কলকাতায় মেট্রোরেলে আলিঙ্গনের জন্য এক প্রেমিক-যুগলকে পেটানোর ঘটনায় হৈচৈ

বেধড়ক পেটানো হচ্ছে প্রেমিক যুগলকে ছবির কপিরাইট Anandabazar.com
Image caption বেধড়ক পেটানো হচ্ছে প্রেমিক যুগলকে

কলকাতার মেট্রো রেলে এক তরুণ প্রেমিক-যুগলকে আলিঙ্গন করার জন্য বেধড়ক পিটিয়েছেন তাদেরই কজন সহযাত্রী যাদের অধিকাংশই মাঝবয়সী অথবা প্রৌঢ়।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, কলকাতার মত কসমোপলিটান একটি শহরে আলিঙ্গনের জন্য প্রেমিক প্রেমিকাকে গণধোলাই দেওয়া হতে পারে -এ দৃশ্য তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

তবে মেট্রো রেল বলছে ওই সময়ের সিসিটিভির ফুটেজে কোথাও বা মারধরের ছবি ধরা পড়ে নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সোমবার রাতের দিকে একটি ট্রেনে কিছু প্রবীণ যাত্রী ওই প্রেমিক যুগলের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ধরে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।

প্রথম দিকে ওই তরুণ ঠাণ্ডা গলাতেই কথা বলছিলেন, প্রবীণ সহযাত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। কিছুটা হাল্কা রসিকতাও করেন তিনি।

একসময় মেট্রো রেলের দমদম স্টেশনে ট্রেন থামলে তাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে মারধর শুরু হয়। ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য ওই তরুণী তাকে আড়াল করে দাঁড়ায়, কিন্তু মার খায় ওই মেয়েটিও।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী

ওই মেট্রো ট্রেনেই অফিস থেকে ফিরছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল বিভাগের সাংবাদিক উজ্জ্বল চক্রবর্তী।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "স্টেশনে ট্রেনটা থামতেই যেখানে যাত্রীদের বসার জায়গাগুলো আছে, সেখানে ঠেসে ধরে ছেলেটিকে পেটানো শুরু হয়। মেয়েটি তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যাতে মারগুলো তার গায়েই পড়ে। কিন্তু ফাঁকফোকর দিয়ে মারা হতে থাকে, মেয়েটিও মার খায়।"

পরে অন্য কামরা থেকে আসা কিছু নারী-পুরুষ ওই যুগলকে আড়াল করে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান।

ছবির কপিরাইট Anandabazar.com
Image caption প্রেমিককে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলো মেয়েটি

নিয়মিত মেট্রো রেলেই যাতায়াত করেন মি. চক্রবর্তী। "হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম দৃশ্যটা দেখে। এ দৃশ্য দেখতে হবে কলকাতা মেট্রোতে কখনও ভাবি নি। এটা কোন কলকাতা!"

মি. চক্রবর্তীর প্রতিবেদন মঙ্গলবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পরে সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।

টুইটারে সমালোচনার ঝড়

টুইট করেছেন তসলিমা নাসরিন থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ নারী পুরুষ।

তসলিমা নাসরিন লিখেছেন - "এক তরুণ প্রেমিক যুগলকে আলিঙ্গন করতে দেখে কিছু হতাশ, বয়স্ক হেরে যাওয়া ব্যক্তি রেগে গিয়ে তাদের পিটিয়েছেন। ঘৃণার দৃশ্য ছাড় পেতে পারে, কিন্তু প্রেমের দৃশ্যকে অশ্লীল বলা হচ্ছে।"

ফিনিক্স অফ ভিয়েনা নামে আরেক টুইট-ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "এর পরে কোনও বাঙালী যদি সহনশীলতা নিয়ে লেকচার দিতে আসে, তখন এই প্রতিবেদনটি তাকে দেখাব।"

সামাজিক মাধ্যমে যেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে ঘটনাটি নিয়ে, তেমনই নিয়মিত মেট্রোর যাত্রীরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন।

মেট্রোয় চেপে নিয়মিত অফিস যান দেবযানী মুখার্জী। তিনি বলছিলেন, "অনেক কম বয়সীকেই দেখি বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তা কখনই দৃষ্টিকটু লাগে নি বা অস্বাভাবিক বলে মনে হয় নি। এটাই তো বয়সের ধর্ম। প্রেম বা ভালবাসা তো সব যুগেই হয়ে এসেছে, নানা ধরণে। এটা অস্বাভাবিক কেন লাগবে। আর এর জন্য কাউকে মারধর করা হতে পারে, এটা ভাবাই যাচ্ছে না।"

তরুণী অফিসযাত্রী প্রীতি চৌধুরীও নিয়মিত মেট্রো রেলই ব্যবহার করেন। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন ওই সংবাদটা 'ফেক নিউজ'। পরে সত্য জানতে পেরে বিস্মিত হয়েছেন।

ছবির কপিরাইট Twitter
Image caption তসলিমা নাসরিন টুইটারে লিখেছেন- 'ঘৃণার দৃশ্য ছাড় পেতে পারে, কিন্তু প্রেমের দৃশ্যকে অশ্লীল বলা হচ্ছে।'

মিজ চৌধুরী বলছিলেন, "অনেক সময়েই আমাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। তখন নিজেকে বাচাতে আমিই প্রতিবাদ করেছি। কোনও মহিলা বা বয়স্ক সহযাত্রীকে কিন্তু আমার সাহায্যে এগিয়ে আসতে দেখি নি। তখন এইসব প্রতিবাদীরা কোথায় যায়?"

ডিপজ নামে এক টুইট ব্যবহারকারী কলকাতার তরুণ প্রেমিক প্রেমিকাদের সতর্ক করে দিয়ে লিখেছেন, "কিছু হতাশ ব্যক্তি - যাদের মধ্যে বয়স্করাও রয়েছেন.. তারা তোমাদের দেখে হিংসায় জ্বলছেন.. তাই তোমরা সাবধান...।"

সুমন সেন নামের আরেকজন টুইটারে বলছেন: "ধিক্কার তোমায় কলকাতা.. ধিক কলকাতা মেট্রো। কিছু অশিক্ষিত মানুষই কী এখন ঠিক করে দেবে যে কীভাবে মেট্রো রেলে বসতে বা দাঁড়াতে হবে।"

সিসিটিভিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি

যদিও বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নিত্যযাত্রী এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ বলছে দমদম স্টেশনে লাগানো প্রতিটা সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।

কিন্তু সোমবার রাতে ওই ট্রেনটি স্টেশনে থামার ছবি থেকে শুরু করে সিঁড়ি দিয়ে যাত্রীরা বেরিয়ে যাওয়ার গোটা দৃশ্যটা খুঁটিয়ে দেখেও কোনোধরনের গণ্ডগোল বা অশান্তি অথবা মারধরের ছবি দেখা যায় নি।

মেট্রো রেলের মুখপাত্র ইন্দ্রাণী ব্যানার্জী বিবিসিকে বলছিলেন, "সিসিটিভির ফুটেজ আমি নিজে দেখেছি - কোথাও কোনও অশান্তির ছবি দেখা যায় নি। কেউ কোনও অভিযোগও জানায় নি। আমরা কীভাবে খুঁজে বার করব যে ওই তরুণ-তরুণী কে। তাদের সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করা গেলে, একটা ফোন নম্বর পেলেও সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে।"

আরও পড়ুন:

পুলিশের বিরুদ্ধে ইয়াবা ঢুকিয়ে হয়রানির বিরল মামলা

শব-ই-বরাতে হালুয়া-রুটির প্রচলন হয়েছিল কিভাবে?

পপ ভিডিও 'তোরি সুরত' নিয়ে ক্ষিপ্ত ভারতের সুফিরা