যৌন হয়রানি কীভাবে রুখবে? স্কুল পড়ুয়াদের দেয়া অদ্ভূত পরামর্শ নিয়ে ভারতে বিতর্ক

স্কুল শিশুদের দেয়া এই পরামর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে ছবির কপিরাইট SEBASTIAN D'SOUZA/AFP/Getty Images
Image caption স্কুল শিশুদের দেয়া এই পরামর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে

ভারতের একটি রাজ্যে শেখানো হচ্ছে যে যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পেতে শিশুদের শালীন পোষাক পড়া, ঠিকমতো বসতে শেখা আর বাস-ট্রেনে পুরুষদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে বসা দরকার।

তামিলনাডু রাজ্যের সরকারী স্কুলগুলিতে অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবইতে ওইসব উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে ওই পাঠ্যবইতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে যেন কন্যা-শিশুদের পোষাক-আশাক বা ঠিকমতো বসতে না পারার কারণেই তাদের ওপরে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে।

ভারতে একের পর এক কন্যাশিশুর ওপরে ধর্ষণ ও যৌন হয়রাণির ঘটনার প্রেক্ষিতে বিজ্ঞানের পাঠ্যবইতে এমন অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দেখে চোখ কপালে উঠেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর।

তামিলনাডুর রাজ্যসরকারী স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর বিজ্ঞানের পাঠ্যবইতে একটি পরিচ্ছেদ রয়েছে যৌন হয়রানি কীভাবে রুখতে হবে, তা নিয়ে।

সেখানে লেখা হয়েছে, যৌন হয়রানি আটকানোর প্রাথমিক উপায় :

"সন্দেহজনক কোনও ব্যক্তির সঙ্গে একলা থেকো না, উত্তেজক পোষাক পড়ো না, কাউকে চুমু খেতে অথবা আদর করতে দিও না।"

"ঠিকমতো বসছ কী না, তার দিকে নজর রাখো।"

"বাস বা অটোরিক্সা অথবা ট্রেনে করে যখন স্কুলে আসবে, তখন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের থেকে দূরত্ব বজায় রাখো।"

ছবির কপিরাইট PARANJPE/AFP/Getty Images
Image caption ধর্ষণ বিরোধী বিক্ষোভে সম্প্রতি ভারত ছিল উত্তাল

মনে হচ্ছে যৌন হয়রানির হাত থেকে নিজেদের বাঁচানো যাবতীয় দায় দায়িত্ব শিশুদেরই।

শিশু অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে এমন একটি সর্বভারতীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্রাইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় প্রোগ্রাম হেড মহুয়া চ্যাটার্জী বলছিলেন, "আদি অনন্তকাল থেকে আমরা যে সামাজিক নিয়মশৃঙ্খলা দিয়ে মেয়েদের বেঁধে রেখেছি, তা থেকেই এইসব অবশ্য কর্তব্য বিষয়গুলি উঠে আসছে। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই আমরা বলে দিতে পারি যে একটি মেয়ে কীভাবে বসবে, কী পড়বে - তার ওপরেই নির্ভর করছে যে মেয়েটির ওপরে কেমন ব্যবহার করবে পুরুষরা - সেটা।"

অন্যান্য খবর: বাংলাদেশের চমকপ্রদ সাফল্যের নেপথ্যে কী

অ্যাসাইলাম পেতে মূল নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়: শাহরিয়ার

হঠাৎ কেন নরেন্দ্র মোদি চীন সফরে যাচ্ছেন

তার কথায়, ছেলে বা মেয়েদের বড় হয়ে ওঠার সময়ে তাদের যে ধরণের পুরণো চিন্তাভাবনা প্রসূত নিয়মকানুনের বেঁধে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, তা সম্পূর্ন ভুল।

"ছেলেদের বা পুরুষদের প্রতি একটা ভয়-ভীতি তৈরী করে দিলে, বা তাদের থেকে দূরত্ব তৈরী করে দিলেই কি কন্যাশিশুদের যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে? উল্টোদিকে ছাত্রদেরও তো শেখানো উচিত তারা কীভাবে সহপাঠিনীদের সঙ্গে ব্যবহার করবে," বলছিলেন মিজ. চ্যাটার্জী।

তামিলনাডু রাজ্যে তামিল, ইংরেজী, মালয়লাম ও কন্নড - এই চারটি ভাষাতেই সব সরকারী স্কুলে ওই পাঠ্যবইটি পড়ানো হয়। এটির লেখা ও বিলি বন্টন করে রাজ্য শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কাউন্সিল।

ওই সরকারী সংস্থার পরিচালক জি আরিভোলির কাছে জানতে চেয়েছিলাম যৌন হয়রানি রুখতে পড়ুয়াদের যেসব শেখানো হচ্ছে, তা কি সঠিক বলে তারা নিজেরা মনে করেন?

মি. আরিভোলি বলছিলেন, "এই বইগুলি অন্তত ১২ বছর আগে লেখা হয়েছে - তখন কী ভাবনাচিন্তা করে লেখা হয়েছিল আমি বলতে পারব না। তবে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম বিষয়টি আমাদের নজরে এনেছে। এতদিন কোনও প্রশ্ন ওঠে নি বিষয়গুলি নিয়ে। কিন্তু এখন নজরে আসার পরে আমরা বিষয়টি ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। শিক্ষা মন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন যে নতুন করে ওই পরিচ্ছেদটি লেখা হবে।"

তবে নতুন পাঠ্যবই আসতে এখনও তিন বছর সময় লাগবে।

আর ততদিন তামিলনাডুর কয়েক লক্ষ ছাত্রছাত্রী এটাই শিখতে থাকবে যে যৌন হয়রানি রুখতে মেয়েদেরই শালীন পোষাক পড়তে হবে, সঠিকভাবে বসা শিখতে হবে আর পুরুষদের ছোঁয়া বাচিয়ে বাসে-ট্রেনে চলার দায়ও তাদেরই।