ঢাকা শহর পরিচ্ছন্নতায় জনসচেতনতার উদ্যোগ কতটা সফল হচ্ছে?

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption রাজধানীতে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার এরকম দৃশ্য কমবেশি সবখানেই দেখা যায়

রাজধানীতে মাঝে মধ্যেই বেশ ঘটা করে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নানারকম প্রচার অভিযান চালায় বিভিন্ন সংস্থা।

গত শুক্রবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এরকমই এক প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নেন ১৫ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী।

যদিও সবমিলিয়ে এই কর্মসূচিতে আসা মানুষের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে বলেই দাবি আয়োজকদের।

বলা হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতার এই কর্মসূচিতে ব্যাপক সংখ্যায় মানুষের অংশগ্রহণ স্থান পাবে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। এর মাধ্যমে জনসচেতনতাও বাড়বে নগরবাসীর মধ্যে।

কিন্তু বাস্তবে এসব কর্মসূচি কতটা পরিচ্ছন্ন করছে নগরবাসীকে আর নগরবাসীই বা কতটা সচেতন হচ্ছেন?

আরো পড়ুন:

বিদেশিদের রাস্তা পরিস্কার অভিযানের প্রশংসায় মেয়র

যেভাবে চলবে ঢাকা দক্ষিণের মশা নিধন অভিযান

রোববার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ এর ফুটপাতে গিয়ে দেখা গেল ঝালমুড়ির ঠোঙ্গা থেকে শুরু করে ডাবের খোসা সবকিছুই পড়ে আছে সেখানে।

আগের দিন দর্শনার্থীদের ফেলে যাওয়া এসব ময়লায় আবর্জনাময় হয়ে আছে পুরো এলাকা।

এখানেই কাজ করছিলেন ফিরোজা বেগম নামের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তিনি বলছিলেন, এই চিত্র নিত্যদিনের।

''এইখানে সারাদিন হকার বসে, নানান দোকান বসে। মানুষ খায়, ময়লা ফেলায়। দোকানদাররাও ময়লা নিয়া যায় না। আমাদেরই পরিস্কার করতে হয়, '' বলছিলেন ফিরোজা।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার কথার প্রমাণও মিললো।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption শহরকে নোংরা করার দায় কেউই নিতে চায় না।

দেখা গেলো এখানে ঘুরতে আসা মানুষজন বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে খাবার কিংবা সঙ্গে থাকা অপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার শেষে রাস্তাতেই ফেলছেন।

তবে পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন করার এই দায় দোকানী কিংবা সাধারণ মানুষ কেউই যেনো নিতে চান না।

একজন নারী দর্শনার্থী বলছিলেন, "এখানে তো ময়লা ফেলার আলাদা কোন জায়গা নেই । সবাই ফুটপাতে ফেলছে, তাই আমিও রুটির প্যাকেটটা ফুটপাতেই ফেললাম।''

তবে ভ্যানের উপর চায়ের দোকান বসানো এক বিক্রেতা বললেন, ''আমাদের দোকানের সঙ্গে ময়লার ঝুড়ি রাখা আছে। কিন্তু অনেকেই সেখানে না ফেলে রাস্তায় ময়লা ফেলে। আমরা কী করবো?'

আপনারা কেন দোকান বন্ধের সময় ময়লা পরিস্কার করে যান না এমন প্রশ্নে সেই দোকানীর দাবি অন্য কেউ পরিস্কার করুক আর না করুক তিনি ঠিকই নিজ দোকান থেকে সৃষ্ট ময়লা প্রতিদিন পরিস্কার করেন।

মানিক মিয়া এভিনিউ এর মতো একই দৃশ্য দেখা গেলো রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, গুলিস্তানসহ অনেক জায়গাতেই।

রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে ঘুরতে আসা এক তরুণ ঝালমুড়ি খাওয়া শেষে কাগজের প্যাকেট ফুটপাতেই ফেলে দিলেন।

কেন এখানে ময়লা ফেললেন, এমন প্রশ্নে ঐ তরুণের জবাব এখানে তো সবাই ফেলছে।

তিনি বলছিলেন, ''যখন আমি দেখছি যে, পুরো এলাকাটাই একরকমের ডাস্টবিনের মতো হয়ে আছে। অনেক ময়লা। তখন এটাই আমার কাছে একটা ডাস্টবিন। সবকিছু যদি পরিস্কার থাকতো, তাহলে ময়লা ফেলতে হয়তো বিব্রত হতাম। আমরা তো ঘরে ময়লা ফেলি না। কারণ ঘর পরিস্কার থাকে। এখানে সবকিছু পরিস্কার রাখতে হবে, আলাদা ডাস্টবিন দিতে হবে।"

কিন্তু যেসব এলাকায় সিটি করপোরেশন থেকে ময়লা ফেলার বিন লাগানো হয়েছে সেখানে কী পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে?

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption রাজধানীর সোবহানবাগে ময়লার বিন চুরি হয়ে গেছে। মানুষ ময়লা ফেলছে রাস্তায়।

রাজধানীর পান্থপথে দেখা গেলো রাস্তার পাশে ওয়েস্ট বিন থাকলেও তা ব্যবহার হচ্ছে না।

বিনের পাশেই আছে ময়লার স্তুপ। কোথাও কোথাও খোদ ময়লা ফেলার বিনটিও চুরি হয়ে গেছে।

অনেক স্থানে আবার ওয়েস্ট বিন উল্টো করে বেঁধে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনা ঘটলেও এলাকাবাসী অবশ্য বলছেন, ওয়েস্ট বিন গুলোর এ হাল কারা করেছে তারা তা জানেন না।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এতো বড় শহরে প্রত্যেকটি ওয়েস্ট বিন পাহারা দেয়ার মতো লোকবল আমার নেই। বিশ্বের কোথাও ওয়েস্ট বিন পাহারাও দেয়া হয় না। এখানে নাগরিকদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। তবে চুরি যাওয়া কিংবা অকেজো হয়ে যাওয়া বিনগুলো আমরা প্রতিস্থাপন করছি।"

তাহলে কি যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলা কিংবা নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে একধরণের ঔদাসীন্য দেখা যাচ্ছে নগরবাসীর মধ্যে?

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption স্থপতি ইকবাল হাবিব বলছেন, নগরীর অপরিচ্ছন্নতার দায় সবার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলছিলেন, "এই শহরে মানুষ রাস্তায় হাটতে পারে না। ফলে মানুষ শহরকে ভালবাসতে ভুলে গেছে। স্বার্থপর মানসিকতাও এরজন্য দায়ী। আমরা এখনো মনে করি ঘরের দরজা বন্ধ করলে ভেতরের যে আঙ্গিনা সেটাই বোধহয় আমার জীবন, সেটিই বোধহয় আমার সংসার। এই মানসিকতা এবং সচেতনতার অভাবেই নগরীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।"

তবে তিনি এও বলছেন, নগরবাসীর মধ্যে শহরের প্রতি ভালবাসা, নাগরিক দায়বোধ এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য জনসচেতনতা তৈরিতে যে ধরণের সামগ্রিক উদ্যোগ দরকার তার ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলছিলেন, "এখানে প্রণোদনা এবং শাস্তি দুটোই দরকার। যারা শহরকে নোংরা করছেন, ময়লা ফেলছেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর যারা পরিচ্ছন্নতার জন্য বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছে তাদের জন্য পুরস্কার রাখতে হবে। এ দুটোর মিশ্রণে একটা অনুশাসন তৈরি না করলে সত্যিকারভাবে নাগরিক কর্তব্য পালনে জনগনকে উৎসাহিত করতে পারবেন না। এখন যেভাবে পরিচ্ছন্নতার জন্য অনুষ্ঠান সর্বস্ব নানা আয়োজন করা হচ্ছে, তা দিয়ে খুব বেশি অগ্রগতি হবে না।"

তবে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র বলছেন ভিন্ন কথা।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption কেউ রাস্তায় আবর্জনা বা ময়লা ফেললে তাকে দণ্ড বা জরিমানা করার মতো ক্যাপাসিটি কিন্তু আমাদের নেই। এবং সমাজ এখনো এরজন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি, বলছিলেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন।

"কেউ রাস্তায় আবর্জনা বা ময়লা ফেললে তাকে দণ্ড বা জরিমানা করার মতো ক্যাপাসিটি কিন্তু আমাদের নেই। এবং সমাজ এখনো এরজন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। এখনি জরিমানা বা দণ্ডের বিধানে না গিয়ে আমরা আগে জোর দিচ্ছি আমাদের নিজেদের অর্থাৎ নাগরিকদের সচেতন করার উপর। এরজন্য আমরা যেসব প্রচারাভিযান করছি এতে মানুষ আসছে, সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।"

তার মতে, পরিচ্ছন্ন নগরীর জন্য একদিনে হয়তো সব নাগরিককে সচেতন করা যাবে না। তবে ধীরে ধীরে এর উন্নতি ঘটানো সম্ভব।

আরো পড়ুন:

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুর্ভাবনায় ভারত?

জাতিসংঘের কালো তালিকায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

'ইন্টারনেট আবিষ্কার হয়েছে মহাভারতের যুগে'