কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাংলা কি বোর্ড, মহাকাশ প্রতিযোগিতার ৬০ বছর
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

স্মার্ট ফোনের জন্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাংলা কি বোর্ড, মহাকাশ প্রতিযোগিতার ৬০ বছর

বাংলাদেশে বিজ্ঞানীদের একটি দল স্মার্ট মোবাইল ফোনের জন্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একটি বাংলা কি বোর্ড উদ্ভাবন করেছেন। অ্যাপস ভিত্তিক এই কি বোর্ডের প্রধান ফিচার হচ্ছে- লেখার সময় অসম্পূর্ণ একটি শব্দ অথবা বাক্য আগে থেকেই অনুমান করে শব্দের ও বাক্যের পরবর্তী অংশ হিসেবে সেটিকে সাজেস্ট করা।

এন্ড্রয়েড ফোনের জন্যে ইংরেজিতে এই ফিচারটি অনেক আগে থেকে থাকলেও বাংলায় এটি একেবারেই নতুন। কম্পিউটারে লেখার জন্যে এধরনের কি বোর্ড থাকলেও মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই কি বোর্ড ব্যবহার করলে মোবাইল ফোনটি নিজেই বুঝে ফেলবে আপনি কী লিখতে যাচ্ছেন। এর ফলে ফোনে কিছু লিখতে গেলে এখন আর পুরোটা লিখতে হবে না। ফলে অনেক দ্রুত বাংলা টাইপ করা যাবে এবং বাংলা লিখতেও লোকেরা আগ্রহী হবেন।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দলটি এক বছর চেষ্টা করে 'একুশে বাংলা কি বোর্ড' নামে এই কি বোর্ড উদ্ভাবন করেছে। এটি এখন প্লে স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী। এই কি বোর্ডের ফিচারটি সম্পর্কে তিনি বলেন, "প্রথমত: অন্যান্য কি বোর্ডের মতো এখানেই সহজেই বাংলা লেখা যায়। দ্বিতীয়ত: এখানে সোয়াইপ করে লেখা যায়। অর্থাৎ স্মার্ট ফোন থেকে আঙ্গুল না তুলে একটা শব্দ লেখা যাবে। এবং তৃতীয়টি হচ্ছে আগে থেকেই শব্দ অনুমান করা।

"কোনো বাক্য লিখতে গেলে আমাদের মস্তিষ্ক অনেক কিছু বুঝে ফেলে। যেমন কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে আপনি কেমন আছেন? এই কথাটির উত্তর হতে পারে আমি ভালো আছি বা আমি ভালো নেই। এই কি বোর্ডে এধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যোগ করা হয়েছে যাতে করে সেখানে একটা বা দুটো শব্দ লেখার পরে বাকি শব্দটা কি হতে পারে সেটাও সে নিজে থেকে অনুমান করতে পারে।"

ছবির কপিরাইট Biswapriyo Chakrabarty
Image caption বিজ্ঞানীদের এই দলটি একুশে বাংলা কি বোর্ড উদ্ভাবন করেছেন

এর একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে- কেউ যদি লিখেন 'আমি তোমাকে' তখন স্মার্ট ফোনটি একটা অপশন দিতে পারে যে আপনি হয়তো 'ভালোবাসি' শব্দটি লিখতে চাইছেন। তখন আর ওটা লিখতে হবে না। বরং একটা ক্লিক করেই পরের শব্দটি বসানো যাবে।

এই একইভাবে লেখা যাবে শব্দও। যেমন যদি 'আ' লেখা হয় তখন ফোনটি আপনাকে 'আম' 'আমি' 'আমার' 'আমাদের' ইত্যাদি শব্দ সাজেস্ট করতে পারে।

মি. চক্রবর্তী বলেন, "শব্দের একটা অক্ষর লেখার পরে কিম্বা কোনো একটা বাক্যের একটি শব্দ লেখার পরে কি বোর্ডটি সাজেস্ট করবে শব্দটির পরবর্তী অক্ষর কিম্বা বাক্যটির পরবর্তী শব্দ কি হতে পারে।

"যেমন আমি হয়তো 'আ' লিখলাম তখন সে আমাকে 'আমি' সাজেস্ট করবে। তারপর 'আমি' সিলেক্ট করলে ফোনটি হয়তো আমাকে 'জানি' (আমি জানি) বা 'ভালো' (আমি ভালো) 'তোমাকে' (আমি তোমাকে) এসব সাজেস্ট করবে।"

তিনি জানান, একটি অক্ষর দিয়ে বহু শব্দ হতে পারে কিন্তু যে শব্দগুলো বেশি ব্যবহার করা হয় মোবাইল ফোনটি শুধু সেসব শব্দই দেখাবে।"

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সুপরিচিত যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তাদের কাছ থেকে কিছু ফিচার এই একুশে বাংলা কি বোর্ডে যুক্ত করা হয়েছে।

ছবির কপিরাইট Biswapriyo Chakrabarty
Image caption বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা এই কি বোর্ডটিকে আরো উন্নত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন

তিনি বলেন, এ কি বোর্ডটি এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটিকে আরো বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ আছে।

"যেমন একটা শিশু। সে যখন কোনো ভাষা শেখে তাকে কিন্তু অনেকের সাহায্য নিতে হয়। একটা বাচ্চা কখনো একা একা ভাষা শিখতে পারে না। আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে সে অনেক কিছু শিখতে পারে। আমাদের এই কি বোর্ডটিও এখন ওই শিশুর পর্যায়ে রয়েছে।"

বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী জানান, ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিয়ে, তাদের চাওয়া পাওয়ার ভিত্তিতে এটিকে আরো সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করবেন।

"এই কি বোর্ড যতো বেশি মানুষ ব্যবহার করবে কি বোর্ডটি ততো বেশি স্মার্ট হবে। কি বোর্ড স্মার্ট হওয়া মানে টাইপিং দ্রুত হবে। আর টাইপিং দ্রুত হলে মানুষজন বাংলায় বেশি লিখবে এবং বাংলায় কনটেন্টের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।"

মহাকাশে প্রতিযোগিতা

১৯৬০ এর দশকে শুরু হয়েছিলো মহাকাশে অভিযান চালানোর প্রতিযোগিতা। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে প্রথম উৎক্ষেপণ করেছিলো স্পুটনিক। দেখতে অনেকটা ভলিবলের মতো। তার এক মাস পরে তারা পাঠায় আরো একটি উপগ্রহ - স্পুটনিক টু। তাতেই ছিলো মহাকাশচারী এক কুকুর- লাইকা।

এর কয়েক মাস পরে ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, এখন থেকে ঠিক ৬০ বছর আগে, যুক্তরাষ্ট্র পাঠিয়েছিলো এক্সপ্লোরার ওয়ান নামের স্যাটেলাইট। শুধু পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ানোই তার কাজ ছিলো না। মহাকাশে প্রথম কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও হয়েছিলো এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে।

যুক্তরাষ্ট্রে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জেমস ভ্যান অ্যালেনের তৈরি যন্ত্রপাতির কারণে এটা সম্ভব হয়েছিলো। সেসময় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন ডন গার্নি, যিনি এই পুরো ঘটনায় অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন।

Image caption রাশিয়ার স্পুটনিক উপগ্রহ

"যখন স্পুটনিক ওয়ান মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিলো তখন সারাবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো এই ঘটনা। আমি সবকিছু খুব স্পষ্ট মনে করতে পারছি। আমি তখন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। তার কিছুদিন আগে ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক ওয়ান পাঠানো হয় মহাকাশে।"

এটা ছিলো শীতল যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে। তখন প্রত্যেক ঘণ্টা কি আধা ঘণ্টায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো বস্তু যুক্তরাষ্ট্রের উপর দিয়ে উড়ে যেতো বলে তিনি জানান। এই প্রতিযোগিতায় অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলো।

"রকেট তৈরির প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে ছিলো যুক্তরাষ্ট্র। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো স্পুটনিক। বুঝতে পারলো যে তারা প্রযুক্তিতে পেছনে পড়ে আছে।"

কিন্তু এক্সপ্লোরার ওয়ান স্পুটনিকের চেয়েও ছিলো বেশি কিছু। এর সফল উৎক্ষেপণের পরেই ভ্যান অ্যালেনের সাথে কাজ করতে শুরু করেন তিনি

তিনি বলেন, তখন মহাকাশ গবেষণার অনেক বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেসময় গবেষণার জন্যে বিজ্ঞানী ভ্যান আলেনের আরো কিছু লোকের প্রয়োজন ছিলো। আর তখনই তিনি এই মহাকাশ গবেষণার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।

ছবির কপিরাইট NASA
Image caption যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো যান এক্সপ্লোরার ওয়ান

"এক্সপ্লোরারের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো- মহাকাশে এটা বড় একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিলো যা সম্পর্কে আগে কোনো ধারণা ছিলো না। পৃথিবীর চারপাশের অরবিটে যে ধরনের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ঘটনা ঘটছে সেই কসমিক রশ্মি পরিমাপ করছিলো এই স্যাটেলাইটে বসানো যন্ত্রটি। বিজ্ঞানী ভ্যান অ্যালেনের পরীক্ষা থেকেই প্রথম জানা গেলো পৃথিবীর চারপাশে এরকম রেডিয়েশন বেল্টের কথা। তার নামেই এই বেল্টের নামকরণ করা হয়েছে।"

এসব কসমিক রশ্মি আসে ডিপ স্পেস অর্থাৎ আমাদের সৌর জগতেরও বাইরে থেকে। এক্সপ্লোরার ওয়ানের মাধ্যমেই এই রেডিয়েশন বেল্টের কথা প্রথম জানা গেল এবং জানা গেলো সেটা পৃথিবীর খুব কাছে কাছে। আর সেই আবিষ্কারকে ভিত্তি করেই আজকের মহাকাশে ন্যাভিগেশন, আবহাওয়া , যোগাযোগ ইত্যাদি কাজে স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ-সপ্তাহের বিজ্ঞানের আসর পরিবেশন করেছেন মিজানুর রহমান খান।