ইনস্টাগ্রামে সেলিব্রিটিদের বাচ্চারা: কতটা যৌক্তিক?

সেরেনা উইলিয়ামস ও তার পুত্র অ্যালেক্সিস , ডিজে খালেদ পুত্র আসাদ এবং মাইকেল ফেলপস সাথে বুমার। ছবির কপিরাইট ইনস্টাগ্রাম
Image caption সেরেনা উইলিয়ামস ও তার কন্যা অ্যালেক্সিস , ডিজে খালেদ ও পুত্র আসাদ এবং মাইকেল ফেলপস, সাথে ছেলে বুমার।

রিয়েলিটি টেলিভিশন শো তারকা কিম কারদাশিয়ান। তার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যা সাড়ে সাত কোটির বেশি। এই সামাজিক প্ল্যাটফর্মেই তিনি ঘোষণা করেন তার নবজাত সন্তানের নাম।

এও জানা যায় যে, ট্রু থম্পসন নামের সেই শিশুর ইতোমধ্যেই নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছে।

শিশু ট্রু একা নয়, আমেরিকান ডিজে খালেদের ছেলে আসাদ এবং টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামসের মেয়ে অ্যালেক্সিস অলিম্পিয়া ওহানিয়ানেরও এই ক্ষুদে বয়সেই নিজস্ব ইনস্টাগ্রাম আইডি রয়েছে।

কিন্তু আপনার নিজের সন্তানের যখন এসব বিষয়ে অনুমতি দেয়ার বয়েস বা বোঝার ক্ষমতা হয় নি, তখন তাদের নামে অ্যাকাউন্ট খোলা বা পোস্ট দেয়া কতটা সঠিক কাজ?

বিষয়টি যতটা সোজাসাপ্টা মনে হচ্ছে আসলে ততোটা নয়।

কিম কারদাশিয়ানের কন্যা ট্রুর অ্যাকাউন্ট থেকে কোনও পোস্ট করার আগেই তার অনুসারীদের সংখ্যা প্রায় দেড়-লাখের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেখানে তার মা নিজের অ্যাকাউন্টে ৩ হাজারের বেশি বার পোস্ট করেছেন।

ট্রুর সম্পর্কীয় বোন ড্রিম-এর জন্ম হয় ২০১৬ সালে এবং তারও নিজস্ব ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে। যার ফলোয়ার প্রায় দশ লাখ। যদিও কিম কারদাশিয়ান এবং ব্লাচ চায়নার সন্তান ড্রিমের আইডি থেকে এখনো কোনও পোস্ট নেই।

ছবির কপিরাইট ইনস্টাগ্রাম
Image caption কিম কার্দাশিয়ান কন্যার নাম ঘোষণাও করা হয় ইনস্টাগ্রামে।

অন্যদিক ডিজে খালেদের পুত্র আসাদ খালেদের অ্যাকাউন্ট থেকে সাড়ে তিনশোর বেশি পোস্ট করা হয়েছে এবং এক বছর বয়সী শিশুটিকে এরইমধ্যে ১৮ লাখ মানুষ অনুসরণ করছে ইনস্টাগ্রামে।

তার ইনস্টাগ্রাম ফিডে মূলত পারিবারিক ছবি বেশি।

একইভাবে তারকা অলিম্পিক সাঁতারু মাইকেল ফেলপস এর ছেলে বুমার ফেলপসের ইনস্টাগ্রাম পেইজেও তার ক্ষুদ্র জীবনের বিভিন্ন ছবি নিয়ে পোস্টার প্রদর্শনী করা হয়েছে ।

ইনস্টাগ্রামের নিয়মকানুন অনুসারে এর ব্যবহারকারীদের বয়স নূন্যতম ১৩ বছর হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তারকারাই সেই নিয়ম মানছেন না।

সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের নাম ব্যবহার করে এ ধরণের অ্যাকাউন্ট খোলার প্রভাব ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক? এ বিষয়ে বিবিসির বিনোদন বিভাগের ফেসবুক গ্রুপ সদস্যদের মতামত চাওয়া হয়েছিল। তারা জানান, কারও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে শিশুদের ছবি দিয়ে ভাসিয়ে দেয়ার চেয়ে ভিউয়ার্সরা বাচ্চার নামে নিজস্ব অ্যাকাউন্টকে বেশি প্রাধান্য দেবো

ছবির কপিরাইট ইনস্টাগ্রাম
Image caption সেরেনা কন্যা অ্যালেক্সিস এর নামে খোলা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া পোস্ট

বিবিসি নিউজ এন্টারটেইনের ফেসবুক পাতায় এমনই মন্তব্য করেছেন একজন পাঠক।

নিকোল জেমস নামে আরেকজন লিখেছেন "এটি এমন একটি স্থান হবে যেখানে শিশুর অজস্র অগণিত ছবিতে ভরা থাকবে যা আমার বন্ধুদের কোনোভাবে বিরক্ত করবে না এবং সেটি আমার জন্য হবে ছোট-খাটো স্মৃতি সংরক্ষণাগার। আমি চাইলে অ্যাকাউন্টটি একান্ত ব্যক্তিগত রাখতে পারছি।"

জোভনি ভিনসেন্ট লিখেছেন, তিনি কখনোই তার শিশুর জন্য ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খুলবেন না। তার মতে, সন্তানকে জিনিষপত্রের মত ব্যবহার করা ভয়ংকর ব্যাপার।

তবে তিনি এটাও ভাবেন যে কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির সন্তানরা কোন প্রাইভেসি ছাড়াই বেড়ে উঠছে , সুতরাং এটা কি আদৌ কোন বিরাট ব্যাপার?

প্রকৃতপক্ষে এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি রয়েছেন যারা সচেতনভাবে তাদের সন্তানদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন না। অথবা যদি তা করেনও তাহলে সন্তানদের মুখের ছবি অস্পষ্ট করে দেয়া হয়।

প্যারেন্টিং ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্লগার জেন ওয়ালসাও, তিনি নিজের এবং তার দুই ছেলের ছবি কয়েক বছর ধরেই ইনস্টাগ্রামে দিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, যখনই কিছু পোস্ট করছেন সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে বিশেষ করে যখন তারা বড় হচ্ছে। তার সন্তানদের বয়স ১২ ও ১৩ বছর। জেন কখনো তার সন্তানের প্রকৃত নাম ব্যবহার করেননি।

"আমি কখনোই সামাজিক মাধ্যমে আমার ছেলেদের নগ্ন অবস্থার কিংবা টয়লেট করছে এমন অবস্থার ছবি দেব না। কখনোই তাদের পুরো নামও প্রকাশ করিনি। (তাদের ম্যাক্সি এবং মিনি বলে ডাকা হয়)।"

ছবির কপিরাইট ইনস্টাগ্রাম
Image caption মাইকেল ফেল্পস এর ছেলের অ্যাকাউন্ট

"কিন্তু এখন আমি চাইবো যে তারা বিচার বিবেচনা করে নিজেদের কাহিনী নিজেরাই বলুক।"

বড় ছেলের নিজস্ব আইডি আছে উল্লেখ করে জেন বলেন, সেখানে কেবল ফুটবল বুটের চারটি ছবি আপলোড করা হয়েছে।

জেন সতর্ক করে বলেন, "অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে, তারা এই ডিজিটাল ফুট-প্রিন্টের যুগে প্রথম প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠছে যে দুনিয়া তারা তৈরি করেনি। যদি আমার ছেলেরা তাদের সম্পর্কিত সমস্ত পোস্ট মুছে ফেলতে বলে তাহলে সেটা অবশ্যই তাদের অধিকার।"

কারো আয়-রোজগার অনলাইন জীবনের ওপর নির্ভর করলেও প্রাইভেসি রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে জানান জেন।

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইন্সটিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর ডক্টর ভিক্টোরিয়া ন্যাশ বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের কিছু পোস্ট করার আগে এর প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে ভাবা দরকার। তার মতে এখন লোকজন আগের চাইতে সচেতন হচ্ছে, কিন্তু আগে তারা হয়তো যেনতেনভাবে বাচ্চাদের ছবি তুলে দিত।"

বাচ্চাদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন। কিন্তু একটি শিশুর আইডেন্টিটি বা পরিচয়ের মালিকানা কার?

"ইন্টারনেট থেকে কোনকিছু ডিলিট করা বা সম্পূর্ণ মুছে ফেলা অসম্ভব। পাঁচ বছরের মধ্যেও অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে ফেলা হলেও কেউ হয়তো স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে পারে। সুতরাং কোন ধরনের ছবি পোস্ট করতে যাচ্ছেন তা আগেই ভাবতে হবে-পরে কি তা বিব্রতকর হয়ে উঠতে পারে?" বলছিলেন ডক্টর ন্যাশ।

ছবির কপিরাইট ইনস্টাগ্রাম
Image caption ডিজে খালেদের পুত্র আসাদ খালেদের অ্যাকাউন্ট থেকে সাড়ে তিনশোর বেশি পোস্ট করা হয়েছে এবং একবছর-বয়সী শিশুটি এরিমধ্যে ১৮ লাখ মানুষ তাকে অনুসরণ করছে ইনস্টাগ্রামে।

তিনি বলেন, অনেকেই হয়তো অন্য বাচ্চাদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে বা অনলাইনে পোস্ট করার ক্ষেত্রে তাদের বাবা-মায়ের কাছে অনুমতি চান, কিন্তু আবার অনেকেই ছুটির দিনে বাচ্চাদের জ্বেড়াতে যাওয়ার ছবি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

বিষয়টির সাথে যখন সেলিব্রেটিরাও জড়িয়ে আছেন তখন তাদের মোটিফ কি সেটা ভাবতে হবে।

"আমি কি আমার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানোর জন্য সন্তানকে ব্যবহার করছি ? হয়তো আমি সে পরিস্থিতিতে নেই কিন্তু তারপরও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।"

সম্পর্কিত বিষয়