জোড়া মাথার জমজ শিশু রাবেয়া-রোকেয়াকে কি আলাদা করা সম্ভব?

বাবা-মায়ের সাহায্য ছাড়াই হাটতে পারে মাথায় জোড়া লাগানো জমজ শিশু রাবেয়া-রোকেয়া। ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption বাবা-মায়ের সাহায্য ছাড়াই হাটতে পারে রাবেয়া-রোকেয়া।

বাংলাদেশে মাথায় জোড়া লাগানো জমজ শিশু রাবেয়া-রোকেয়ার প্রথম ধাপের অপারেশন সফল হওয়ার পর এখন পরবর্তী ধাপের অপারেশনে তাদের আলাদা করতে বেশ আশাবাদী চিকিৎসকরা।

তারা জানিয়েছেন, রাবেয়া-রোকেয়ার দ্বিতীয় ধাপের অপারেশন হবে আগামী মে মাসে। আর শেষ দফায় অপারেশন হবে অগাস্টে।

এদিকে প্রথম দফা অপারেশনের পর এখন বেশ সুস্থ্য ২০ মাস বয়সী জমজ শিশু রাবেয়া-রোকেয়া।

আরো পড়ুন:

কুয়েতে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হবার কারণ কী?

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে রিপাবলিকানরা উদ্বিগ্ন কেন?

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেয়া কতটা কঠিন?

কিভাবে চালানো হয় অনলাইনে রুশ 'প্রচারণা যুদ্ধ'?

উড়ন্ত বিমানে 'উলঙ্গ হয়ে তরুণ যাত্রীর পাগলামি'

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
জোড়া মাথার জমজ শিশু রাবেয়া-রোকেয়াকে কি আলাদা করা সম্ভব?

রাবেয়া-রোকেয়া'র প্রথম ধাপের অপারেশনের দুই দিন পর গত শনিবার তাদের দেখতে যাই ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে।

রাবেয়া-রোকেয়াকে যে কেবিনে রাখা হয়েছে সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম অন্য আর দশটা শিশুর মতোই চঞ্চল সুরে বাবাকে কিছু একটা বলছে রাবেয়া।

এর প্রতিক্রিয়ায় রোকেয়াও হাত নেড়ে বাবার কাছে কিছু একটা বলতে শুরু করলো।

দেখেই বোঝা যায়, প্রথম দফার অপারেশনের ধকল কাটিয়ে শিশু দুটি এখন বেশ সুস্থ্য। তাদের এখন দিন কাটছে আগের মতোই হেসে-খেলে।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption দুই জমজ বোনই খেলতে বেশ পছন্দ করে

রাবেয়া-রোকেয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম জানালেন, "রাবেয়া তুলনামূলক একটু বেশি চঞ্চল। আর রোকেয়া একটু ধীরস্থীর। তাদের শান্ত রাখতে একই খেলনা দিতে হয়। অনেক সময় অন্য শিশুদের মতোই খেলনা নিয়ে কাড়াকাড়িও করে। দুইজনই খুব বাবা ভক্ত।"

তাদের মা তাসলিমা খাতুন বলছিলেন, "ওরা যে জোড়া লাগানো, সেটা এখনো বুঝতে পারেনা। আমি ওদেরকে বড় আয়নার সামনে নিয়ে গেলেও ওরা নিজেদেরকে দেখে না। খেলার দিকেই মনোযোগী থাকে। ওদের সমস্যটা ওদের কাছে কোন সমস্যাই না।"

কিন্তু রাবেয়া-রোকেয়া'র বাবা-মা জানেন, এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না।

শিশুরা বড় হলেই বুঝতে শিখবে, অনিশ্চিত হয়ে উঠবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে।

এখন তাই তারা অপেক্ষায় পরবর্তী ধাপের অপারেশনের।

কিন্তু অপারেশনে কী হবে তা নিয়েও দু:শ্চিন্তার শেষ নেই বাবা-মা'র।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption রাবেয়া-রোকেয়ার মা তাসলিমা খাতুন

মা তাসলিমা খাতুন বলছিলেন, "অপারেশনে বাচ্চাদের কোন ক্ষতি হবে কি-না, কতটা কষ্ট পাবে তা নিয়ে সবসময়ই খারাপ লাগে।"

"ওদেরকে যখন প্রথম অপারেশনের জন্য নেয়া হচ্ছিল। আমিই তাদেরকে অপারেশন থিয়েটারে শুইয়ে দিয়ে আসি। আসার সময় দুইজনই আমার কাপড় ধরে টানছিলো। একজনের হাত থেকে মুক্ত হতে না হতেই অন্য জনের দুই হাত এসে আমাকে জড়িয়ে ধরছিলো। ছাড়তেই চায় না। আমি যে কত কষ্টে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েছি, সেটা আসলে বলার উপায় নেই।" শেষ দিকে কান্নায় গলা ধরে আসে তসলিমা খাতুনের।

কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যত ভেবে অপারেশনের ঝুঁকিপূর্ণ পথই বেছে নিয়েছেন তারা।

কিন্তু বাংলাদেশে অপারেশনের মাধ্যমে সারা বিশ্বেই দুর্লভ এরকম জমজ শিশু রাবেয়া-রোকেয়াকে আলাদা করা কী আদৌ সম্ভব হবে?

তবে চিকিৎসকরা অবশ্য আশাবাদি।

ইতোমধ্যেই শেষ হওয়া প্রথম দফা অপারেশনে রাবেয়া-রোকেয়ার মাথায় যে যুক্ত রক্তনালি রয়েছে, তা বন্ধ করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এতে করে চূড়ান্ত অপারেশনে রক্তক্ষরণ কম হবে এবং ঝুঁকি কমবে বলেই মনে করছেন তারা।

দুই মাস পর দ্বিতীয় ধাপের অপারেশনে তাদের মাথায় চামড়া প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি করা হবে। এর দুই মাস পরে অগাস্টে জোড়া মাথা আলাদা করার জন্য হবে চুড়ান্ত অপারেশন।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption প্রথম ধাপের অপারেশনে অংশ নেয়া চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জন মো. শফিকুল ইসলাম বলছেন, অপারেশনের মাধ্যমে শিশুদুটিকে আলাদা করা সম্ভব

প্রথম অপারেশনে অংশ নেয়া চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জন মো. শফিকুল ইসলাম বলছিলেন, "ওদের মাথায় কিন্তু নতুন চামড়া লাগাতে হবে। মাথা যখন আলাদা করা হবে তখন এর দরকার হবে। এর জন্য দ্বিতীয় দফায় অপারেশনে চামড়া বিস্তৃত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে, যেন পরে মাথার খোলা অংশে চামড়া প্রতিস্থাপন করা যায়। এটি হবে মে মাসের শুরুতে। এরপরের ধাপ হচ্ছে দুই মাথার পৃথকীকরণ। আমরা যতদূর দেখেছি, কিছু কমন স্ট্রাকচার সেখানে আছে। তবে সেটা আলাদা করা যাবে। আমরা আশাবাদি।"

"তাদের চূড়ান্ত অপারেশনে বড় জটিলতা ছিলো রক্তক্ষরণ সামলানো। কারণ, রক্তক্ষরণ বেশি হলে মৃত্যু কিংবা ব্রেইন ড্যামেজ কন্ট্রোল করা কঠিন। প্রথম দফা অপারেশনে রক্তনালি বন্ধ করে দেয়ায় এখন রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অপারেশনে হাঙ্গেরি থেকেও দুই জন ডাক্তার থাকবেন।"

বাংলাদেশে এর আগেও মাথায় জোড়া লাগানো জমজ শিশু জন্মের ঘটনা ঘটেছিলো ২০০৯ সালে।

তবে তৃষ্ণা এবং কৃষ্ণা নামে সেই জমজ শিশুর অপারেশন হয় অস্ট্রেলিয়ায়। অপারেশনটি সফলও হয়।

অপারেশনের পর থেকেই তৃষ্ণা এবং কৃষ্ণা রয়েছে অস্ট্রেলিয়াতেই। তারা সেখানে আছে ময়রা কেলি নামের একজন মানবাধিকার সংগঠকের অধীনে।

ছবির কপিরাইট WILLIAM WEST
Image caption অপারেশনের মাধ্যমে মাথায় জোড়া লাগানো জমজ শিশু তৃষ্ণা-কৃষ্ণাকে সফলভাবে আলাদা করা হয়েছিলো ২০০৬ সালে।

তৃষ্ণা-কৃষ্ণার সর্বশেষ অবস্থা জানতে আমরা বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করি ময়রা কেলি'র সঙ্গে।

তিনি ই-মেইলে জানান, "তৃষ্ণা-কৃষ্ণার বয়স এখন এগারো। তারা সুস্থ্য আছে এবং আলাদা দুটি স্কুলে পড়াশোনা করছে।"

রাবেয়া-রোকেয়ার বাবা-মাও এখন আশায় আছেন, তাদের সন্তানও ফিরতে পারবে স্বাভাবিক জীবনে।