একটা ছেলে শিশু। আমরা তাকে বললাম, এখানে ছেলে শিশুর কোন জায়গা নেই, ওকে ওর বাবার কাছে পাঠিয়ে দাও। আমরা আসলেই বেশ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিলাম, এবং লোকজন তার বিরুদ্ধে নানা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল।"

'দ্য ফিউরিজ' এর এই নিরীক্ষা আন্দোলন অনেককে বিমোহিতও করেছিল। অন্য লেসবিয়ানরাও এই আন্দোলন থেকে নতুন ধারণা, নতুন চিন্তা-ভাবনার জায়গা খুঁজছিল।

কিন্তু এক বছরের মধ্যেই এই যৌথ সংসারে ফাটল দেখা দিতে শুরু করলো। ১৯৭২ সালের বসন্তকালে এসে লেসবিয়ান নারীবাদীদের এই গ্রুপ ভেঙ্গে গেল।

"আমার মনে হচ্ছিল, আমরা বুঝি এবার নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি শুরু করবো। কে রাজনৈতিকভাবে শুদ্ধ আর কে নয়, কার এই যৌথগৃহে থাকা উচিত, কার নয়, এসব নিয়ে যখন ঝগড়া শুরু হয়, তখন বুঝতে হবে, এর এখানেই শেষ!"

তবে তাদের সংবাদপত্রটি আরও কিছুদিন চালু ছিল। যে উদ্দীপনা নিয়ে দ্য ফিউরিজ যাত্রা শুরু করেছিল, সেই উদ্দীপনা এখন নানা খাতে প্রবাহিত হলো। কয়েকজন মিলে মেয়েদের একটি রেকর্ড লেবেল প্রতিষ্ঠা করলো। তবে যেসব চিন্তা ভাবনা, ধ্যান ধারণা নিয়ে তারা শুরু করেছিল, সেগুলো আরও বিকশিত হতে থাকলো।"

কিন্তু এত বছর পর পেছন ফিরে শার্লোট বাঞ্চের কি মনে হয় যে তারা আসলে যে আন্দোলন করেছেন, সেটি ভুল ছিল?

"আমি কল্পনাই করতে পারি না যে এরকম একটা কাজ আমি আবার করতে পারবো। কিন্তু এটা করার জন্য আমি কি এখন অনুতাপ করি? না, মোটেই না। আমি মনে করি না যে নারীবাদীদের অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। কিন্তু আমি মনে করি, কোন গোষ্ঠীর যদি মনে হয়, তাদের নিজেদের মতো করে আলাদা একটা পরিচয় গড়া দরকার, তাহলে কিন্তু একটা নিজস্ব স্পেস বা জায়গার দরকার হবে। কিন্তু তার মানে আবার এই নয় যে, সেখানেই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে।"

ওয়াশিংটন ডিসির সাউথ ঈস্টের ইলেভেনথ স্ট্রীটের যে বাড়িতে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেটি এখন একটি ঐতিহাসিক বাড়ি হিসেবে সংরক্ষিত। শার্লোট বাঞ্চ একজন নারীবাদী হিসেবে এখনো তার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তিনি রাটগার্স ইউনিভার্সিটিতে উইমেন স্টাডিজের অধ্যাপক।