বিমান পরিবহন খাতে নেপাল দুর্ঘটনার প্রভাব কি দীর্ঘমেয়াদি হবে?

নেপাল বিমান দুর্ঘটনা ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ল্যান্ডিং করার সময় দুর্ঘটনায় পতিত হয় বিমানটি

নেপালে ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বস্তের পর যাত্রীদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছে তার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রুটে যাত্রী হারাচ্ছে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো। বিশেষত: নেপালগামী ফ্লাইটে এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে জানাচ্ছে কোন কোন পরিবহন সংস্থা।

তবে এই প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে খুব একটা ক্ষতির কারণ হবে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর উত্তরায় থাকেন অলিউল ইসলাম ও হুসনা বানু দম্পতি।

চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে দুই সন্তানসহ নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। টিকেট বুকিংসহ আনুষঙ্গিক সব প্রস্তুতিও সেরে ফেলেছিলেন।

আরো পড়ুন:

দীর্ঘশ্বাসে ভারী আর্মি স্টেডিয়ামের বাতাস

নেপালে ট্যুর বাতিল করছে আতঙ্কিত যাত্রীরা

ছবিতে নেপালে বিমান দুর্ঘটনা

'পরিবার চায়নি একমাত্র সন্তান পাইলট হোক'

কিন্তু নেপালে বিমান দুর্ঘটনার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তারা।

হুসনা বানু বলছিলেন, "যখনি নেপালে বিমান ক্রাশের খবর পাই, এরপর থেকেই মনের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে। এমনকি বাচ্চারাও আর সেখানে যেতে চাইছিলো না। শেষ পর্যন্ত আমরা এই ট্যুরের পরিকল্পনাই বাতিল করে দেই।"

দুর্ঘটনার পর হুসনা বেগমের মতো অনেক যাত্রীই এখন আকাশপথের ভ্রমণ নিয়ে রয়েছেন আতংকের মধ্যে। এর প্রভাবও পড়ছে বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর ওপর।

নেপালে ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বস্তের পর স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স।

যাত্রী এবং এয়ারক্রাফট সংকটে প্রতিষ্ঠানটির নেপালগামী সব ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য।

এছাড়া অন্য রুটেও ঘটছে টিকেট বাতিলের ঘটনা।

কিন্তু অন্য পরিবহন সংস্থাগুলোতে কী প্রভাব পড়ছে?

জানতে চাইলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিমানের মুখপাত্র শাকিল মেরাজ জানিয়েছেন, নেপালগামী ফ্লাইটে যাত্রী হারাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption বাংলাদেশ বিমানের মুখপাত্র শাকিল মেরাজ বলছিলেন, নেপাল দুর্ঘটনার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ বিমানের নেপালগামী ফ্লাইটে

তিনি বলছিলেন, "সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে কাঠমান্ডু সেক্টরে আমাদের উপর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যারা ছুটি কিংবা অবসর কাটাতে নেপালে যান এধরণের কিছু গ্রুপ বুকিং বাতিল হয়েছে। দুর্ঘটনার পর নেপালে যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে।"

তবে নেপাল বাদে বিমানের অন্য রুটের ফ্লাইটগুলোতে যাত্রী সংখ্যায় তেমন হেরফের নেই বলে জানান তিনি।

বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা নভো এয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুল ইসলাম অবশ্য বললেন, নেপাল ট্রাজেডির পর তাদের পরিবহনেও এর "খানিকটা প্রভাব" পড়েছে। তবে সেটা খুব বেশি ক্ষতির কারণ হবে না বলেই আশা করছেন তারা।

বাংলাদেশে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর বেসরকারি খাতে যাত্রী পরিবহন সেবা চালু হয় ১৯৯৬ সালে।

এরপর একে একে ১২টি বেসরকারি কোম্পানি এই খাতে এলেও লোকসানে পড়ে ৯টি প্রতিষ্ঠানই গুটিয়ে নেয় তাদের ব্যবসা।

নানা প্রচেষ্টার পর এখনো বিমান পরিচালনার ব্যবসা খুব একটা লাভজনক খাত হিসেবে গড়ে ওঠেনি বাংলাদেশে।

এমন অবস্থায় নেপালের এই দুর্ঘটনায় বিমান পরিবহন খাতে যে ক্ষতিকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে?

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ড. এম এ মোমেন বলছেন, নেপালে ইউএস বাংলার বিমান দুর্ঘটনা বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হবে না।

বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিজেন্ট এয়ারের সাবেক সিইও ড. এম এ মোমেন বলছিলেন, "নেপালের দুর্ঘটনা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এর কোন না কোন প্রভাব তো পড়বেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাদের এখানে বিমান পরিবহন ব্যবসায় যাত্রীর সংখ্যা কিন্তু ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ এখানে জোগানের চেয়ে চাহিদা বেশি। এবং এখানে ট্যুরিস্টের চেয়ে কাজের প্রয়োজনে বিমান ভ্রমণ বেশি হয়। সুতরাং আমাদের দেশে এর ইম্প্যাক্ট খুব বেশি হওয়ার কথা না। এটা বেশিদিন থাকবে না।"

তার মতে, এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের আস্থা কতদ্রুত ফেরাতে পারছে তার উপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু।

তিনি বলছিলেন, "যাত্রীদের মধ্যে অবশ্যই একটা ভীতি কাজ করছে। এক্ষেত্রে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের উচিত হবে যাত্রীদের আশ্বস্ত করা। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। ...নেপাল দুর্ঘটনার তদন্ত শেষে যদি আহত-নিহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় এবং তদন্তের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাহলে সেটা যাত্রীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।"

কিন্তু যাত্রীদের উদ্বেগ কমাতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলো?

বেসরকারি রিজেন্ট এয়াওয়েজের সিইও লে. জে. (অব.) এম এফ আকবর বিবিসিকে বলছিলেন, "যাত্রীদের মানসিক উদ্বেগ বা আতংক কাটাতে আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্নভাবে তাদের আশ্বস্ত করতে। আমাদের নিরাপত্তা পদক্ষেপগুলো তাদের জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে বিমানের ফিটনেস, পাইলট ও কেবিন ক্রুদের প্রশিক্ষণসহ আনুষঙ্গিক সকল বিষয় রিফ্রেশ করা হচ্ছে।"

আরো পড়ুন:

বিদেশীদের যৌন কাজের টার্গেট হচ্ছে রোহিঙ্গা মেয়েরা

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের পদত্যাগে সু চি'র কী লাভ?

নিউটন ও ডারউইনের পাশে সমাহিত হবেন হকিং

দীর্ঘশ্বাসে ভারী আর্মি স্টেডিয়ামের বাতাস

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
নেপাল বিমান দুর্ঘটনা: চলছে স্বজনদের শোকের মাতম