ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনে হামলা: কারা এর পেছনে

ছবির কপিরাইট .
Image caption উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান: 'হামলা ছিল সুপরিকল্পিত'

বাংলাদেশে গত কয়েকদিন ধরে যে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ চলছে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পদ্ধতিতে সংস্কারের দাবিতে, সেই আন্দোলনের সময় গত রবিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ব্যাপক হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। হামলাকারীরা উপাচার্য ভবনের ব্যাপক ক্ষতি করে। এ ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তা নিয়ে কত কদিন ধরেই তীব্র বাক-বিতন্ডা চলছে আন্দোলনের পক্ষের ও বিপক্ষের সমর্থকদের মধ্যে। আন্দোলনকারী ছাত্ররা বলছেন, এই হামলার সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তাদেরকে এর সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে আন্দোলনের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য। অন্যদিকে সরকার সমর্থকরা এরজন্যে আন্দোলনকারীদেরই দোষারোপ করছেন। সেদিনের হামলার সময় বাড়িতেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। বিবিসি বাংলার মোয়াজ্জেম হোসেনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেন এ ঘটনা নিয়ে:

এই হামলার ব্যাপারে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হচ্ছে। এ সম্পর্কে আপনার ধারণাটা কী?

•আমি যতটুকু ধারণা করি, একটা গ্রুপ ছিল শাহবাগে, আরেকটি গ্রুপ ছিল কলাভবন বা টিএসসির দিকে। সবাই কিন্তু এখানে আসেনি। একটা গ্রুপ এসেছে। এবং তারা দেয়াল টপকে, সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙ্গে, বাতি নিভিয়ে দিয়ে যে বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করে, তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। আমি তখন বাড়িতেই ছিলাম। দোতলা থেকে আমি দেখছিলাম। আমি তাদের বলছিলাম, আমি আসছি। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি ওদের কথা ভাবছিলাম, তাদের দেখার জন্য বারান্দায় এসেছিলাম। তখন সার্বিক অবস্থা দেখে মনো হলো যে এই হামলাকারীদের উদ্দেশ্য অন্য ধরণের।

তার মানে হামলাকারীদের আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?

•হ্যাঁ, আমি তো তাদের দেখছিলাম। আমি তাদের বলেছি, আমি আসতেছি। প্রথম যখন এর ঢোকে, তখন ভেবেছিলাম, হয়তো শিক্ষার্থীদের কেউ হবে। তখন আমি বলেছিলাম, বাবা আমি আসছি, আমি তোমাদের সাথেই আছি। কিন্তু তারা যখন বাগানের বাতিগুলো ভেঙ্গে ফেলছে, সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙ্গে ফেলছে, তখন আমার ধারণা জন্মালো যে এদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ।আমি ভেবেছিলাম ওরা হয়তো দোতলা পর্যন্ত উঠবে না। কিন্তু তারা সেখানে এসেও যে তান্ডব চালালো, সেটা কেউ সরেজমিনে না দেখলে বুঝবে না।

যখন এ ঘটনা ঘটছিল, তখন তো আপনার বাসভবন ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনী থাকার কথা ছিল। তারা কি কেউ বাধা দেয়নি এই হামলাকারীদের?

•যারা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছিল, তাদের ভেন্যু ছিল শাহবাগ। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ছিল। সংস্কার আন্দোলন, কোটা, এসবে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কোনভাবে সংশ্লিষ্ট নন। সুতরাং এরকম কিছু ঘটার কথা তো আমাদের ধারণার বাইরে।

তাহলে আপনার বাসভবনে আপনার নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যবস্থা ছিল না সেখানে?

•নিরাপত্তা বলতে রুটিন নিরাপত্তা যেভাবে থাকে, সেখানে চার-পাঁচজন পুলিশ ছিল।

তারা কিছু করতে পারেনি? বাধা দিতে পারেনি?

•তাদেরকে বারণ করা হয়েছিল। তাদেরকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কারণ চার-পাঁচজন পুলিশ, তাদের একজন কেউ কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে নিল, তখন তো অনেক প্রাণ ক্ষয় হবে, একটা ভয়ংকর রূপ নেবে। যেখানে রাস্তায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দুশো-তিনশো মেয়ে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

কোটা সংস্কার: বিভেদ দূর হলো মতিয়া চৌধুরীর উক্তিতে

মেয়েরা কেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে এতটা সম্পৃক্ত?

কোটা সংস্কার: আন্দোলনের নেপথ্যে কী ঘটছে

ছবির কপিরাইট AFP/Getty Images
Image caption রবিবার রাতে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল ক্যাম্পাসে

আপনি বলছেন যে হামলাকারীদের আপনি নিজের চোখে দেখেছেন। আপনি কি তাদের চিনতে পেরেছেন?

•না না, এগুলো সব অচেনা মুখ। আমি চেনা মুখ দেখেছি অনেক পরে। আমাদের সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা যখন আসলেন, তখন আমি প্রথম কিছু চেনা মুখ দেখলাম। এরপর কয়েকজন সহকর্মী আসলেন। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, তাদের নেতৃত্বে একটা গ্রুপ আসলেন। তার আগে পর্যন্ত যাদের দেখেছি, সবই তো অচেনা মুখ।

আপনি বলছিলেন যে আপনার বাসভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা হামলাকারীরা ভেঙ্গে ফেলেছিল। কিন্তু ভাঙ্গার আগের পর্যন্ত নিশ্চয়ই সেখান ছবি রেকর্ড হচ্ছিল। আপনারা কি যাচাই করে দেখেছেন, কারা ছিল এই হামলাকারীরা?

•হামলাকারীরা যখন আমাকে বসিয়ে রেখেছিল, তখন বার বার বলছিল, সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ডার কোথায়, সার্ভার কোথায়। এটিও আরেকটি ঘটনা। সেগুলোও ওরা ধ্বংস করেছে। তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছে তাদের সব আলামত যাতে নষ্ট করে দেয়া যায়।

পুরো ঘটনার যে বিবরণ আপনি দিলেন, তাতে তো মনে হচ্ছে এটি সুপরিকল্পিত ঘটনা। এর পেছনে কারা থাকতে পারে বলে আপনারা সন্দেহ করছেন?

•এটি সন্দেহের কোন বিষয় নয়। সকল আলামতে যেটা মনে হবে, এক: কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই, দুই: যে প্রক্রিয়ায় হামলা চালানো হয়, যেরকম তান্ডবলীলা চালানো হয়, তাদের বড় কোন দূরভিসন্ধি ছিল।মনে হচ্ছে হরেক রকমের অপশক্তি এক হয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

সরকার এর পেছনে কোন কোন রাজনৈতিক শক্তির জড়িত থাকার সন্দেহের কথা বলছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কি একই সন্দেহ করেন?

•কত ধরণের দূরভিসন্ধি এর পেছনে আছে তা নিশ্চয়ই বেরুবে। কিন্তু আমার ধারণা, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এর পেছনে বড় দূরভিসন্ধি ছিল। এই বড় দূরভিসন্ধির পেছনে হয়তো অনেক কম্পোনেন্ট ছিল। ভিন্ন ভিন্ন শক্তি হয়তো একত্রিত হয়ে এটা করেছে।

সম্পর্কিত বিষয়