বিচ্ছিন্ন হাতের যে ছবি দেখে আঁতকে উঠেছেন ঢাকাবাসী

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশ ঢাকা

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকার রাস্তায় গায়ে গায়ে ঘেঁষে বাস চলার দৃশ্য প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে

ছবিটি ঢাকার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল মঙ্গলবার। পাশাপাশি লেগে থাকা দুটি বাসের মধ্যে ঝুলে আছে বিচ্ছিন্ন একটি হাত।

ঢাকার সাধারণ মানুষের অনেকে সকালে পত্রিকায় বিচ্ছিন্ন হাতের সেই ছবি দেখে আঁতকে উঠেছেন। সামাজিক মাধ্যমে চাঞ্চল্য এবং বিতর্ক সৃষ্টি করে ঘটনাটি।

একজন আইনজীবী ছবিটি দেখে এতই বিচলিত হন যে তিনি একটি জনস্বার্থ মামলা করেন।

আইনজীবী ঘটনাটি আদালতের নজরে আনলে দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারানো এই শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ব্যয় সংশ্লিষ্ট বাস কোম্পানি দু'টিকে বহন করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

মঙ্গলবার ঢাকায় সোনারগাঁ হোটেলের পাশে রাস্তায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। হাত-হারানো তিতুমীর কলেজের এই ছাত্র রাজীব হোসেনের চিকিৎসা চলছে ঢাকার একটি হাসপাতালে।

বাসের যাত্রী এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অব্যবস্থাপনার কারণে রাস্তায় পরিবহন চলাচলের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যাত্রীদের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। ঘটনাটি তাদের মাঝে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মহাখালী এলাকায় রাস্তায় বেশ কয়েকজনের সাথে আমার কথা হয়, যাদের বেশিরভাগই প্রতিদিন বাসে চলাচল করেন।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বাসে চলাচল করতে গিয়ে তাদের মনে হয়, নগরীর রাস্তায় পরিবহন ব্যবস্থায় যেনো কারও কোন নিয়ন্ত্রন নেই। ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা চলাচল করে থাকেন।

মহাখালী এলাকার সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন যাত্রবাড়ীর একটি মেসে থাকেন। সেখান থেকে তিনি মঙ্গলবার দুপুরে বিআরটিসি বাসে উঠেছিলেন কলেজে যাওয়ার জন্য।

কিন্তু রাজধানীর একটি অন্যতম প্রধান সড়কে সার্ক ফোয়ার কাছে ব্যক্তি মালিকানাধীন স্বজন পরিবহণের একটি বাস সেখানে দ্রুতগতিতে এসে বিআরটিসি বাসটির গা ঘেঁষে এগোতে থাকে।

আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, SHAFIQ ALAM

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকার রাস্তায় যানবাহন ও মানুষের অত্যধিক ভিড়

রাজীব হোসেন বিআরটিসি বাসের ভিতরে জায়গা না পেয়ে দরজায় ঝুলে যাচ্ছিলেন।

তখন বাস দু'টির রেষারেষিতে তিনি রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। আর তাঁর ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুই বাসের মাঝখানে ঝুলতে থাকে।

হাত হারিয়ে রাজীব হোসেন এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তাঁর চাচা আল আমীন বলছিলেন, তাঁর ভাতিজাকে হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এখনও কথা বলতে পারছে না। কখনও কখনও একটু চোখ খুললে বাঁ হাত দিয়ে ডান হাত ধরার চেষ্টা করে। ডান হাতটা যে নেই, সেটা রাজীব বুঝতে পারছে কিনা, তা এখনও চিকিৎসকদের কাছেও পরিস্কার নয় বলে তাঁর আত্নীয়রা ধারণা করছেন।

আল আমিন জানিয়েছেন, পাটুয়াখালীর বাউফল এলাকার রাজীব হোসেন ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়েছেন। তার দু'টি ছোট ভাই আছে। তাদের তিন ভাইকেই চাচা- মামরা ভাগাভগি করে লেখাপড়া করাচ্ছেন।

এখন রাজীব হোসেনের জীবনের এই পরিস্থিতির দায় কে নেবে, তা আল আমিনের জানা নেই।

ঘটনাটি নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল একটি রিট আবেদন করেন।

তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনকে হাত হারানো রাজীব হোসেনের চিকিৎসা ব্যয় বহনের নির্দেশ দিয়েছে।

এছাড়াও আদালত ট্রাফিক আইন নিয়ে স্বরাষ্ট্র এবং সড়ক পরিবহন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে।

আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলছিলেন, সংবাদমাধ্যমে রাজীব হোসেনের হাত দু'টি বাসের চাপায় ঝুলে থাকার ছবি তাঁকে নাড়া দিয়েছে। সব মানষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। সেকারণেই তিনি সেটাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে নগরীর রাস্তার পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে রিটটি করেছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিস্থিতি প্রতিদিনই খারাপ হচ্ছে।

"সিস্টেমটাই খুব বিশৃংখলাপূর্ণ।আমরা যা দেখি, আসলে উপসর্গটা দেখি।আমরা এমন কোন পরিকল্পনা করি নাই, যেখানে বাস ড্রাইভাররা সুষ্ঠুভাবে গাড়ি চালাবে।আমরা যখন যে এসেছে, রুট পারমিটগুলো দিয়ে ফেলেছি। মালিকরাও ফিক্সড ইনকামে চলে গেছে।ফলে দিনের শেষ এখন চালকরাই ব্যবসাটা করছে পুরো রাস্তায়।"

একাধিক পরিবহন মালিকের সাথে কথা বললে তারাও রাস্তার পরিস্থিতির জন্য ব্যবস্থাপনার অভাবের কথা তুলে ধরেন। তারা নিজেরা দায় নিতে রাজী নন।

সরকারি কর্মকর্তারা ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা সহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া কথা বলেন। কিন্তু তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বাস যাত্রী এবং বিশেষজ্ঞদের।