প্রীতিভাজনেষু: আপনাদের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা

MANJUNATH KIRAN ছবির কপিরাইট MANJUNATH KIRAN

বহু বছর ধরে প্রীতিভাজনেষু ছিল শ্রোতাদের সাথে বিবিসি বাংলার যোগাযোগের নিয়মিত প্লাটফর্ম। শ্রোতাদের কাছে বিবিসি বাংলার জবাবদিহিতার প্রধান মাধ্যম। এপ্রিল মাসের এক তারিখ থেকে রেডিওতে প্রীতিভাজনেষু আর না থাকলেও, জবাবদিহিতার নীতিতে কোন পরিবর্তন হয়নি।। জবাবদিহিতার জায়গাটি এখন চলে এসেছে আমাদের ওয়েবসাইটে, যার লিঙ্ক ফেসবুকের মাধ্যমেও আপনাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

যাই হোক, এবার তাকানো যাক চিঠি-পত্রের দিকে। অন্যান্য সপ্তাহের মতো এ'সপ্তাহেও বিভিন্ন বিষয়ে চিঠি-পত্র এসেছে। প্রথমেই দেখা যাক গত তিন সপ্তাহ এই প্রশ্নোত্তর পর্বে আমার অনুপস্থিতি নিয়ে একটি চিঠি।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক জানতে চাইছেন আমি বিবিসি ছেড়ে দিয়েছি কি না। তিনি লিখছেন:

''বিবিসি'র দুটি বাংলা অধিবেশন বন্ধের প্রায় মাস পেরোতে চললো। সম্পাদক সাবির মুস্তাফা ভাইকে আর কোথাও পাচ্ছি না কেন? নাকি তিনি বিবিসি ছেড়ে দিয়েছেন! যদি তিনি না ছেড়ে থাকেন, তবে অবশ্যই তাঁর কাছে জানার ইচ্ছা বিবিসির অধিবেশন বন্ধের পর গত একমাস বিবিসি পরিবারের কেমন কাটলো?''

না মিঃ ইসলাম, আমি বিবিসি বাংলা ছাড়ি নাই, এবং এই মুহূর্তে ছাড়ার কোন পরিকল্পনাও আমার নেই। তবে ভবিষ্যতে কী হয়, তা কে জানে! আর দশটা লোকের মত আমারো ছুটি-ছাটার প্রয়োজন হয় এবং আমি প্রায় পুরো মাসটি ছুটিতে ছিলাম।

বিবিসি বাংলার সকালের প্রভাতী এবং রাতের পরিক্রমা অনুষ্ঠান বন্ধের কোন বিরূপ প্রভাব আমরা এখনো লক্ষ করছিনা, তবে জরিপের মাধ্যমে সেটা যাচাই করা হবে। সম্ভবত আগামী বছর।

আর আমার সহকর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া বলতে পারেন কিছুটা মিশ্র। একটি বা দুটি অনুষ্ঠান বন্ধ হলে কেউ খুশি হন না, আমিও হইনি। কিন্তু রেডিও কমিয়ে ডিজিটাল এবং টেলিভিশনের ওপর জোর দেওয়াটা যে সময়োপযোগী, তা নিয়ে খুব একটা দ্বিমতও আমাদের মধ্যে নেই।

দিনাজপুরেরই আরেকজন শ্রোতা, কামরুজ্জামান সরকার অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি অনুভব করছেন, তবে আমার না। মিঃ সরকার মানসী বড়ুয়াকে মিস করছেন। তিনি লিখেছেন:

''প্রবাহ অনুষ্ঠানে মেয়েরা সংবাদ উপস্থাপনা করছে না কেন? মানসী বড়ুয়া কোথায় হারিয়ে গেলেন? তিনি কি বিবিসি থেকে চলে গেছেন? যদি না চলে গিয়ে থাকেন তাহলে মানসী বড়ুয়া বা সানজানা চৌধুরীর সংবাদ উপস্থাপনা শুনতে চাই।''

আবারো না, মিঃ সরকার, মানসী বড়ুয়া বিবিসি ছেড়ে দেননি, বা ছেড়ে দেবার কোন পরিকল্পনাও তার নেই। তিনি তিন মাসের জন্য বিবিসিতেই অন্য দায়িত্ব পালন করছেন। আমি আশা করছি আগামী মাসেই তিনি বাংলায় ফিরে আসবেন। আর সানজানা চৌধুরীকে আপনি সকালের প্রত্যুষা উপস্থাপনা করতে শুনবেন। প্রবাহতে ঢাকার অন্যান্য সহকর্মীর মত তিনি মূলত: সংবাদ সংগ্রহ এবং প্রতিবেদন তৈরির কাজ করেন।

সানজানার কথা বলতে বলতেই তাঁকে নিয়ে আরেকটি চিঠি চোখে পড়লো। খুলনার মুকুল সরদার সানজানা চৌধুরী সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে চেয়ে লিখেছেন:

''বিবিসি বাংলার নতুন কর্মী সানজানা চৌধুরীকে শুনছি বেশ কিছু দিন। রিপোর্টিং এবং উপস্থাপনায় বেশ পারদর্শী মিষ্টি কণ্ঠের সানজানা চৌধুরী কোথায় লেখাপড়া করেছেন, বিবিসি বাংলায় যোগ দেবার আগে কি করতেন, কিছুই জানা হয়নি। নতুন কর্মীদের সম্পর্কে জানতে সব সময়ই শ্রোতাদের আগ্রহ আছে।''

কারো ব্যক্তিগত তথ্য প্রচারে ব্রিটেনে বেশ বিধি-নিষেধ আছে মিঃ সরদার, তাই একটু সতর্কতার সাথেই সহকর্মীদের তথ্য প্রকাশ করা হয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ না করে যা বলা যায় তা হলো, সানজানা বিবিসিতে যোগ দেবার আগে বাংলাদেশের 'সময় নিউজ' টেলিভিশনে কাজ করতেন। আর পড়াশোনা করেছেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ইদানীং আমরা সন্ধ্যার প্রবাহ অনুষ্ঠানটি ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করছি। কাজেই আমাদের রেডিও অনুষ্ঠানের শুধু শ্রোতা নয়, দর্শকও তৈরি হচ্ছে। ফেসবুকে রেডিও অনুষ্ঠান দেখে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া এখনো খুব একটা পাওয়া যায়নি, তবে পশ্চিমবঙ্গের একজন শ্রোতা বলছেন তিনি কীভাবে উপকৃত হয়েছেন।

ছবির কপিরাইট OLI SCARFF

মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর থেকে সবুজ বিশ্বাস লিখেছেন: ''আমি একজন অনিয়মিত শ্রোতা ছিলাম। এখন ফেসবুক লাইভ স্ট্রিমিং এবং তার আগে ফেসবুকের পাতায় আপডেট এলার্ট হিসেবে কাজ করে। কাজেই ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং দেওয়ার ফলে এখন নিয়মিত শোনার সুযোগ হচ্ছে। এরজন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলাকে। তাছাড়া, এতদিনের কৌতূহলের অবসানও ঘটল। কিভাবে ষ্টুডিওতে সংবাদ পরিবেশন করা হয় সেটা দেখার সৌভাগ্য হলো।''

ঠিকই বলেছেন মিঃ বিশ্বাস। স্টুডিও থেকে রেডিও অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা কীভাবে হয়, সেটা এখন আপনারা দেখতে পারছেন। যদিও এখানে বৈচিত্র্যের অভাব আছে, আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে প্রতিবেদন বা সাক্ষাৎকারের টেপ চলার সময় কিছু ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করতে পারবো।

তবে ফেসবুক লাইভে শুধু সন্ধ্যার প্রবাহ দেখে সন্তুষ্ট নন ভোলার শ্রোতা মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান

তিনি লিখেছেন: ''বিবিসি বাংলার প্রবাহ এখন শর্টওয়েভ, এফএম, ইন্টারনেটে লাইভসহ ফেসবুকে নিয়মিত লাইভ প্রচার করা হচ্ছে যা শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সারা ফেলছে ও আগ্রহ উদ্দীপনা তৈরি করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ ও কাজ। একই রকম যদি প্রত্যুষাকে ফেসবুকে লাইভ প্রচার করা যেত তবে খুবই চমৎকার হতো। প্রত্যুষা ঢাকা স্টুডিও থেকে প্রচার করা হয় বলে কারিগরি সমস্যার কথা বলে এটিকে ফেসবুক লাইভে দেয়া হচ্ছে না, যা আমার কাছে একটি খোঁড়া যুক্তি ছাড়া কিছুই মনে হয় না। আমরা জানি ফেসবুকে লাইভ দেয়ার জন্য একটি স্মার্ট ফোনই যথেষ্ট।''

আমি দুঃখিত মিঃ রহমান, আপনার ধারণা সঠিক নয়। ঢাকায় আমরা বর্তমানে সাময়িক স্টুডিও থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করছি, সেখানে থেকে ফেসবুক লাইভ করার কোন ব্যবস্থাই নেই। কারিগরি ব্যবস্থার অভাব কোন খোঁড়া যুক্তি নয়। প্রবাহ ফেসবুক লাইভ করা হয় আমাদের লন্ডন স্টুডিওতে, যেখানে চারটি ক্যামেরা রয়েছে, যার ফলে যে যখন কথা বলছে তাকেই আপনারা সাথে সাথে দেখতে পান। যখন কোন প্রতিবেদনের টেপ বাজানো হচ্ছে, সেটা আপনারা শুনতে পান। এসব একটি মোবাইল ফোন দিয়ে সম্ভব না। তবে ঢাকায় যখন আমাদের নতুন স্টুডিও তৈরি হবে তখন সেটাকে ফেসবুক লাইভের জন্য উপযুক্ত করেই তৈরি করা হবে।

ফেসবুকের সাথেই সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রশ্ন, করেছেন গোপালগঞ্জের ঘোড়াদাইড় থেকে ফয়সাল আহমেদ সিপন। তিনি লিখেছেন: '' বেতারে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে সংবাদ প্রচারিত হলেও বিবিসি নিউজ বাংলার ফেসবুক পেজে অনেক সংবাদ দেখছি। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন নীতিমালা রয়েছে কি ?''

অবশ্যই রয়েছে মিঃ আহমেদ। অনেক গল্প আছে যেগুলো সামাজিক মাধ্যমের জন্য উপযুক্ত হলেও রেডিওতে মানাবে না। আবার রেডিওতে আমরা অনেক প্রতিবেদন প্রচার করি যেটা অনলাইন বা ফেসবুকে খুব কম পাঠকই পড়তে চাইবে। সেজন্য আমরা চেষ্টা করি যাতে অনলাইন এবং ফেসবুকে ভিন্ন মেজাজের গল্প দিতে। তাছাড়া, রেডিও অনুষ্ঠান মাত্র ৩০ মিনিটের, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি গল্প দেয়া সম্ভব। অন্যদিকে অনলাইন এবং সামাজিক মাধ্যমে অফুরন্ত জায়গা।

আবার ফিরে যাই রেডিও সংক্রান্ত প্রশ্নে। নীলফামারীর তারিফ হাসান জানতে চেয়েছেন, ''অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে বিবিসি'র সাথে বাংলাদেশের যে চুক্তি রয়েছে সে চুক্তিটা আসলে কেমন?''

আমার তো মনে হয় চুক্তিটা যেমন হওয়ার কথা তেমনি! চুক্তিতে বিবিসি কোন্ শহরে কোন্ এফ এম ব্যান্ডে, কোন‌্ সময় তার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে, সেটা নির্ধারিত আছে। বিনিময়ে বিবিসি বাংলাদেশ বেতারকে বছরে কত ফি দেবে তা নির্ধারণ করা আছে। প্রচারের ক্ষেত্রে, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে কার কী দায়িত্ব-কর্তব্য সেগুলোও পরিষ্কার করে উল্লেখ করা আছে। একই সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বর পরিপন্থী কোন কিছু না প্রচার করার বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখিত আছে। কোন পক্ষ দ্বারা চুক্তি ভঙ্গ হলে অপর পক্ষ আইনগত প্রতিকার কীভাবে পাবে সেটাও আছে।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশে ভোর সাড়ে ছ'টায় এবং রাত সাড়ে দশটায় বাংলা অনুষ্ঠানের পরিবর্তে বিবিসির ইংরেজি অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে লিখেছেন নীলফামারী থেকেই মনির হোসেন: ''বিবিসি বাংলার জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে রেডিও শ্রোতা কমে যাচ্ছে। বেশ ভালো কথা আমিও তা মানলাম। কিন্তু সকালে ও রাতের অধিবেশনে বাংলার পরিবর্তে যে ইংরেজি সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে তাতে কি শ্রোতা সংখ্যা বাড়ছে? কিংবা বাড়বে মনে হয়?''

ভোরে এবং রাতে বাংলার জায়গায় ইংরেজি কিন্তু শ্রোতা সংখ্যা বাড়ানোর জন্য দেয়া হয়নি। কারণ আমরা জানি বাংলাদেশে ইংরেজি অনুষ্ঠান দিয়ে শ্রোতা সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব না। এই ইংরেজি অনুষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের জন্য প্রচার করা হয়। এগুলো বিশেষ করে বা শুধুমাত্র বাংলাদেশের শ্রোতাদের জন্য বানানো হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের দশটি শহরে এফএম-এ যেহেতু সকাল এবং রাতে দুটি জায়গা বিবিসির জন্য বরাদ্দ আছে, তাই সেগুলোতে ইংরেজি অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। এর ফলে বিবিসি বাংলার পরিকল্পনার কোন ক্ষতি হচ্ছে না।

আজকে শেষ করছি একবারে ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ দিয়ে। স্বেচ্ছায় মৃত্যু নিয়ে জানতে চেয়েছেন নওগাঁর খায়রুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন: ''বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানান রকমের আইন আছে। বিবিসি বাংলার কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে, কোন্ কোন‌ দেশে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্র অনুমতি দিয়ে থাকে এবং তা কিভাবে কার্যকর করা হয়?''

আজকাল তো গুগলে সার্চ দিলেই সব তথ্য পাওয়া যায় মিঃ ইসলাম। আমি Wikipedia থেকে যা জানতে পারলাম তা হলো, পৃথিবীর ছয়টি দেশের আইনে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর বিধান আছে। সে দেশগুলো হলো নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, কানাডা, কলম্বিয়া এবং ভারত। আর ছটি দেশে স্বেচ্ছায় মৃত্যু বা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সহায়তা করার অনুমতি দেয়া হয়। সেগুলো হচ্ছে সুইৎজারল্যান্ড, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য। তবে এই অধিকার অত্যন্ত কঠোর শর্ত পূরণের পরেই প্রয়োগ করা যায়। স্বেচ্ছায় মৃত্যুর অনুমতি সাধারণত তাদেরই দেয়া হয় যারা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং অসম্মানকর জীবন যাপন করছেন এবং সুস্থ হবার কোন সম্ভাবনাই নেই।

এবার চিঠি পাঠিয়েছেন এমন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে শেষ করছি:

মোহাম্মদ হাবিব, ভোলা।

মারুফ বিল্লাহ, মোড়েলগঞ্জ, বাগেরহাট।

আজহারুল ইসলাম, যশোর

শাওন সজীব, সুইডেন

খায়রুল বাশার, কয়রা, খুলনা

তৌসিফ আহমেদ, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ

সিদ্ধার্থ ব্যানার্জী, পশ্চিম মেদেনিপুর, পশ্চিমবঙ্গ

এনামুল হক, গোদাগাড়ী, রাজশাহী

আতিকুর রহমান জসিম, খুলনা

আমাদের সাথে যোগাযোগের ঠিকানা:

ইমেইল: bengali@bbc.co.uk

ফেসবুক: www.facebook.com/BBCBengaliService/

টুইটার: https://twitter.com/bbcbangla

সম্পর্কিত বিষয়