মিছিলের গান থেকেই কি এসেছিল ভারতের আসানসোলের দাঙ্গার উস্কানি

ছবির কপিরাইট Sanjay Das
Image caption রামনবমী উৎসবে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মিছিল। এই মিছিলের গান থেকেই কি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শুরু?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল আর রাণীগঞ্জ এলাকায় যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছড়িয়েছিল এ সপ্তাহের গোড়ায়, ঠিক কিভাবে শুরু হয়েছিল সেই সংঘাত?

ঘটনার পর থেকেই এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আসছে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে। তবে বিবিসির কাছে স্থানীয় কিছু মানুষ এবং এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সাম্প্রদায়িক সংঘাত শুরুর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল রামনবমীর মিছিলে বাজানো কিছু গান।

হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা অভিযোগ করছেন তারা যখন ধর্মীয় উৎসব রামনবমীর মিছিল করছিলেন, সেই সময়ে মুসলমানদের মধ্যে থেকে ইঁট পাথর ছোঁড়া শুরু হয়।

আসানসোলের চাঁদমারি এলাকার বাসিন্দা বাবলু বলছিলেন, "রামনবমীর মিছিল, যাকে আখড়া বলি, তার ওপরেই ওরা পাথর ছোঁড়া শুরু করে হঠাৎই। যে গাড়িটায় সাউন্ড সিস্টেম ছিল, সেটাও জ্বালিয়ে দেয়।

আরেক বাসিন্দা উমাশঙ্কর গুপ্তার দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

"আমাদের মিছিল যাচ্ছিল, তার ওপরেই ইঁট-পাথর মারতে শুরু করে," বলছিলেন মি. গুপ্তা।

মিছিলের ওপরে হঠাৎই কেন ইঁট-পাথর পড়তে শুরু করল, সেটা কারও কাছ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না প্রথমে।

Image caption সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে অনেক কিছু

তবে রাণীগঞ্জ এলাকার এক পুলিশ অফিসার আর আসানসোলের কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক বলছিলেন, রামনবমীর মিছিলে যেসব গান বাজানো হচ্ছিল, সেগুলো থেকেই উত্তেজনার শুরু।

"ওই গানগুলোর কথা যথেষ্ট উত্তেজক। জয় শ্রীরাম স্লোগান দেওয়া হচ্ছে গানগুলোতে, আর তারই মধ্যে উত্তেজক কথা মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় সব মিছিলেই একই ধরণের গান বাজানো হয়েছে," বলছিলেন নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ওই পুলিশ অফিসার।

আসানসোলের যে স্থানীয় সাংবাদিকরা ওই ইঁট-পাথর ছোঁড়া শুরু হওয়ার ছবি তুলেছেন, তাদের কথায়, "মুসলিম সম্প্রদায়কে উত্তেজিত করে তোলার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে ওইসব স্লোগান মিশ্রিত গানে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে রয়েছে ওই গানগুলো।"

রামনবমীর মিছিলের জন্যই ডি জে বা ডিস্ক জকিদের দিয়ে নানারকম সাউন্ড ট্র্যাক মিশিয়ে তৈরী হয়েছে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা ওইসব গানগুলি।

বেশীরভাগ গানই শুরু হয়েছে পাকিস্তানের প্রতি বিষোদগার দিয়ে।

জয় শ্রীরাম ধ্বনি আর পাকিস্তান-বিরোধী স্লোগান বা ছোট্ট ভাষণ দিয়ে শুরু হলেও গানগুলির বাকি অংশে অবশ্য যেসব কথা রয়েছে, সেখানে আর পাকিস্তান নেই।

কোথাও বলা হয়েছে - 'যেদিন হিন্দুরা জেগে উঠবে, সেদিন টুপীওয়ালারাও মাথা নত করে বলবে জয় শ্রীরাম', কোনও গানে লেখা হয়েছে, 'যেদিন আমার রক্ত গরম হবে, সেদিন তোমাকে দেখিয়ে দেব - সেদিন আমি নয়, কথা বলবে আমার তলোয়ার'।

আসানসোলের কুরেশী মহল্লার বাসিন্দা মি. আলাউদ্দিন বলছিলেন, "এসব কী বলা হচ্ছে গানগুলোতে যে টুপীওয়ালাও একদিন বলবে জয় শ্রীরাম!"

মুসদ্দি মহল্লার এক বাসিন্দা জুলফিকার আলি বলছিলেন, "রামনবমীর মিছিল প্রতিদিনই করুক না, আমাদের কোনও আপত্তি থাকবে না। কিন্তু ওই যে গানগুলো বাজানো হচ্ছে রামনবমীর মিছিলে, ওগুলোতে মুসলমানদের আঘাত দেওয়া হচ্ছে।"

এর মধ্যে কোনওটিতে রয়েছে শুধুই ছন্দের তালে 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান - কোনওটিতে 'জয় শ্রীরাম' হুঙ্কার।

Image caption দাঙ্গার পর আসানসোলের পরিস্থিতি এখনো থমথমে

আবার রামনবমীর মিছিলে বাজানোর জন্য সাউন্ড ট্র্যাকের সঙ্গে মেশানো হয়েছে ছোট ছোট ভাষণও - যা পুরোটা ভাল করে শুনলে বোঝা যাবে যে সেগুলো পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বলা, কিন্তু একটা অংশ বিচ্ছিন্নভাবে শুনলে মনে হতেই পারে যে কথাগুলো মুসলমান সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে।

গানগুলোতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান, 'ভারতমাতা কি জয়', 'বন্দে মাতরম' সব কিছুই।

সঙ্গে যেসব ভিডিও ফুটেজ অথবা স্থির চিত্র দেখানো হয়েছে, সেখানে কখনও কাশ্মীরের ছবি, কোথাও ভারতের জাতীয় পতাকা।

বিষয়টা তুলেছিলাম পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিজেপি-র মুখপাত্র প্রশান্ত চক্রবর্তীর কাছে।

"আমার জানা নেই যে রামনবমীর মিছিলে এইধরণের গান বাজানো হয়েছে বলে। মিছিলগুলোতো বিজেপি করে নি, বজরং দল বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মিছিল ছিল ওগুলো। আর আপনার কাছে যারা অভিযোগ করেছে ওইসব গানের ব্যাপারে, সেটা যদি সত্যি বলে মেনেও নিই, তাহলেও তো কথাগুলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এঁদের গায়ে লাগছে কেন ওই কথাগুলো?"

রাণীগঞ্জ এলাকায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক নেতা রাজেশ গুপ্তার সঙ্গে কথা বলার সময়ে এই বিষয়টির উল্লেখ করেছিলেন বিবিসি হিন্দি বিভাগের সহকর্মী দিলনওয়াজ পাশা।

তাকে মি. গুপ্তা বলেছেন, "হ্যাঁ, পাকিস্তান বিরোধী ওইসব গান আমাদের রামনবমীর মিছিলে বাজানো হয়েছিল। কোনও উত্তেজক স্লোগান দেওয়া হয় নি কোথাও।"

কিন্তু একটা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় কেন পাকিস্তান বিরোধী গান বাজানো হল?

বিবিসি-র এই প্রশ্নের জবাবে মি. গুপ্তা বলেছেন, "পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গান ভারতে বাজানো হবে না তো কোথায় বাজানো হবে? আর জাতীয়তাবাদকে উৎসাহিত করার জন্য যেখানেই কোনও সুযোগ আসবে, আমরা সেখানে এধরনের সুযোগ কাজে লাগাব।"

কুরেশী মহল্লার এক যুবক মন্তব্য করছিলেন, "আমরা কি পাকিস্তানী নাকি যে ওইসব গান বাজানো হবে আমাদের এলাকায়?"

আসানসোল রাণীগঞ্জের পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে, তার মধ্যেই পুলিশী তদন্ত শুরু চলছে যে দাঙ্গা লাগানোর ইন্ধন কারা জুগিয়েছিল, তা খুঁজে বের করতে।