'আমি আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য দৌড়াচ্ছি, যাদের বহুদিন দেখতে পাই না'

অ্যাথলেট সালাহ আমেদান
Image caption অ্যাথলেট সালাহ আমেদান

সাহারা মরুভূমির গভীরে, আলজেরিয়া সীমান্তের কাছে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় সাহারা ম্যারাথনের। তবে এটি এখন শুধুমাত্র সাধারণ কোন একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি আসলে একটি প্রতিবাদ।

যারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, তারা মূলত সবাই নিজ ভূমি থেকে নির্বাসিত।

১৯৭৫ সালে পশ্চিম সাহারা মরুভূমির সাহারাউয়ি এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেয় মরক্কো। তখন থেকেই অসংখ্য সাহারাউয়ি মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।

প্রতি বছর আলজেরিয়ায় সাহারা মরুভূমিতে নিজেদের প্রতিবাদ আর মাতৃভূমির স্বাধীনতার দাবিতে একটি ম্যারাথন আয়োজন করেন তারা।

ওই ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন অ্যাথলেট সালাহ আমেদান। তিনি বলেন, ''আমি আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য দৌড়াচ্ছি, যাদের বহুদিন দেখতে পাই না।''

''আমার ছোট্ট পরিবারটি দখলকৃত এলাকায় রয়ে গেছে। কিন্তু আমার সেখানে যাওয়া নিষেধ। দেড় বছর আগে আমার বাবা মারা গেছেন। তখনো আমি সেখানে যাওয়ার অনুমতি পাইনি।''

Image caption এই মরুভূমিতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্বাধীনতার দাবিতে ম্যারাথন

যাকে তিনি দখলীকৃত এলাকা বলছেন, সেই এলাকা নিজেদের দক্ষিণ প্রদেশ বলে দাবি করে মরক্কো। প্রায় ৪০ বছর আগে ১৯৭৫ সালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেয় মরক্কো।

সালাহ আমেদান ওই এলাকাতেই বড় হয়েছেন। বারো বছর বয়স থেকে তিনি মরক্কোয় খেলাধুলা শুরু করেন।

মরক্কোর জাতীয় দলের হয়ে পুরস্কার আর আরব অ্যাথলেট পুরস্কার পেয়েছিলেন আমেদান।

কিন্তু ২০০০ সালে একটি প্রতিযোগিতার পুরস্কার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হলে, তিনি অবহেলার বিষয়টি উপলব্ধি করতে শুরু করেন।

এর চার বছর পর ফ্রান্সে একটি দৌড়ানোর প্রতিযোগিতায় তিনি মরক্কোয় নিষিদ্ধ সাহারাউয়ি পতাকা উড়ান। এরপর থেকেই থেকেই তাকে মরক্কোয় নিষিদ্ধ করা হয়।

আমেদান বলছেন, পতাকা ওড়ানোর সময় আমি অনেকটা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলাম। আর প্রথমবার অনেক দায়িত্বও অনুভব করি। আমি যদিও নিজেকে আর আমার পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলেছি, কিন্তু আমি মনে করি আমি দখলীকৃত ভূমির মানুষজনের পাশে দাড়াতে পেরেছি।

Image caption ম্যারাথনের পুরো পথ ধরে অ্যাথলেটদের পানি, খেজুর আর কমলা সরবরাহ করেন নারীরা

চার দশক আগের যুদ্ধের পর থেকেই অসংখ্য সাহারাউয়ি মানুষ প্রতিবেশী আলজেরিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে ছয়টি শরণার্থী শিবিরে এখন বাস করছে লাখ লাখ মানুষ। তারাই অংশ নিয়েছেন এই ম্যারাথনে।

অবশ্য মাতৃভূমির স্বাধীনতা নিয়ে এসব মানুষের স্বপ্ন এখন অনেকটা ফিকে হয়ে আসতে শুরু করেছে। কারণ ২৫ বছর আগে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতিসংঘ। কিন্তু এখনো সেই ভোটের দেখা মেলেনি।

আর তাই অনেক সাহারাউয়ি আবার অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার কথাও ভাবছেন।

যেমন সাহারাউয়ির একজন সামরিক নেতা আলী সালাম সিটি মোহাম্মেদ বলছেন, যা এক সময় জোর করে নিয়ে নেয়া হয়েছে, সেটি ফেরত নিতে হলেও শক্তি খাটিয়েই নিতে হবে।

Image caption স্বাধীনতার দাবিতে সাহারাউয়িদের ম্যারাথন

লায়ুম ক্যাম্পের গভর্নর মোহাম্মেদ বেসাত বলছেন, ''একপক্ষের মাধ্যমে শান্তি আসবে না। মরক্কোকে বাধ্য করতে হলে তাদের উপর কোন না কোনভাবে চাপ তৈরি করতে হবে। সেটা আমাদের সশস্ত্র বাহিনী থেকে হতে পারে অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমেও হতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে না।''

তিনি আরও বলেন, ''দরকার হলে আমরা আবার যুদ্ধে জড়াবো। কারণ আমরা সাহারাউয়ির সবাই একটি যোদ্ধা জাতি।''

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মরক্কো সরকারের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।

Image caption নিজেদের পতাকা তুলে ধরছেন সাহারাউয়ি নারীরা

ম্যারাথন শেষে সেখান আসা ভিকতোর সালাহ নামে একজন তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বিবিসি সংবাদদাতার।

সালাহ'র কাছে তিনি জানতে চান এতসব জটিলতার মধ্যে তিনি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশা রাখেন?

জবাবে সালাহ বলেন, ''আমি মনে করি, আমাদের নিজ ভূমিতে ফেরত যাওয়ার আগে সাময়িক একটি সময় আমরা পার করছি। একদিন আমরা সেখানে ফেরত যাবো বলেই আমি আশা করছি। আশা ছাড়া মানুষের জীবনের আর কি থাকে?''

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

'সাংবাদিকতায় একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে'

প্রতিবেশীদের তুলনায় বাংলাদেশের সামরিক ব্যয়ের চিত্র

গুরগাঁওতে নামাজ পড়ার সময় 'জয় শ্রীরাম' বলে হামলা