কোটা সংস্কার: মধ্যরাতে বিক্ষোভ-সহিংসতায় উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সহিংসতায় মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়

ছবির উৎস, Khan Assaduzzaman Masum

ছবির ক্যাপশান,

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সহিংসতায় মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়

বাংলাদেশে চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকার শাহবাগের বিক্ষোভ মধ্যরাতে পুলিশ আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহিংসতায় গড়িয়েছে।

সন্ধ্যার পর কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে আর লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের একদফা ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এরপর তারা শাহবাগে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন।

শিক্ষার্থীরা এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির ভবনে ভাঙচুর করে এবং গাড়ি, আসবাবপত্রে আগুন লাগিয়ে দেয়।

ঘটনাস্থল থেকে একটি অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক তারেক হাসান নির্ঝর বিবিসিকে জানান, আন্দোলনকারীরা টিএসসির দিকে আসলে ছাত্রলীগ কর্মীরাও তাদের ওপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের হলগুলো থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এসে টিএসসিতে জড়ো হয়।

রাত ২টার সময় তিনি জানান, চারদিক থেকে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছুড়ছে আর ছাত্রলীগের কর্মীরা ইটপাটকেল মারছে। টিএসসি এলাকায় এ সময় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান করছে।

ছবির উৎস, Asad Rahman

ছবির ক্যাপশান,

বিক্ষোভকারীদের সরাতে টিয়ারগ্যাস ছোড়ে পুলিশ

রাত দেড়টার দিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে সোমবার সকাল ১১টায় আলোচনার প্রস্তাব করেন।

তিনি ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘসময় ধরে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আগামীকাল সকাল ১১টায় সরকারের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য তাদের আহবান জানাচ্ছি।

আরও পড়ুন:

পুলিশ অনেককে আটক করছে বলেও জানা গেছে, যদিও শাহবাগ থানার পুলিশ আটককৃতদের কোন সংখ্যা জানাতে পারেনি।

টিয়ারগ্যাস আর লাঠিপেটায় অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংবাদকর্মীরা।

সিভিল সার্ভিস বিসিএস সহ সকল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থায় নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করে রোববার দুপুর থেকে শাহবাগে অবস্থান নেয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী।

তবে রাত আটটার দিকে সেখানে গিয়ে পুলিশ তাদের সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে এবং লাঠিচার্জ করে।

এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শনিবার সন্ধ্যায় শাহবাগ এলাকা থেকে জানিয়েছিলেন, কোনও একটি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অবস্থান করবেন তারা। সেইসাথে সোমবার তারা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলেও জানাচ্ছেন।

ছবির উৎস, Khan Assaduzzaman Masud

ছবির ক্যাপশান,

রবিবার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চিত্র

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন ধরনের কোটা চালু আছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, সে সমস্ত কোটাকে কমিয়ে আনার দাবিতে চলমান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তারা শাহবাগে মিছিল ও সমাবেশ করছেন।

বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র খান মোহাম্মদ শরীফ বিবিসিকে বলছিলেন, "অনেকদিন ধরেই আমরা জনমত তৈরির চেষ্টা করছিলাম। এর আগে ছয়বার আন্দোলন করে রাস্তায় নেমেছি। এখন সারা বাংলাদেশে দাবি আদায়ে কমিটি হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত এ আন্দোলন সফল না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আন্দোলনে থাকবো।"

ছবির উৎস, RAHAT AHMED KHAN

ছবির ক্যাপশান,

শাহবাগে কোটা সংস্কার দাবিতে বিক্ষোভ

আন্দোলনকারী একটি সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ উজ্জ্বল বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তাদের মূল দাবি কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।

তিনি জানান, এ নিয়ে সাতবার তারা রাস্তায় নেমেছেন। কারণ বর্তমানে প্রচলিত নানা রকমের কোটার ফাঁদে পড়ে মেধা নিয়েও অনেক শিক্ষার্থী সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ভালো ক্যাডার পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, "চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা মেধাবীদের সাথে রাষ্ট্রের বঞ্চনা। তাই পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।"

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র সংরক্ষণ পরিষদ' এর ব্যানারে যে পাঁচটি বিষয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে সেগুলো হল -

•কোটা-ব্যবস্থা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা (আন্দোলনকারীরা বলছেন ৫৬% কোটার মধ্যে ৩০ শতাংশই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ। সেটিকে ১০% এ নামিয়ে আনতে হবে)

•কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া

•সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়স-সীমা- ( মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরীর বয়স-সীমা ৩২ কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০। সেখানে অভিন্ন বয়স-সীমার দাবি আন্দোলনরতদের।)

•কোটায় কোনও ধরনের বিশেষ পরীক্ষা নেয়া, যাবে না ( কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকরি আবেদনই করতে পারেন না কেবল কোটায় অন্তর্ভুক্তরা পারে)

•চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।

ছবির ক্যাপশান,

চাকরির বাজার নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক শিক্ষার্থীর মাঝে। (ফাইল ছবি)

যদিও কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত মার্চ মাসের শুরুতে সরকারি সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল যে, সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগে কোটার কোনও পদ যোগ্য প্রার্থীর অভাবে পূরণ করা না গেলে, সেসব পদ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে । জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে একটি আদেশও জারি করে।

কিন্তু এখন শিক্ষার্থীরা বলছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুসারে তারা দেখেছেন, শেষপর্যন্ত কোটা থেকেই কোটা পূরণ করা হবে।

মোঃ উজ্জ্বল যেমনটা বলেন, "এক ধরনের কোটা থেকে পূরণ না হলে আরেক কোটা থেকে, তা না হলে আরেক কোটা থেকে এভাবে নেয়া হবে। সর্বশেষ ধাপে গিয়ে মেধাবীদের কথা বলা হয়েছে"