মাঠে ময়দানে
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

টিভিতে ইউরোপিয়ান ফুটবল কি দেশের খেলার আকর্ষণ কমিয়ে দিচ্ছে?

টিভিতে ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখে দেখে কি এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক দেশে ফুটবল ভক্তরা স্থানীয় ক্লাব বা লিগের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে?

এ ক্ষেত্রে মিশরের অভিজ্ঞতা দেখা যেতে পারে।

মিশরের ২০১২ সালে এক ভয়াবহ ফুটবল দাঙ্গা হয়েছিল ২০১২ সালে সেদেশের প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব আল-মাসরি এবং আল আহলি মধ্যে একটি ম্যাচের সময়। তাতে ৭৪ জনের মৃত্যুর পর দু'বছরের জন্য মিশরের সরকার স্থানীয় লিগ বন্ধ করে দেয়।

খেলা দেখতে ফ্যানদের মাঠে আসাও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। খেলা দেখতে আসতে পারতো শুধু খেলোয়াড়দের পরিবারে লোকেরা, ক্লাব কর্মকর্তারা এবং মিডিয়ার লোকেরা ।

মিশরের ফুটবল সমিতি কিছুদিন আগে এ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েও পরে পিছিয়ে আসে।

কিন্তু এর ফলে পরিস্থিতি কি হয়েছে?

ছবির কপিরাইট Alex Caparros
Image caption বার্সেলোনার লিওনেল মেসি

কায়রো থেকে বিবিসির ইনাস মাজহার বলছিলেন, মাঠে গিয়ে খেলা দেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মিশরের ফুটবল ভক্তরা এখন ইউরোপের লিগের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে।

"লোকে এখন ইংলিশ লিগ, জার্মান লিগ বা স্প্যানিশ লিগে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। তারা কাফেগুলোতে জড়ো হচ্ছে এবং টিভিতে খেলা দেখছে।"

"তারা এখন আর স্থানীয় লিগ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তাদের ধ্যানজ্ঞান এখন রেয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা চেলসি।"

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এখন ইউরোপিয়ান ফুটবল এত জনপ্রিয় হয়েছে যে সেখানকার লোকের মধ্যে স্থানীয় ক্লাব ফুটবল দেখা কমে গিয়েছে। ।

অনেক দেশে স্থানীয় লিগগুলো প্রায় মৃত। বাংলাদেশেও কি অনেকটা এরকমই অবস্থা?

টিভিতে ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখার অবাধ সুযোগ কি স্থানীয় ফুটবলের দুর্দশার একটা কারণ?

এবারের মাঠে ময়দানেতে এ নিয়ে কথা বলেছেন ফুটবল কোচ এ কে এম মারুফুল হক।

ছবির কপিরাইট John Moore
Image caption টিভিতে ফুটবল খেলা দেখার আকর্ষণ সারা পৃথিবীতেই

তার কথা, টিভিতে ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখার সুযোগ পাওয়াটা নিশ্চয়ই একটা কারণ।

"যারা রাত জেগে ইউরোপের জার্মান, স্প্যানিশ বা ইংলিশ লিগের খেলা দেখছে - তারা পরদিন বিকেলে স্থানীয় লিগের একটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে সেই মানের খেলা দেখতে পাচ্ছে না।"

তাদের মধ্যে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার আগ্রহ কমে যাবার এটা একটা কারণ - যদিও একমাত্র কারণ নয়।

"স্থানীয় ছেলেদের মধ্যে প্রতিভার অভাব নেই, তারা টিভিতে মেসি বা রোনাল্ডোর খেলা দেখে নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখে তাদের মত খেলোয়াড় হবার।"

"কিন্তু তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং পরিচর্যা হচ্ছে না। স্থানীয় লিগের কাঠামো এমন যা দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারছে না। এসব কারণে বাংলাদেশের ফুটবলে তারকার জন্ম হচ্ছে না যারা মাঠে দর্শক টেনে আনবে" - বলছিলেন মারুফুল হক।

তিনি বলেন, "টিভিতে উন্নত মানের ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখলেই যে স্থানীয় খেলার প্রতি আকর্ষণ কমে যাবে এমন নয়। ভারতের দর্শকরাও ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখে। কিন্তু সেখানে ইন্ডিয়ান ফুটবল ণিগের খেলায় মাঠ ভর্তি দর্শক হচ্ছে। কারণ তারা যথাযথ কাঠামো তৈরি করেছে যা স্থানীয় দলকে সমর্থন দেবার জন্য মাঠে দর্শক টেনে আনছে।"

দর্শকরা স্থানীয় দলকে সমর্থন দিতে চায়। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বা রাজশাহীর মধ্যে যদি 'হোম এন্ড এ্যাওয়ে' ভিত্তিতে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলা হয়, তাহলে দর্শকরা মাঠে আসবে।

তারা তখন তুলনা করবে না যে তারা ইউরোপিয়ান দলের মতো খেলছে কিনা - বলেন এ কে এম মারুফুল হক।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ইংল্যান্ড আর ওয়েলসে এখন বৃষ্টিতে ক্রিকেট ম্যাচ বিঘ্নিত হচ্ছে আগের চাইতে বেশি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কি ক্রিকেটের ওপরও পড়ছে?

কোথাও খরার কারণে শুকনো ক্রিকেট মাঠ, কোথাও পানির অভাব, কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি, কোথাও প্রচন্ড গরম - বেশ কিছুদিন ধরে এমন ঘটনা ঘটছে দক্ষিণ আফ্রিকায়, ইংল্যান্ডে, অস্ট্রেলিয়ায়, বা ভারতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কি ক্রিকেটের ওপরও পড়তে শুরু করেছে?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কিছু ঘটনার পর অনেকেই এমন কথা বলতে শুরু করেছেন।

যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকায় চলছে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর খরা। অবস্থা এমন যে কেপটাউন শহরে লোকেরা মাথা পিছু কত পানি ব্যবহার করতে পারবে তা বেঁধে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ৯০ সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে স্নান করা যাবে না । ক্রিকেট মাঠে পিচ শুকিয়ে যাচ্ছে, লিগ এবং স্কুল টুর্নামেন্ট পর্যায়ের বেশ কিছু ম্যাচ বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এমন এক সময় এ অবস্থা চলছে - যখন দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করছে ভারত, এর পর সেদেশে যাবে অস্ট্রেলিয়া। ক্রিকেট পিচ তৈরির জন্য এবং মাঠ সবুজ রাখতে প্রচুর পানি দরকার হয়। কিন্তু এই খরার সময় কোথায় পাওয়া যাবে এত পানি?

কেপটাউনের নিউল্যান্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের এওয়েন ফ্লিন্ট বলছিলেন, কি করছেন তারা।

"উইকেটে আমাদের নিয়মিত পানি দিতে হচ্ছে। তা না হলে ওপরটা ফেটে যাবে। কিন্তু মাঠের বাকি অংশে আমরা ডিসেম্বর মাস থেকেই সপ্তাহে মাত্র একদিন পানি দিচ্ছি এই সংকটের জন্য। ফলে মাঠে ঘাস গজাচ্ছে, কিছু অংশ ঠিকই দেখাচ্ছে। কিন্তু আমার চোখে এটা যথেষ্ট ভালো নয় - কিন্তু করার কি আছে?"

কেপটাউন সিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র জে পি স্মিথ বলছিলেন, এখন যে দলগুলো দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে আসবে তাদেরও কিছু বিধিনিষেধ মানতে হবে।

"আন্তর্জাতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে যে আমরা একটা খরার মধ্যে আছি। পানির সংকটের মধ্যেই আমাদের চলতে হবে। তবে আমরা গুরুত্বপূর্ণ খেলা ও টুর্নামেন্টগুলোর জন্য যতটা সম্ভব পানির ব্যবস্থা করছি।"

ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স ক্রিকেট এসোসিয়েশনের প্রধান নাবিল দীন বলছিলেন, এই খরার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।

ছবির কপিরাইট Gallo Images
Image caption দক্ষিণ আফ্রিকায় খরার কারণে অনেক ক্রিকেট মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে

"আপনি যদি এখন খেলার মাঠগুলোতে যান এবং সেগুলোর অবস্থা দেখেন, তাহলে বুঝবেন, যে শুধু আগের মত ঘাস গজাতেই প্রায় দু'বছর লাগবে। অনেক মাঠের মাটি এখন বালুর মতো হয়ে গেছে। ঘাস মরে গেছে। এরকম আমরা আগে দেখিনি। আমি শুধু আশা করছি কিছু একটা উপায় আমরা বের করতে পারবো।"

এ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের অবস্থা হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত।

ক্লাইমেট কোয়ালিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে বেরিয়ে এসেছে যে - ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে বৃষ্টি-বিঘ্নিত ক্রিকেট ম্যাচের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।

লন্ডন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনার্জি এন্ড ক্লাইমেট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের পরিচালক রিচার্ড ব্ল্যাক। তিনি বলছেন, আফ্রিকার গড় তাপমাত্রা বিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশি দ্রুত গতিতে বাড়ছে

"তাই এটা খুব ভালো খবর নয়। আর ব্রিটেনে যা হচ্ছে সেটা শুধু বৃষ্টিপাত নয়, বৃষ্টির প্যাটার্ন সংক্রান্ত। আমাদের হাতে ক্রিকেট কর্তপক্ষগুলোর কাছ থেকে পাওয়া উপাত্ত আছে, তা ছাড়া আছে বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে পাওয়া আবহাওয়া সংক্রান্ত উপাত্ত। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে এমন ৭টি বছরের মধ্যে ছয়টিই ছিল ২০০০ সালের পরে। এবং ঠিক এই সময়কালের মধ্যে আমরা ক্রিকেট কর্তৃপক্ষগুলোর দেয়া তথ্য থেকে দেখছি যে - ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে যত একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা হয়েছে, তার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বৃষ্টির কারণে বিঘ্নিত হয়েছে।"

"গত মওসুমে ওয়েলসের গ্ল্যামরগান কাউন্টিতে টি২০ ব্লাস্ট টুর্ন্যামেন্টের ৭টি ম্যাচ হয়েছে। তার মধ্যে ৫টিই বৃষ্টি বিঘ্নিত ছিল। এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে পরিস্থিতিটা কিভাবে পাল্টে যাচ্ছে।"

এর পর দেখুন ভারতের দিকে । ভারতে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে মহারাষ্ট্র রাজ্যে প্রচন্ড খরার জন্য ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলের ফাইনাল সহ ১৩টি টি২০ ক্রিকেট ম্যাচ অন্যত্র সরিয়ে নেবার নির্দেশ দেয় মুম্বাইয়ের হাইকোর্ট।

তার মানে কি সত্যি জলবায়ু পরিবর্তনের একটা প্রভাব ক্রিকেটের ওপর পড়ছে? রিচার্ড ব্ল্যাক অবশ্য বলছিলেন, এগুলোর একেবারে নির্ভুল চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়, তবে সাধারণ ভাবে এটা সত্য বলেই মনে হয়।

তার কথা, বিজ্ঞানীদের পক্ষে একেবারে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। কিন্তু দেখুন, এবার এ্যাশেজ সিরিজের সময় এবং মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন টেনিসের সময় অস্ট্রেলিয়ায় কি ভীষণ গরম পড়েছিল।