সামাজিক মাধ্যমে নারী: 'একবারই কমেন্ট করেছিলাম একটি বাংলা পত্রিকার নিউজে, তারপরে গালাগালির বন্যা!'

প্রতিদিন ফেসবুকে একাধিকবার লগ ইন করেন এমন মানুষ এখন বাংলাদেশে অনেক। ছবির কপিরাইট BBC bangla
Image caption প্রতিদিন ফেসবুকে একাধিকবার লগ ইন করেন এমন মানুষ এখন বাংলাদেশে অনেক।

বাংলাদেশের সরকারী হিসেবে যে আট কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন তার বড় অংশই নারী। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উন্মুক্ত ফোরামে পুরুষদের যত জোরালোভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায়, সেই তুলনায় নারীদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।

অনেক নারী বলছেন, তারা যেকোনো মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কিংবা পাবলিক পোস্টে কমেন্টের ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েন, নানা বাজে মন্তব্যের শিকার হতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন পুরুষ যত সহজে তার মতামত প্রকাশ করতে পারেন, একজন নারীও কি সেভাবে পারেন? বাংলাদেশে নারীদের অনেকেই উত্তরে বলছেন 'না'। কেন?

ঢাকার রত্না আক্তার বলেন, তিনি ফেসবুকে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন কিন্তু এখন আর সহজ বোধ করেন না, তার ব্যক্তিগত মতামত সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরতে। কারণ ট্রল করা হয়, বাজে মন্তব্য করা হয়।

" দেখা গেল ফেসবুকে কিছু লিখেছি পোস্ট করেছি সেখানে পরিচিত অপরিচিত বিভিন্ন লোকজন বাজে কমেন্ট করে। ট্রলও করা হয়। একবার আমার একটি পোস্ট পরিচিত একজন কপি করে সেটি শেয়ার দিয়েছে এবং সাথে বাজে কিছু কথা যোগ করেছে। পরে সেখানে আরও অনেকে বাজে কমেন্ট করেছে যা খুব অপমানজনক। এটা কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়, ছেলেদের ক্ষেত্রে হয়না।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption অনেক নারী বলছেন, তারা যেকোনো মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কিংবা পাবলিক পোস্টে কমেন্টের ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েন, নানা মন্তব্যের শিকার হতে হয়। (ফাইল ফটো)

রাজনৈতিক বা সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে মেয়েরা সোশ্যাল মিডিযাতে সরব ভূমিকা নিলে সেখানেও পুরুষদের দ্বারা বাড়তি আক্রমণের মধ্যে পড়তে হয় মেয়ে বলে - বলছিলেন জিনাত জোয়ার্দার রিপা নামে আরেকজন নারী।

তিনি জানালেন এ কারণে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ফেসবুকে লিখতে গেলে রীতিমত চিন্তা-ভাবনা করে লিখতে হয়।

"একটা সময় আমি অনেক বিষয়ে লিখতে পারতাম। কিন্তুএখন আমাকে পাঁচবার ভাবতে হয়। চিন্তা করতে হয় কি লিখবো, কে দেখবে, কি ভাববে? রাজনৈতিক কিছু লিখো সেখানে হয়তো কেউ এমন কমেন্ট করলো যা আমাকে আহত করছে। দেখা গেল আমি যা ভেবে লিখেছি তাতে সে কানেক্ট করতে না পেরে তার চিন্তা আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।"

এমন প্রেক্ষাপটেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু মেয়েরা মিলেও ক্লোজড গ্রুপ তৈরি করছেন- যেখানে তাদের নিজেদের ভাল লাগা, মতামত, তারা শেয়ার করছেন। একে অন্যের প্রয়োজনে পাশে দাড়াচ্ছেন। ফেসবুকে এমনই একটি প্ল্যাটফর্ম ফেমিনা গড়ে তুলেছেন মিজ জোয়ার্দার। তিনি বলছিলেন, কেন এমন প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন মনে হলো।

"আমি হয়তো একজন মেয়ে হিসেবে কোন শাড়ির সাথে কেমন সাজবো সেটা জানতে চাইতে পারি-কিন্তু একজন পুরুষ সেখানে বাজে কমেন্ট করবে। এ কারণে আমরা মেয়েদের একটা পাতা খুলেছি। শুধূ সাজগোজের বিষয় না সেখানে প্রাণখুলে মেয়েরা যেকোন বিষয়ে আলাপ করবে। মেয়েরা মেয়েদের বন্ধু হবে।"

সমাজের অনেক স্তরের মত সামাজিক মাধ্যমেও পুরুষদের আধিপত্য নারীদেরকে বিভিন্ন ভাবেই তাড়িত করছে ।

ফলে সেখানে আইনের প্রয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও বেশি প্রভাব রাখতে পারে সামাজিক পরিবর্তন। বলছিলেন সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মনিুরল ইসলাম খান।

"এটা সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়। আইন দিয়ে সামাজিক পরিবর্তন হয়না। তবে আইন এর কন্ট্রিবিউশন আছে । তাই একে উপেক্ষা করলে হবেনা।"

নিজেদের ছবি দেয়ার কারণেও অশ্লীল এবং মানহানিকর মন্তব্যের শিকারও হতে হয়। এমন অভিজজ্ঞতার কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে অনেক মেয়েরা এখন ইনস্ট্রাগ্রামে ছবি পোস্ট করছেন।

তিনি বলেন,"একবার আমার একটি ছবির নিচে এমন বাজে কমেন্টএলো লিখলো "আমার সাথে থাকবেন? কত টাকা লাগবে?"

পরে ছবিটি ডিলিট করে ফেলতে বাধ্য হন এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীটি।

বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতায় নারীদের কিছু কমেন্ট

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিশেষ করে ফেসবুকে পাবলিক পোস্টে কমেন্ট বা লাইক দেয়ার পর বিড়ম্বনার শিকার হতে হওয়ার কোন অভিজ্ঞতা থাকলে তা জাানতে বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতায় আহ্বানে সাড়া দিয়ে নারীরা যেসব কমেন্ট লেখেন সেখানে ফারহানা রহমনা নামে একজন লিখেন, "আমার একবারই হয়েছিল এ অভিজ্ঞতা!! আসলে ঐ একবারই কমেন্ট করেছিলাম একটি বাংলা পত্রিকার নিউজে. তারপরের ঘটনা ভয়াবহ!! গালাগালির বন্যা!!! এবং একসময় সেই সব কাপুরুষ গুলা আমার প্রোফাইলে ঢুকতে ও আমাকে মেসেজ পাঠানোর চেষ্টা শুরু করল. যাই হোক ফেসবুক প্রাইভেসির কারনে সে যাত্রায় আমার আই ডি টা বেঁচে গিয়েছিল!! এরপর আর জীবনেও ওমুখো হইনি!!!"

সুরাইয়া পারভিন শোভা লেখেন, " যতবার কোন ডেইলি নিউজপেপারের কোন নিউজে কমেন্ট করি, প্রায় ততবার ভুগতে হয়। অচেনা অজানা মানুষের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, আজে বাজে মেসেজে- এসব আসতে থাকে। যেটা সম্পূর্ণ অবান্তর, বিরক্তিকর এবং বিব্রতকর।"

দিনা আকতার বলেন, " হ‍্যা ,আমাকেও অনেক বার এরকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি কোন পোষ্ট এ মতামত প্রকাশ করতে গেলে প্রায়শই আপত্তিকর কথা শুনতে হয়। তাই আমাকে আমার ছেলে নাম এর ফেইক আইডি থেকে কমেন্ট করতে হয় এবং ফেইসবুক এ মতামত প্রকাশ করতে হয়। এমনকি বিবিসি এর নিউজ এ কমেন্ট করতে গেলেও আমাকে এমন বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। মোটকথা আমার নিজের আইডি থেকে কোন কমেন্ট বা কোন পোষ্ট করার আগে আমাকে বহুবার ভাবতে হয় এই কমেন্ট বা পোষ্ট করলে আমি কোন নোংরা কমেন্ট এর মুখোমুখি হব কিনা। একজন নারী হিসেবে স্বাধীনভাবে আমি আমার মতামত প্রকাশ করতে পারছি না।"

আফরিন লিজার কমেট, "নারীরা কোন মন্তব্য করা মাত্রই তার উত্তরে অশ্লীল মন্তব্য,, নারী পুরুষ সবার নৈতিকতার অভাব, মানুষের লজ্জা উঠে গেছে,"

নাদিয়া শোভা উল্টো ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, " তা আপনারা কি এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন নাকি শুধু ফাজলামোর জন্য এই পোস্ট টা করছেন? 😡"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে যেসব নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের ৭০ শতাংশের বেশি নানাভাবে অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিশেষ করে ফেসবুকে পাবলিক পোস্টে কমেন্ট বা লাইক দিলে প্রায়ই নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে নারীদের। অনেক সময় কমেন্ট বা পোস্ট নিয়ে বাজে ধরনের ট্রলও হয়।

শুধু ট্রলের শিকার হওয়া নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মত প্রকাশের কারণে হুমকিরও শিকার হতে হচ্ছে। নারীদের সামাজিক মাধ্যমে হুমকি, ব্ল্যাকমেইলিং বা হয়রানির মুখে পড়লে সেক্ষেত্রে কি ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব?

পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তা আলিমুজ্জামান বলেন, আইন এসব ঘটনার কে।সত্রে অভিযোগ এলে তথ্য প্রযুক্তি আইন, কিংবা পনোর্গ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং দণ্ডবিধি আইন, নারী নির্যাতন দমন আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারেন তারা। এবং বিভিন্ন ধরনের সাজার বিধান রয়েছে।

তিনি জানান তাদের কাছে যত অভিযোগ বা মামলা আসে সাইবার ক্রাইম বিষয়ে তার ৭০ ভাই আসে মেয়েদের কাছ থেকে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমে বিচরণ নেই এমন নারী পুরষের সংখ্যা ক্রমে কমে আসছে। এই মাধ্যমকে ঘিরে পরিচয় বন্ধুত্ব প্রেম বিয়ে বিচ্ছেদ যেমন চলছে, নানা ধরনের খবরের উৎস, প্রচার-প্রচারণা সবকিছুর জন্য ব্যবহারও করা হচ্ছে ফেসবুক টুইটারসহ প্ল্যাটফর্মগুলোকে। কিন্তু তারপরও সব বয়সী মানুষের মাঝে সামাজিক মাধ্যম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও, এখনও সেখানে নারীরা স্বস্তিকর পরিবেশ খুজে ফিরছেন বলেই প্রতীয়মান হয়।

আরু পড়ুন:

মুসলিমদের ওপর বৌদ্ধদের সহিংসতা ঠেকাতে হিমশিম শ্রীলঙ্কা

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সামরিক শক্তির পার্থক্য কতটা?

'মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি অংশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আটকাতে চায়'

সম্পর্কিত বিষয়