কবিরাজের কাছে গিয়ে 'জ্বিনের হাতে মৃত্যু'

ভারতে কবিরাজি চিকিৎসা, ফাইল ফটো ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতে কবিরাজি চিকিৎসা, ফাইল ফটো

বাংলাদেশের কুমিল্লায় কবিরাজি চিকিৎসার নামে তিন বছরের একটি শিশুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে কবিরাজ ও তার খাদেমের বিরুদ্ধে । এ অভিযোগে শিশুটির মায়ের দায়ের করা মামলায় দু'জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যদিও অভিযুক্ত করিবাজ পলাতক রয়েছেন।

বাংলাদেশের বহু মানুষ এখনো কবিরাজ, সাধক বা পীরের ঝাড়ফুঁকের মত অপ্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থা রাখেন। যদিও এধরনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রায়শই নির্যাতন ও প্রতারণার অভিযোগও শোনা যায়। কিন্তু তবু কেন চলছে এই কবিরাজি চিকিৎসা?

তিন বছরের শিশু শেখ ফরিদকে হত্যার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ জানায়, ছেলেটি বেশি দুষ্টুমি করে, তাই তার চিকিৎসা করাতে শুক্রবার সকালে অভিযুক্ত কবিরাজ মাহবুবুর রহমানের কাছে বাচ্চাকে নিয়ে যান তার মা। কবিরাজ তিনদিন পর বাচ্চাটিকে নিয়ে যেতে বলেছিল পরিবারকে। এরপর শনিবার দুপুরে কাফনে মোড়ানো শিশুটির মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে পাঠানো হয়। বলা হয়, শিশুটিকে জিনে মেরে ফেলেছে।

আরো পড়তে পারেন:

মালালা'র প্রত্যাবর্তন পাকিস্তানের মানুষ কিভাবে নিয়েছে?

বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষায় এবার 'প্রশ্নফাঁস হবে না'

মার্কিন ভিসা পেতে ফেসবুক একাউন্টের তথ্য দিতে হবে

এভারেস্টে ওঠা কি এতোই সহজ তার কাছে?

কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু সালাম মিয়া বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গতরাতে এবিষয়ে একটি হত্যা-মামলা দায়ের করা হয়েছে।

"বাচ্চাটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে। মুখেও.....ফোলা এবং থ্যাতলানো সব জখম। গত সন্ধ্যায় অভিযোগ পেয়ে আমরা লাশ নিয়ে সুরতহাল করানোর জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি। খাদেম এবং মাইক্রোবাসের ড্রাইভারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর কবিরাজ পলাতক রয়েছে।"

বাংলাদেশের বহু মানুষ এখনো কবিরাজ, সাধক, পীর বা ওঝার ঝাড়ফুঁকে আস্থা রাখেন। বিভিন্ন সময় অবাস্তব এবং অবিশ্বাস্য সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সংবাদপত্রে বা স্থানীয় কেবল অপারেটরদের চ্যানেলে বিজ্ঞাপনও দেখা যায় অহরহ। আর অনেক শিক্ষিত মানুষেরাও দ্বারস্থ হন এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার।

যেমন ঢাকার বাসিন্দা মনজুর আলম, পেশায় একজন ঠিকাদার। কিডনি রোগে কয়েক বছর ভুগে ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে, শেষ পর্যন্ত এখন একজন কবিরাজের চিকিৎসা নিচ্ছেন।

"আমি অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি সব জায়গায় গেছি, কিন্তু ফল পাইনি। শেষে আমাদের গ্রামের একজন মুরুব্বি বললেন, একজন কবিরাজ আছে। উনি গাছগাছড়া দিয়ে চিকিৎসা করেন। আমার মা বললেন সবই তো দেখাইছো, একবার এখানে দেখাও," বলেন তিনি।

"এখানে আমি আট-নয় মাস ধরে যাচ্ছি, আল্লাহর রহমতে আগের চেয়ে ভালো আছি।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption এভাবেও চলে মানসিক চিকিৎসা, ফাইল ফটো

কিন্তু এধরণের অপ্রাতিষ্ঠানিক সেবার ক্ষেত্রে প্রায়ই প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ শোনা যায়। গত অক্টোবরে রাজশাহীতে কবিরাজের নির্যাতনে মারা যায় ১২ বছর বয়সী এক স্কুল-ছাত্র। ডিসেম্বরে কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় মারা গিয়েছিল কিশোরগঞ্জের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী। এছাড়া কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দোয়া কুরিয়ার করে পাঠানোর মত প্রতারণাপূর্ণ বিজ্ঞাপনও দেখা যায়।

কিন্তু মানুষ কেন এসব ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে? জিজ্ঞেস করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবালের কাছে। তিনি বলছেন, এ ধরণের বিশ্বাস বা মনস্তত্ত্বের পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরো পড়তে পারেন:

ধর্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের এক টিভিতে হাস্যরসের পর ফেসবুকে সমালোচনার ঝড়

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দেশ আফগানিস্তান: 'সবকিছুর মূলে বিদেশিরা'

ট্যাম্পারিং হাতেনাতে ধরেছি বহু, লাভ হয়নি - ইংলিশ আম্পায়ার জন হোল্ডার

"এখন একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ফি এক হাজারের নিচে নাই। এই সামর্থ্য কতজনের আছে, তা দেখতে হবে। তারপর পরীক্ষা নিরীক্ষার ঝামেলাও আছে।"

তিনি বলেন, "এছাড়া মেডিক্যাল ফ্যাসিলিটি সবখানে তো ঠিকঠাক মতো নেই। অনেক জায়গায় হাসপাতাল নেই, কোথাও ডাক্তার নেই। আর অ্যাম্বুলেন্স বা অপারেশনের সুবিধাও অনেক জায়গায় নেই। আর বিশ্বাস কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির অংশ। মানুষ পারিবারিকভাবেও বিশ্বাস করে।"

অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল আরো বলছেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো এবং সেটি সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে পারলেই একমাত্র এ ধরণের সমস্যার সমাধান সম্ভব।

সম্পর্কিত বিষয়