কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নেতাদের মধ্যে বিরোধ কেন?

ছবির কপিরাইট Allison Joyce
Image caption অনেকের অভিযোগ, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সরকার কওমী মাদ্রাসার ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমর্যাদা দেবার আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যেই কওমী শিক্ষা বোর্ডের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

দাওরায়ে হাদিসকে এম.এর সমান স্তরের ডিগ্রি হিসাবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার পর এখন এর আইনি প্রক্রিয়া চলছে।

কিন্তু এরই মধ্যে কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠন দাবি করছে, তাদের আন্দোলনের ফসল হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও, সনদ দেয়ার জন্য যে সমন্বিত একক বোর্ড গঠনের কার্যক্রম চলছে, সেখানে চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদ্রাসার আহমদ শফির নেতৃত্বাধীন বেফাকের নেতারাই আধিপত্য তৈরি করছেন এবং অপর পাঁচটি শিক্ষা বোর্ড গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে।

কওমি শিক্ষা সনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা ইয়াহইয়া মাহমুদ বলছেন, ''মৌলিকভাবে আমাদের আপত্তির জায়গাগুলো হলো, প্রধানমন্ত্রী বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াসহ অন্য আরো পাঁচটি বোর্ডসহ এই কওমি শিক্ষা সনদের ঘোষণা দিয়েছেন। ছয়টি বোর্ডকেই জাতীয় বোর্ডের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।"

"কিন্তু সেখানে এই বেফাকুল বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইনের খসড়া এমনভাবে পেশ করেছে যে, যেখানে আগামীতে আমরা স্বেচ্ছাচারিতার আভাস পাচ্ছি। এবং এই বোর্ডগুলোকে একেবারে গৌণ করে দেয়ার একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।''

''আমাদের আশংকা হয়, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই স্বীকৃতির জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশংকা বোধ করছি আমরা।''

কিন্তু কেন এই বিরোধ?

গত এপ্রিলে সরকারি স্বীকৃতির ঘোষণা আসার পর দেশে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ছয়টি শিক্ষা বোর্ড নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, যারা সনদের বিষয়গুলো দেখভাল করবে। এর নাম দেয়া হয় আল-হাইয়াতুল উলাইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।

এর মধ্যে এই কমিটি সনদ কার্যক্রমের জন্য একটি খসড়া কার্যবিধিও জমা দিয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ছেলে হারানো ইমামের মাইকিং ঠেকিয়ে দিল আরেকটি দাঙ্গা

'শিরশ্ছেদ ভুল ছিল': আইএসের গলাকাটা গ্রুপের দুজন

দেশের হয়ে আর খেলা হবে না, মেনেই নিয়েছেন ওয়ার্নার

গাজায় ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতে এত মৃত্যু কেন?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption কওমী মাদ্রাসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন রমনমভ

নতুন এই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় হাটহাজারি মাদ্রাসার আহমদ শফিকে। অপর বোর্ডগুলোর সদস্যদের উপস্থিতি থাকলেও, তারা এখন অভিযোগ করছেন যে, কমিটিতে চেয়ারম্যান নতুন করে নিজের লোকদের সদস্য করে তাদের গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে।

ইয়াহইয়া মাহমুদ বলছেন, ''নতুন করে সদস্য বাড়ানো আর কোরাম ভিত্তিক করায়, এখন তারা নিজেরাই যে কোন বিষয়ে আমাদের কোন মতামত ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে। কিন্তু আমাদের দাবি, কোরাম করে নয়, যেন যেকোনো সিদ্ধান্ত বা বৈঠকে সব বোর্ডের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।''

তবে অভিযোগ মানতে রাজি নন বেফাকের নেতা ও হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য মাওলানা মাহফুজুল হক।

তিনি বলছেন, ''অভিযোগটা ঠিক না। এখানে বেফাক হলো অনেক বৃহৎ একটি বোর্ড। তাদের হয়তো সব মিলিয়ে চার পাঁচ হাজার মাদ্রাসা আছে, কিন্তু শুধু বেফাকেরই আছে ১৫হাজারের বেশি। সেই তুলনায় তাদের সাথে কোন ধরণের অনৈতিক আচরণ করা হয়নি। কিন্তু তারা বেশি আশা করে।''

কিন্তু কওমি মাদ্রাসায় নেতৃত্বের এই প্রশ্নে আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ কি তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে না?

মি. হক বলছেন, ''কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বেফাক যদি ন্যায্য ভাবে আগায়, সেটিতে খুব বেশি কিছু হবে না।''

তিনি বলেন, ''এই বিষয়ে একটি খসড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমাও দেয়া হয়েছে। এখন তো সেখানে পরিবর্তন করা সম্ভব না।''

কওমি মাদ্রাসাগুলো এই স্বীকৃতি নিয়েও দেশের ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

তাদের দাবি, স্বীকৃতি পেলেও, দেশের প্রচলিত বা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও তাদের অনেক পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে।

আহলে সুন্নত নামের একটি সংগঠন বলছে, দেশের সব মাদ্রাসায় একই ধরনের পাঠ্যক্রম অনুসরণ না হলে কোরআন ও হাদিসের ভিন্ন ব্যাখ্যার আশংকা থাকে।

যারা এই অবহেলার কথা বলছেন, তাদের একটি পক্ষে রয়েছেন সরকার সমর্থক হিসাবে পরিচিত মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদসহ আরো কয়েকজন ধর্মীয় নেতা।

ছবির কপিরাইট FARJANA K. GODHULY
Image caption বাংলাদেশে মাদ্রাসাগুলোর জন্য দুটি স্বতন্ত্র বোর্ড রয়েছে

অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের নেতা ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার প্রধান আহমদ শফির সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সমঝোতার বিষয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে পুরো বিষয়টিকে নতুন গঠিত বোর্ডের নিয়ন্ত্রণের লড়াই বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।

নতুন এই বিরোধের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডের কোন কর্মকর্তা।

তবে শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ মনে করেন, নতুন এই মতবিরোধ কারো জন্যই ভালো হবে না।

তিনি বলছেন, ''এমনিতেই বাংলাদেশের আলেম সমাজ বহুধা বিভক্ত। তার মধ্যে আবার এই বিরোধ নিশ্চয়ই খুব খারাপ নজীর। সরকার তাদের এক করে নিয়ে আসছিলেন, সেখানে যখন তাদের মধ্যে এই বিরোধটা স্পষ্ট হবে,তখন তো তাদের সনদের এই প্রক্রিয়াটিও খানিকটা ধীরগতির হবে।''

তিনি বলছেন, ''এতদিন এই কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এখন সরকার তাদের মূলধারার সঙ্গে একত্রিত করে তাদের চাকরি বাকরি, অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে একটি সমন্বিত সহনশীল অবস্থা তৈরি করা, বাংলা-ইংরেজি, দেশজ শিক্ষা বা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, সেটাই তো বাধাগ্রস্ত হবে বলে আমার মনে হচ্ছে।''

কওমি মাদ্রাসাগুলোর সনদ প্রদানের বিষয়টি এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য রয়েছে।

কিন্তু নেতৃত্বের এই বিরোধ সেখানে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে আশংকা করছেন।