বাংলাদেশে চাকরি খোঁজার সময় ‘ফার্স্ট টার্গেট বিসিএস’ কেন?

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীরা ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীরা

বাংলাদেশে চার লাখের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ তরুণী এখন বেকার। কাঙ্খিত কর্মসংস্থান হিসেবে এদের প্রায় সবাই চায় সরকারি চাকুরি। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে সবাই চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। যেখানে মোটামুটি সবার প্রথম পছন্দ বিসিএস এবং সরকারি চাকরি।

সর্বশেষ ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় মাত্র ২ হাজার ২৪টি পদের বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার চাকরিপ্রার্থী। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক, প্রায় চার লাখ আবেদন পড়ে ওই বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য।

সাধারণ শিক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে পাশ করা ছাড়াও এখন বিবিএ, আইবিএ, বুয়েট থেকে বেরিয়েও অনেকে সরকারি কর্মকমিশনের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

বিসিএস তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকতে অনেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র কাদের মন্ডল প্রথম বর্ষ শেষ করেই বিসিএস প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, "আমাদের মতো সামাজিক বিজ্ঞান বা কলা অনুষদে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিসিএসই পারফেক্ট এবং যুগোপযোগী। বিবিএ ছাত্রদের জন্য বেসরকারি ব্যাংক এবং কর্পোরেট অনেক চাকরির সুযোগ আছে কিন্তু আমাদের সেটা নেই।"

Image caption বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী চাকুরিজীবি কাজ করে ব্যক্তিমালাকানাধীন প্রতিষ্ঠানে

বিসিএস পরীক্ষায় ভাল করলে তদবির ছাড়াও চাকরি হয় বলে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন। সরকারি চাকুরির সুযোগ সুবিধা এবং নিরাপত্তা এখন অনেক বেশি বলেই সবার বিশ্বাস। নতুন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তাদেরও লক্ষ্য জীবনের লক্ষ্য- বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি করা।

প্রথম বর্ষের ছাত্রী তানজিব ইসলাম বলেন, "বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কিন্তু ততটা নিরাপত্তা নেই। যেকোনো সময় চাকরি থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। এজন্য আমাদের ফার্স্ট টার্গেটই হলো বিসিএস।"

আরো পড়তে পারেন:

মার্কিন সেনেটের ফ্লোরে দশ দিনের শিশু, ইতিহাস সৃষ্টি মায়ের

ভারতে নিখোঁজের ৪০ বছর পর স্বজনের কাছে ফেরালো ইউটিউব ভিডিও

'বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে সম্পর্ক খারাপ হবে'

আরেক ছাত্র তোফায়েল হক বলেন, "সরকারি চাকরিতে একটা সম্মান আছে। আবার বিবাহের ক্ষেত্রেও দেখা যায় সরকারি চাকরি থাকলে বেশি গুরুত্ব পায়।"

কিছুদিন আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের শিক্ষার্থীরা খুব একটা বিসিএস দিত না। কিন্ত এখন অনেকেই ঝুঁকছে সরকারি চাকুরির দিকে। বুয়েট এমনকি আইবিএ'র শিক্ষার্থীরাও এখন সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে এবং সরকারি চাকরিতে যোগ দিচ্ছে।

বাণিজ্য অনুষদের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র জাকারিয়া বলেন, "আমি একজন উদ্যোক্তা হবো। এজন্য বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু সেটা হয়তো আমি সময়মতো পাব না। ব্যবসার পরিবেশও একটা ব্যাপার। এসব কারণে অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চায় না। বিসিএসের দিকে মুভ করে।"

মার্কেটিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র শোয়েব বলেন, "আমাদের অনেক বড় ভাইরা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি বাকরি করছে। তারা প্রায়ই বলেন যে, প্রাইভেটে এসে কী করবি! এরচেয়ে সরকারিতে চেষ্টা কর, একবার হয়ে গেলে লাইফ সেটেল।"

Image caption বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী চাকুরিজীবি কাজ করে ব্যক্তিমালাকানাধীন প্রতিষ্ঠানে

বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিসের চাকুরি এখন বেশ লোভনীয়। প্রতিযোগিতাও বেড়ে গেছে মারাত্মক। এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সরকারি চাকরির পেছনে ছুটছে।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ'র ছাত্র জাহিদ হাসান বলেন, "সবাইতো আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় না। বাধ্য হয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হচ্ছে। এখানে পড়েও অনেকে চেষ্টা করে বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি করার। এখনতো সরকারি চাকরিতে সুযোগ সুবিধা অনেক বেশি। এজন্যই সবাই প্রথম চেষ্টা করে বিসিএস দিতে।"

বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কর্মসংস্থানের যে চিত্র তাতে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে মাত্র চার শতাংশের সরকারি চাকুরির সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ বড় অংশেরই কর্মসংস্থান হতে হবে বেসরকারি ব্যক্তিমালিকানা খাতে। বেশিরভাগেরই যে সরকারি চাকরি হবে না এটা নিশ্চিত।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, "তিনটা জিনিস কাজ করে। একটা হলো প্রারম্ভিক বেতন আগে যেটা ভাল ছিল না এখন সেটা খুব ভাল। এখন শুরুতেই ৪০ হাজার টাকার ওপরে বেতন দেয়া হয়। সেই সাথে তাদের আরো অনেক রকম সুবিধা থাকে। বাইরে থাকলে বাড়ী ভাড়াটাড়া সব থাকে। তৃতীয়ত তাদের একটা ক্ষমতা থাকে। আর শেষ যেটা বলবো, ব্যক্তিখাতে গত দু'তিন বছর ধরে শিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান খুব কমে গেছে।"

Image caption প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরির বিভিন্ন সুবিধাদি

বিবিএ, এমবিএ করা বুয়েট বা আইবিএর শিক্ষার্থীদের নানা সুযোগ থাকা সত্বেও তারা সরকারি চাকরিতে আগ্রহী কেন এ প্রশ্নে মি. মনসুরের বিশ্লেষণ হলো বেসরকারি খাতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে আসছেন লোভে পড়ে।

"তারা কাস্টমস ক্যাডার পছন্দ করে বা ইনকাম ট্যাক্স ক্যাডার পছন্দ করে। এটা শুধু লোভের জন্য, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এটা দুঃখজনক। তাদের বিকল্প সুযোগ ছিল। একজন অসৎ অফিসার যতো অর্থ আয় করবে কোনো চাকরিতেই তার চাইতে বেশি বেতন দিতে পারবে না। কাস্টমসে একজন অসৎ অফিসার চাইলে বছরে কোটি আয় করতে পারবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বছরে এক কোটি টাকা দিতে পারবে না।"

চাকরিপ্রার্থীদের অনেকের সঙ্গেই কথা হলো যারা চারবার পাঁচবার বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছেন। তারা বলছেন, দুর্নীতি বা অনিয়মই সবার লক্ষ্য নয়। তরুণ প্রজন্ম চায় দেশের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করতে। আর সেটা করা যায় সরকারি চাকরিতে ঢুকেই।

এদিকে সম্প্রতি কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পর সরকারি চাকরিতে সব রকম কোটা বিলোপের ঘোষণা এসেছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন এটি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বিসিএসের জন্য আগ্রহ, সেই সাথে প্রতিযোগিতাও আরো অনেক বাড়বে।

সম্পর্কিত বিষয়