ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ইতিহাসের সাক্ষী: ইসলামী বিপ্লব-পূর্ব ইরানের প্রথম নারী মন্ত্রী মাহনাজ আফকামি

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আগের যুগে প্রথমবারের মত একজন নারী মন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৭৫ সালে - দায়িত্ব নিয়েছিলেন মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।

তার নাম মাহনাজ আফকামি - তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী।

তিনি ইরানের আইনে বহু পরিবর্তন এনেছিলেন।

বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮তে উন্নীত করা, কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিশুর যত্নের সুবিধা দেয়া - এরকম অনেক আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মুখ্য ভুমিকা ছিল তার।

বিবিসির ফারহানা হায়দারের সাথে ওয়াশিংটনে বসে কথা বলছিলেন তিনি। বর্ণনা করছিলেন, কিভাবে মন্ত্রীর পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি।

ইরানে তখন রেজা শাহ পাহলভির শাসন চলছে।

"সেদিন খুব ঠান্ডা পড়েছিল, বরফ পড়ছিল। আমাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়ে গেলেন শাহের কাছে, সেটা ঘটেছিল বিমানবন্দরে। সেখানে তখন একজন বিদেশী অতিথিকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা চলছিল।"

তিনি বলছিলেন, "কাজেই আমার নিয়োগটা যেমন ব্যতিক্রমী তেমনি সেদিনের সেই সাক্ষাতটাও ছিল তেমনি। "

মাহনাজকে বলা হলো ইরানের শাহের অধীনে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী হতে।

উনিশশ ষাটের দশক থেকেই ইরানে নারীদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল। নারীরা তখন কাজ করতে শুরু করেছিলেন কূটনৈতিক পদে, বিচার বিভাগে এবং পুলিশ বাহিনীতেও ।

মাহনাজের জন্ম ইরানে হলেও তিনি পড়াশোনা করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি দেশে ফিরেছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপনা করতে।

তিনি তার ছাত্রীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েদের একটা সমিতি গঠন করলেন। এর পর ১৯৭০ সালে তিনি হলেন ইরানের নারীদের সংগঠনের মহাসচিব।

তিনি বলছিলেন, "উনিশশ' সত্তরের দশকে ইরান ছিল একটা খুবই আধুনিক দেশ। আমি যখন নারী সংগঠনের মহাসচিব ছিলাম তখন আমরা অনেক কাজ করেছি।"

"আমাদের কয়েকটি দল তখন চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইরাক বা ভারতের মতো দেশ সফর করেছে। তার ওপর আমাদের সাথে ছিলেন জার্মেইন গ্রিয়ার - অস্ট্রেলিয়ান-ব্রিটিশ নারীবাদী। তিনি ইরানে এসে নারীদের সামনে কথা বলেছেন, যা নারীদের মাঝে একটা বিরাট পরিবর্তন এবং উদ্দীপনা নিয়ে এসেছিল।"

ইরানের নারীরা : ইসলামী বিপ্লবের আগে ও পরে

নাচের ভিডিও প্রকাশ করায় নারী গ্রেফতার

ইরানের এই রিভোলিউশনারি গার্ডস আসলে কারা?

ইরানি নারীদের কিভাবে ফুটবল মাঠে আনবে ফিফা?

ছবির কপিরাইট HAIDAR MOHAMMED ALI
Image caption ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবে ক্ষমতায় আসেন আয়াতোল্লাহ খোমেনি।

জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে ঘোষণা করেছিল 'আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ' হিসেবে।

মাহনাজ মনে করেন, হয়তো এখান থেকেই নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের অনুপ্রেরণা এসেছিল। যেহেতু এরকম পদ আগে ছিল না - তাই মাহনাজের সামনে সুযোগ এলো স্বাধীনভাবে তার ভাবনা অনুযায়ী কাজ করার।

কিন্তু ইরানের সরকারে মাহনাজই ছিলেন একমাত্র নারী। সেটা তার প্রথম কেমন লেগেছিল?

"এটা ছিল খুবই অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। ২০ জন পুরুষের মাঝখানে আমি একমাত্র নারী। আমার বয়েসও ছিল অনেক কম। আমি উপলব্ধি করলাম - ২০ জন পুরুষের মধ্যে থেকে আমার হঠাৎ করে একজন নারীবাদী হয়ে ওঠা সহজ নয়।"

"এখানে পরিবর্তন আনতে হলে আপনাকে ধীরে সুস্থে আলোচনার মধ্য দিয়ে এগুতে হবে। আমি দেখেছিলাম, আমার পুরুষ সহকর্মীরাও আমাকে নিয়ে একই রকম চিন্তিত ছিলেন।"

তিনি বলেন, "তাদেরও নতুন পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হতে হয়েছিল। যেমন ধরুণ - মিটিং এর সময় যে লোকটি ফাইলপত্র নিয়ে আসতেন - তিনি তাকিয়ে দেখতেন ঘরে সবচেয়ে বয়স্ক লোক কে আছেন এবং তাকেই তিনি ফাইলগুলো দিতেন। তিনি ভাবতেই পারতেন না যে আমি একটা মিটিংএ নেতৃত্ব দিতে পারি।"

"মন্ত্রীর গাড়ি যখন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ঢুকতো তখন সেখানে দাঁড়ানো পুলিশ স্যালুট দিতেন। কিন্তু আমার গাড়ি যখন ঢুকতো - পুলিশটি বুঝতে পারতো না যে সে কি করবে, সে একজন মহিলাকে স্যালুট দেবে কিনা।"

"তাই সে শুধু তার হাতটা ওঠাতো, এদিক ওদিক দোলাতো। আমার ভূমিকাটার সবকিছুই ছিল নতুন - আমার কাছে যেমন অন্যদের কাছে তেমনি।"

কিন্তু একজন নারী মন্ত্রী হিসেবে কতটা ক্ষমতা ছিল মাহনাজ আফকামির?

"আমি দেখতে পেলাম যে আমার হাতে অনেক ক্ষমতা। আসলে যেহেতু আমি ছিলাম নতুন এবং আমার দায়িত্বটাও ছিল নতুন, তাই এর ক্ষমতা কতটা হবে তাও কারো জানা ছিল না।"

" কাজেই আমরা কিছু বললে লোকের তা অমান্য করা কঠিন ছিল, কারণ লোকে ভাবতো মহিলা বিষয়ক মন্ত্রীর কাজ হয়তো এটাই।"

তিনি বলছেন, "তাই আমরা বললাম. সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা দরকার - যাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বা শ্রম - এসব মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি নারীদের ভূমিকার ওপর কী প্রভাব ফেলছে সে দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া যায়।"

"এর ফলে আমরা বোঝাতে সক্ষম হলাম যে কর্মজীবী নারীদের জন্য অফিসে শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা অপরিহার্য, এবং মাতৃত্বকালীন সাত মাসের বেতন-ভাতাসহ ছুটি নারীদের অধিকারের অংশ।"

"বাচ্চাদের বয়েস তিন বছর না হওয়া পর্যন্ত মায়েদের কাজের সময় নমনীয় করা - এটাও তুলে ধরলাম আমরা। তো এই রকম নানা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলো। তার সাথে এলো পারিবারিক আইনের সংস্কার।"

সে সময় ইরানের মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে সমস্ত আইনেই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

"আমরা বললাম, যেহেতু মেয়েরা ইরানের জনসংখ্যার অর্ধেক - তাই সরকারের যেসব বিল মজলিস বা পার্লামেন্টে যাবে - তা মহিলাদের ভূমিকার ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা আমাদেরই দেখতে হবে। "

১৯৭৮ সাল নাগাদ ইরানের নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সমান অধিকার পেলেন, সব শ্রম আইন থেকে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে এমন সব ধারা সংশোধন করে বাদ দেয়া হলো। একই কাজের জন্য নারী আর পুরুষের বেতনের পার্থক্য তুলে দেয়া হলো।

প্রায় একই সময়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরান সফরে এলেন।

"১৯৭৭ সালের নববর্ষের রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্টার ইরান সফরে এলেন। আমি ছিলাম তার হোস্ট।"

প্রেসিডেন্ট কার্টার বললেন, শাহের নেতৃত্বের কারণে ইরান বিশ্বের একটি উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলের দেশ হয়েও একটি স্থিতিশীলতার দ্বীপে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট কার্টারের কথা ছিল ভুল। ইরানে তখন শাহের শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমশই দানা বাঁধছিল।

ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় - উভয় গ্রুপের মধ্যেই মার্কিন-বিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছিল। তারা চাইছিল সামাজিক এবং অথনৈতিক পরিবর্তন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আয়াতোল্লাহ খোমেনি

১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাস। কাজ উপলক্ষে তখন নিউইয়র্কে ছিলেন মাহনাজ। তখনই তিনি তার স্বামীর কাছ থেকে একটি ফোন পেলেন - যা তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে দিল।

"আমার স্বামী বললেন, তিনি রানীর কাছ থেকে একটি ফোন পেয়েছেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কোথায় আছি। আমার স্বামী বলেছিলেন, সে নিউইয়র্কে আছে তবে শিগগিরই ফিরে আসবে।"

"তখন রানী বললেন, তার হয়তো এক্ষুণি ফিরে আসা ঠিক হবে না, ওখানে থাকাটাই ভালো হবে। অন্যদিকে এর আগেই আমি খবর পেয়েছিলাম যে ইরানে মেয়েদের সংগঠনগুলোর অফিসে অফিসে হামলা হয়েছে।"

মাহনাজ জানান, "আমার স্বামী বললেন, পরিস্তিতি খুবই বিপজ্জনক, তোমার দেশে না ফেরাটাই ভালো হবে। এখান থেকেই আমার নির্বাসিত জীবনের শুরু এবং এটা ছিল আমার জীবনের এক বিরাট পরিবর্তন।"

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের শাহ ক্ষমতাচ্যুত হলেন। অনেকেই উৎসাহ বোধ করেছিলেন যে এর ফলে আরো স্বাধীন এবং আধুনিক একটি ইরানের সৃষ্টি হবে।

কিন্তু বিপ্লব চলতে থাকার মধ্যেই এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে ইসলামি বিপ্লবী শক্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে।

ইরানের শাহ সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে মাহনাজের জন্য ইরানে ফিরে আসাটা বিপজ্জনক হয়ে উঠলো। এটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো - যখন শাহের সরকারে তিনি ছাড়া আর যে একজন নারী মন্ত্রী ছিলেন, ফারুক পারসা - তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো।

"তিনি ছিলেন আমার কাছে একজন গুরুর মতো। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ নারী। তাকে একজন বেশ্যা বলে আখ্যায়িত করা হলো, এবং তেহরানের পতিতালয়ে তাকে ফাঁসি দেয়া হলো।"

"তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছিল, আমার বিরুদ্ধেও ছিল একই অভিযোগ। আর তা হলো - দুর্নীতি এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কাজেই এতে কোন সন্দেহ ছিল না যে আমি ইরানে থাকলে আমারও একই পরিণতি হতো। বেঁচে গিয়েই আমার বরং অপরাধ বোধ হয় - যে আমি ইরানে থাকলে হয়তো তিনি বেঁচে যেতেন।"

ইরানে বিপ্লবের পর নারীদের অবস্থান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল। মেয়েদের প্রকাশ্যে দেখা যাওয়াটা মৌলবাদীদের জন্য হয়ে উঠলো এক প্রধান অসন্তোষের কারণ।

এর প্রতিবাদে মেয়েরা বিক্ষোভও করেছিলেন। এর বর্ণনা দিয়েছেন বিবিসির রিপোর্টার।

"ইরানে খোমেনি বিরোধী বিক্ষোভ যেমন হতে পারে তার সবচাইতে কাছাকাছি ছিল গতকালের বিক্ষোভ। ইসলামিক আইনের প্রবর্তনের সূচনা হয়েছে এই আদেশ দিয়ে যে সরকারি অফিসে মেয়েদের মাথা ঢেকে আসতে হবে। অনেক নারীই এতে ক্ষিপ্ত। তেহরানে খুব কম নারীই এ নির্দেশ মেনেছে।"

মাহনাজ নারী মন্ত্রী হয়ে ইরানে অনেক কিছুই করেছিলেন। কিন্তু ইসলামী বিপ্লব এলো তার ওপর এক বিরাট আঘাত হয়ে।

"বলতে পারেন - নারীদের যা যা অর্জন ছিল, পরিবার সংক্রান্ত সব আইন - তার সবকিছুই এতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতায় এসে প্রথমেই খোমেনি যে আদেশ দিয়েছিলেন - তা হলো পারিবারিক আইন বাতিল করা। এরপর তার আদেশ ছিল নারী ও পুরুষকে পৃথক করে দেয়া।"

"প্রকৃতপক্ষে খোমেনি যা চেয়েছিলেন, এবং মিসেস পারসার ফাঁসির মধ্যে দিয়ে যেটা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে দেয়া হলো - যে ইরানে মেয়েদেরকে অন্তত ১০০ বছর পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে।"

তবে যদিও ইরানে মেয়েদের আইনি ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা হারাতে হলো, কিন্তু মাহনাজ এখনো ইরানের সমাজে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে আশাবাদী।

"এসব সত্বেও ইরানের মেয়েরা এখন আরো বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের সম্পৃক্ততা, এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আরো বেড়েছে। তাই মিসেস পারসার প্রজন্ম এবং অন্যরা মিলে যে কাজ করেছেন তার যে সবই ব্যর্থ হয়েছে তা নয়।"

"কোনদিন যদি ইরানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আসে, তাহলে এই মেয়েরাই সেখানে থাকবে সামনের কাতারে। তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি দুনিয়ার সাথে সংযুক্ত। তারা তাদের অতীতকে জানে। ইরানে একসময় পরিবর্তন আসতেই হবে। তা যদি আসে তাহলে তার পুরোভাগে থাকবে মেয়েরা।"

মাহনাজ আফকামি এখন ওয়াশিংটনে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছেন। তিনি একটি নারী শিক্ষা সংগঠনের সভাপতি এবং এর মধ্যে দিয়ে তিনি এখনো নারী অধিকারের জন্য কাজ করে চলেছেন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

রাশিয়ার অস্ত্র কেনা নিয়ে তুরস্ককে হুশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

আইনজীবী হয়ে পরিবারের সম্পদ ফিরিয়ে আনলেন সন্তান

যেভাবে রাতারাতি ইউটিউব তারকা হলেন এক তরুণী

যে কারণে বাকশাল নিয়ে এত বিতর্ক