ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মোহাম্মদ আলী যেভাবে আলোড়ন তুলেছিলেন

ছবির কপিরাইট Central Press
Image caption জন্ম ক্যাসিয়াস ক্লে নামে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন ষাটের দশকে।

১৯৬৭ সালের ২৮শে এপ্রিল। বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলিকে তলব করা হয়েছে একটি সামরিক প্যানেলের সামনে।

টেক্সাসের হিউস্টনে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির হলেন তিনি। যখন তাঁর নাম ঘোষণা করা হলো, তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন।

এর আগেই আলি জানিয়েছিলেন, কেন তিনি এই যুদ্ধকে অন্যায় যুদ্ধ বলে মনে করেন এবং কেন তিনি এই যুদ্ধে যেতে চান না।

"কেন আমি এবং আমার মত তথাকথিত নিগ্রোরা নিজের দেশ থেকে দশ হাজার মাইল দূরে গিয়ে নিরপরাধ বাদামি মানুষদের ওপর বোমা আর গুলি চালাতে যাবো? যারা কিনা আমাদের কোন ক্ষতি করেনি? আমি সোজা বলতে চাই, আমি যাব না। নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করতে আমি দশ হাজার মাইল দূরে যাব না।"

যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেড়ে নেয়া হলো মোহাম্মদ আলির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা। শুধু তাই নয়, তাকে এমনকি জেল খাটতে হতে পারে, এমন আশংকাও তৈরি হলো।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও মোহাম্মদ আলি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। সেসময় বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন, তার জন্য তিনি মোটেই অনুতপ্ত নন।

"আমি যখন ইসলামে দীক্ষা নিলাম, তখনই আমি এক হাজার ভাগ নিশ্চিত ছিলাম যে আমাকে অনেক চাপে সইতে হবে। অতীতে ধর্মপ্রাণ অনেক মানুষকে এরকম চাপ সইতে হয়েছে। যীশুখ্রীষ্টকে জেল খাটতে হয়েছে। মোজেসকে জেল খাটতে হয়েছে। নোয়া, লাক, এলাইজা মোহাম্মদ আলি, মার্টিন লুথার কিং—এরকম যারাই তাদের বিশ্বাসের জন্য দাঁড়িয়েছেন, তাদের সবাইকে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।। কিন্তু জীবনাবসানের পর এরা সবাই কিন্তু আরও মহত্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption প্রতিদ্বন্দ্বীকে পাঁচ রাউন্ডেই হারাবেন, হাতের পাঁচ আঙ্গুল দেখিয়ে বলছেন আলি

মোহাম্মদ আলি যখন ক্যাসিয়াস ক্লে নামে পরিচিত এক তরুণ বক্সার, তখন থেকেই তার দারুণ ভক্ত ছিলেন ড: নাথান হেয়ার। তিনি এখন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। সেসময় অবশ্য ড: ন্যাথান হেয়ার নিজেও একজন আধা পেশাদার বক্সার।

প্রথম যেদিন তিনি টেলিভিশনে মোহাম্মদ আলির লড়াই দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, সেদিনটির কথা এখনো মনে করতে পারেন।

"১৯৫৯ সালে আমি এবং আমার স্ত্রী আরেক দম্পতির সঙ্গে একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। একদিন আমি একা বসে ন্যাশনাল গোল্ডেন গ্লোভস চ্যাম্পিয়ন্সশীপ দেখছিলাম। তখন ১৭ বছরের এক বালক, সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছিল। আমি দৌড়ে সবাইকে ডাকতে শুরু করলাম, দেখ, দেখ, এই ছেলেটাকে দেখ। দারুণ ফাইটার। দারুণ লড়ছে। এরকম লড়াই আমি জীবনে দেখিনি। যার বিরুদ্ধে সে লড়ছিল, সে যেন স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। আর এই ছেলেটা যেন প্রজাপতির মতো উড়ছিল, আর মৌমাছির মতো দংশন করছিল। তখন থেকেই আমি তার ভক্ত।"

মোহাম্মদ আলি যেন রাতারাতি আকাশচুম্বী খ্যাতি পেলেন। অলিম্পিকে সোনার পদক জিতলেন। আর ২২ বছর বয়সেই জিতে নিলেন বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের শিরোপা।

১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝিতে গিয়ে মোহাম্মদ আলি বেশ রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠলেন। ততদিনে তিনি ইসলামে দীক্ষা নিয়েছেন। ক্যাসিয়াস ক্লে নাম পাল্টে নুতন নাম নিয়েছেন, এখন তিনি পরিচিত মোহাম্মদ আলি নামে। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ বিপ্লবীদের সংগঠন 'নেশন অব ইসলামে' যোগ দিয়েছেন।

১৯৬৬ সালে যখন তাকে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য ডাক দেয়া হলো, তিনি ঘোষণা করলেন, ভিয়েতনামের ভিয়েতকং গেরিলাদের সঙ্গে তো আমার কোন বিবাদ নেই।

ড: নাথান হেয়ার বলেন, তখন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনে কিছুটা হতাশা নেমে এসেছে। সেই সময়ে মোহাম্মদ আলির এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী অবস্থান একটা বিরাট ঢেউ তুললো।

"অনেক মানুষই তখন তাদের মনোভাব বদলাচ্ছিল। কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার দেয়া বা সমাজের মূলধারায় মেলানোর যে প্রক্রিয়া, তার ধীর গতি দেখে অনেকেই এর ওপর বিশ্বাস হারাচ্ছিল। কাজেই মোহাম্মদ আলি যখন এসব বিষয়ে সোচ্চার হতে শুরু করলেন, তখন এর একটা বিরাট প্রভাব পড়েছিল।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সনি লিস্টনকে হারিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন আলি

১৯৬৭ সালের এপ্রিলে নাথান হেয়ার আমেরিকার সবচেয়ে নামী কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াতেন। আমেরিকার বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের অনেকে এখানেই পড়াশোনা করেছেন।

সেবছরের বসন্তকালে যুক্তরাষ্ট্র তরুণদের বিক্ষোভে উত্তাল। হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্ররাও বিক্ষোভ করছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম, যাকে তারা শ্বেতাঙ্গদের চাপিয়ে দেয়া কারিকুলাম বলে মনে করতো—এই সব কিছুর বিরুদ্ধেই ছিল তাদের বিক্ষোভ।

এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ আলিকে সেখানে এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেন ড: নাথান হেয়ার এবং তাঁর বন্ধুরা।

"বিমানবন্দরে মোহাম্মদ আলির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো কিছু ছাত্র নেতার, যারা ব্ল্যাক পাওয়ার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে হিলটন হোটেলে যাওয়ার পথেই মোহাম্মদ আলি তার কবিতা লেখা শুরু করে দিলেন। মোহাম্মদ আলি যে এতটা মেধাবী, বুদ্ধিমান, সেটা দেখে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। মোহাম্মদ আলি চাইলে যে কোন কিছু হতে পারেন! তাকে বক্সারই হতে হবে এমন কোন ব্যাপার নেই। তিনি চাইলে আইনজীবী হতে পারেন, রাজনীতিক হতে পারেন ! হোটেলে গিয়ে তিনি কথা বলতেই থাকলেন। তার কথার যাদুতে মুগ্ধ হয়ে যেত সবাই।"

কিন্তু হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষ মোহাম্মদ আলিকে পছন্দ করছিল না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে মোহাম্মদ আলিকে বক্তৃতা করতে দিতে অস্বীকৃতি জানালো। তখন মিলনায়তনের সামনে হলের সিঁড়ির ওপর মাইক ফিট করে সেখানে বক্তৃতার ব্যবস্থা করলেন নাথান হেয়ার এবং তার বন্ধুরা।

"বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন মিলনায়তনের দরোজায় শিকল দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিল। আমরা তখন বাইরের সিঁড়িতে মাইক লাগানোর ব্যবস্থা করলাম। এর মধ্যেই সেখানে জড়ো হয়ে গেছে চার হাজার মানুষ। মোহাম্মদ আলি সেখানে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে কথা বললেন। বললেন, কেন তিনি যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তিনি বললেন, আমাকে জেলে নিয়ে যাও, আমার জামিনের দরকার নেই। তিনি বললেন, ব্ল্যাক ইজ বিউটিফুল, কৃষ্ণাঙ্গরা কত সুন্দর।"

মোহাম্মদ আলির কথা শুনে মানুষ যেন পাগল হয়ে গেল। সবাই খুশিতে উল্লাস করছিল। যেভাবে তিনি জনতাকে মাতিয়েছিলেন, সেটা কোন গানের অনুষ্ঠানেও দেখা যায় না। বক্তৃতা শেষে যখন তিনি বিদায় নিচ্ছেন তখন জনতা তার গাড়ির কাছে ভিড় করছিল। অনেকে তখন তার গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াচ্ছিল। তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল। তাকে ঐ জায়গা থেকে সরিয়ে নিতে সময় লেগেছিল প্রায় বিশ মিনিট।

নাথান হেয়ার মোহাম্মদ আলিকে হোটেলে নিয়ে গেলেন। এই সফরের শেষ পর্যন্ত তিনি মোহাম্মদ আলির সঙ্গে ছিলেন।

"সেদিন তিনি হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিকে একটা নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের আন্দোলনের সেটাই যেন ছিল চূড়ান্ত পর্ব। তিনি ক্যাম্পাসকে দারুণভাবে প্রাভাবিত করেছিলেন। হাওয়ার্ডকে বদলে দিয়েছিলেন।"

মোহাম্মদ আলি চলে যাওয়ার পর হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে উঠলো। সেই গ্রীস্মে ড: নাথান হেয়ারকে ইউনিভার্সিটি থেকে বরখাস্ত করা হলো। তিনি ফিরে গেলেন বক্সিং রিংয়ে।

হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মোহাম্মদ আলীর ডাক পড়লো সেনাবাহিনীর ইনডাকশন বোর্ডে।

সেবছরের শেষের দিকে বিবিসিকে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার চাইতে তিনি বরং যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে চান কিনা। জবাবে তিনি বললেন, "আমি কোনদিনই দেশ ছাড়বো না। দেশ ছাড়ার জন্য আমার কাছে অনেক প্রস্তাব আছে। অনেক দেশের সরকারই আমাকে তাদের দেশের নাগরিকত্ব দিতে প্রস্তুত, তারা আমাকে সেখানে গিয়ে থাকতে বলছে। কিন্তু আমার মানুষরা তো এখানে। দুই কোটি বিশ লাখ মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার আর সমতার যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামে আমি অনেক সাহায্য করতে পারি। কারণ আমার একটা ভাবমূর্তি আছে।"

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে মোহাম্মদ আলিকে অবশ্য জেলে যেতে হয়নি। তাকে আবার বক্সিং রিং এ ফিরে আসারও অনুমতি দেয়া হয়। ১৯৭০ এর দশক জুড়ে তিনি বহু বিখ্যাত লড়াইতে জয়ী হয়েছেন। ড: নাথান হেয়ারও তার একাডেমিক ক্যারিয়ারে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন।