বাংলাদেশ কেন এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে?

এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে নিচে। ছবির কপিরাইট BBC bangla
Image caption এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে নিচে।

এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে নিচের দিকে রয়েছে।

বৈশ্বিক-ভাবে মোবাইল ইন্টারনেট নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে এমন একটি সংস্থা জিএসএমএ এমন তথ্য দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাত্র ২১ শতাংশ মানুষের কাছে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ আছে যা এই অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০১৭ সালের তথ্য তুলে ধরে জিএসএমএ বলে, সেসময় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইব করেছেন। যদিও সেসময় বাংলাদেশ থ্রি-জি নেটওয়ার্কের আওতায় আসে, কিন্তু তারপরও অনুপাত এমনই ছিল।

এমনকি নেপাল ও মিয়ানমারের মত দেশ, যাদের বাংলাদেশের তুলনায় জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন কম, তারাও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে এগিয়ে আছে। সেখানে শতকরা হার ২৮ থেকে ৩৫ শতাংশ।

রিপোর্টে বলা হচ্ছে, অধিকাংশ গ্রাহকই তাদের মোবাইল ফোনে মূলত ফোনকল এবং এসএমএস সার্ভিস ব্যবহার করে থাকেন।

দেশটি গ্রাহক প্রতি গড় রেভিন্যুর মাত্রার দিক থেকেও বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

আরও পড়ুন:

মোবাইল ফোনে ফ্রি অ্যাপ থেকে আয় হাজার হাজার ডলার

মোবাইল গ্রাহকরা ফোর-জি সেবা কতটা পাবেন?

পিছিয়ে থাকার কারণ কী?

জিএসএমএ তাদের পর্যবেক্ষণে বলছে, জনগণের সামর্থ্যের বিষয়টি এখানে একটি বড় অন্তরায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে তা বহন করা কষ্টকর। তাদের মাসিক আয়ের বড় অংশ সেখানে চলে যায়।

মোবাইল সেক্টরে উচ্চহারে করারোপ এবং ফি'র ফলে মোবাইল অপারেটরদের সার্বিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সরাসরি রি-টেইল মূল্য বেড়ে যায় এবং ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ পড়ে। এটিও উল্লেখযোগ্য বাধা তৈরি করছে ডিজিটাল অগ্রগতিতে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে মোবাইল সার্ভিসের ক্ষেত্রে কর আরোপের ফলে ট্যারিফ ব্যয় প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি (২২ শতাংশ)।

উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়,এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে যার হার ১০ দশমিক ৪ ডলার ও বিশ্বে ১৪ দশমিক ৬ ডলার, সেখানে বাংলাদেশে এই হার ২ দশমিক ৯ডলার।

তরঙ্গ ও কর জটিলতার কারণে অপারেটররা নেটওয়ার্ক কভারেজ সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করতে পারছেনা।

ছবির কপিরাইট Gsma
Image caption বাংলাদেশে মোবাইল গ্রাহক পরিসংখ্যান

বাংলাদেশে এখন মোবাইল ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তির উত্তরণ সময়ের ব্যাপার। গত ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ফোরজির নিলাম হয়েছে।

দেশটিতে অবকাঠামোগত সমস্যা এবং সামর্থ্যের অভাব আঞ্চলিক-ভাবে পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

সংস্থাটি বলছে ২০২১ সালের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার জন্য মোবাইল তরঙ্গ এবং কর সংস্কার প্রয়োজন। কারণ বিভিন্ন বিষয় এই লক্ষ্য পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী রেটে মোবাইল সেবা-দান, কর ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট তরঙ্গের দাম।

জিএসএমএ কারা?

এই সংস্থাটি আন্তর্জাতিকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তাদের সদস্য প্রায় ৮০০ মোবাইল অপারেটর এবং ৩০০-র বেশি প্রতিষ্ঠান।

তারা বলছে বাংলাদেশে থ্রি জি বরাদ্দ সীমিত হওয়ায় এবং আগের নিলামে এর দামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে মোবাইল সেবার গুণগত মানের ক্ষেত্রে। যা গতি বাড়াতে এবং ডিজিটাল সেবার জন্য ব্যবহার হয়েছে।

২০১৭ সালের শেষদিকে ৭১ শতাংশের বেশি ছিল টু-জি সংযোগ। কিন্তু ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিলামে উচ্চমূল্য এবং আনুষঙ্গিক লাইসেন্স ফি বহাল ছিল।

সরকারের উচিত সময়মত তরঙ্গ ছাড় এবং তার জন্য ন্যায্য দাম নির্ধারণ যাতে করে মানসম্পন্ন এবং সাশ্রয়ী-ভাবে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা যায়।

যদিও বাংলাদেশে মোবাইল খাত থেকে কর ও ফি সরকারি ব্যয়নির্বাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, কিন্তু প্রচলিত কর ব্যবস্থা মোবাইল সেবা-দানের উন্নতির জন্য সহায়ক নয়, বলছে জিএসএমএ।

"সুদূর প্রসারী নিয়ন্ত্রণ-কাঠামোর পরিবেশ তৈরি করতে পারলে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা উন্নত করা যাবে" এমনটাই বলা হচ্ছে জিএসএমএ'র রিপোর্টে। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার বা গ্রাহকদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ কোটিতে পৌঁছাবে বেল আশা করা হচ্ছে। যা হবে মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ। তারপরও আনুমানিক ১০ কোটির বেশি মানুষ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবস্থার বাইরে থাকবেন, বলছে জিএসএমএ।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ, বলছে গবেষণা

রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি গত দশকে দ্রুতগতিতে এগিয়েছে যা এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে পঞ্চম বৃহৎ মোবাইল মার্কেট হিসেবে রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে আট কোটি ইউনিক সাবস্ক্রাইবার হয়েছে ২০১৭ সালে এবং তা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক।

জিএমএমএ'র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অ্যালাসডেয়ার গ্রান্ট তাদের রিপোর্টে বলেন, "দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগের জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরির উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে"।

মোবাইল ইকো-সিস্টেম আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে সাড়ে সাত লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।

২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ খাতে মোট চাকরি সংখ্যা সাড়ে আট লাখ ছাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মি: গ্রান্ট আরও বলেন, "আমরা আশা করি বাংলাদেশে মোবাইল খাতের অর্থনৈতিক অবদান অব্যাহত-ভাবে প্রসারিত হবে। আর্থিক মূল্যের দিক থেকে এই খাত থেকে ২০২০ সাল নাগাদ ১৭ বিলিয়ন ডলার আসবে বলে আমরা ধারণা করছি"।