তাইওয়ান কি চীনের অংশ ? নাকি একটি স্বাধীন আলাদা দেশ?

চীন এবং তাইওয়ানের এই টানাপোড়েন বহু দশক ধরে চলছে ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption চীন এবং তাইওয়ানের এই টানাপোড়েন বহু দশক ধরে চলছে

বিতর্কটি অনেক পুরোনো। কিন্তু এটি আবার সামনে এসেছে এবং চীন-মার্কিন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।

তাইওয়ান, হংকং এবং ম্যাকাও- এগুলি কি চীনের অংশ, নাকি স্বতন্ত্র দেশ বা স্বশাসিত কোন অঞ্চল?

বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলি যেন অবশ্যই এই তিনটিকে অবশ্যই চীনের অংশ বলে বর্ণনা করে, সেজন্যে চীনের তরফ থেকে সব এয়ারলাইন্সের কাছে নির্দেশ পাঠানো হয়। যে ৩৬ টি এয়ারলাইন্সের কাছে এই নির্দেশ পাঠানো হয়েছে, তাতে আছে অনেক মার্কিন এয়ারলাইন্সও।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটির প্রতিবাদ জানিয়ে একে 'অরওয়েলিয়ান ননসেন্স' বলে বর্ণনা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, চীন যে 'রাজনৈতিক শুদ্ধতা' মার্কিন কোম্পানিগুলো এবং মার্কিন নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, সেটি তারা প্রতিহত করবে।

হংকং এবং ম্যাকাও চীনের অধীনেই। কিন্তু এই দুটি অঞ্চলের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে স্বশাসিত এলাকা হিসেবে।

হংকং ছিল ব্রিটিশ কলোনি। আর ম্যাকাও পর্তুগীজ কলোনি। কিন্তু দুটি দেশই নব্বুই এর দশকের শেষ ভাগে চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয় এই দুটি অঞ্চল।

কিন্তু তাইওয়ানের অবস্থা ভিন্ন।

তাইওয়ান কি চীনের অংশ ? নাকি চীন থেকে আলাদা?

এ নিয়ে সংশয় আছে অনেকের মধ্যে। এমনকি তাইওয়ানকে কি নামে ডাকা হবে তা নিয়েও।

Image caption চীন এবং তাইওয়ান

খুব সহজ ভাবে বললে, চীন মনে করে তাইওয়ান তাদের দেশেরই অংশ। এটি চীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি প্রদেশ। যেটি ভবিষ্যতে কোন একদিন চীনের সঙ্গে বিলুপ্ত হবে।

তাইওয়ান নিজেকে কিভাবে দেখে সেটার উত্তর অবশ্য এতটা সরল নয়। সেখানে কোন কোন দল এবং জনগণের একটি অংশ তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে চান। কেউ কেউ চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে।

আর জনগণের একটা বিরাট অংশ এখনো মনস্থির করে উঠতে পারেননি। তারা বরং তাইওয়ান এখন যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতেই থেকে যাওয়ার পক্ষে। অর্থাৎ চীনেরও অংশ নয়, আবার চীন থেকে আলাদাও নয়।

বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস

চীনের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন তাইওয়ান মূলত দক্ষিণ চীন সমূদ্রের একটি দ্বীপ।

এক সময় ওলন্দাজ কলোনি ছিল। তবে ১৬৮৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত চীনের রাজারাই শাসন করেছে তাইওয়ান। এরপর জাপানীরা দখল করেছে এই দ্বীপ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া হয় চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন চীনা সরকারের হাতে।

কিন্তু চীনে মাও জেদং এর নেতৃত্বে কমিউনিষ্ট বাহিনির সঙ্গে যুদ্ধে হারতে থাকে চিয়াং কাইশেকের সরকার। চীনের বেশিরভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ হারায় তারা।

এরপর চিয়াং কাইশেক আর তার কুওমিনটাং সরকারের লোকজন তখন পালিয়ে যায় তাইওয়ানে। সেখানে তারা 'রিপাবলিক অব চায়না' নামে এক সরকার গঠন করে। নিজেদেরকে সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলেও দাবি করে তারা।

কোন একদিন কমিউনিষ্টদের কাছ থেকে আবার পুরো চীনের নিয়ন্ত্রণ তারা নেবে, এমনটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা।

বহুদিন পর্যন্ত জাতিসংঘ থেকে বিশ্বের অনেক দেশ চিয়াং কাইশেকের সরকারকেই চীনের সত্যিকারের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আজ অনেকের কাছে শুনতে অবাক লাগতে পারে, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কিন্তু তাইওয়ানের সরকারই চীনের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

কিন্তু ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ বেইজিং এর সরকারকেই চীনের আসল সরকার বলে স্বীকৃতি দিল। তারপর থেকে একে একে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বেইজিং এর পক্ষ নিল, এবং তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমতে থাকলো।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption তাইওয়ানে চীন বিরোধী বিক্ষোভ

১৯৮০র দশক পর্যন্ত চীন আর তাইওয়ানের মধ্যে চলেছে তীব্র বাকযুদ্ধ। কিন্তু এরপর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। 'এক দেশ, দুই পদ্ধতি' নামে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যেখানে তাইওয়ান মূল চীনে বিলুপ্ত হবে, কিন্তু তাদের স্বায়ত্বশাসন দেয়া হবে। কিন্তু তাইওয়ান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য এর মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকেনি।

২০০০ সালে তাইওয়ানের নুতন প্রেসিডেন্ট হন চেন শুই বিয়ান। ২০০৪ সালে তিনি ঘোষণা দেন যে তাইওয়ান চীন থেকে আলাদা হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়।

তার এই অবস্থান চীনকে ভীষণ রুষ্ট করে। ২০০৫ সালে চীন তড়িঘড়ি করে এক আইন পাশ করে। যাতে বলা হয়, তাইওয়ান যদি চীন থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে, সেটা ঠেকাতে চীন প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে।

তাইওয়ানের অর্থনীতি এখন চীনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এখন আর স্বাধীনতাকে কোন বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে ভাবে না।

তাইওয়ানের বড় দুই দলের মধ্যে 'ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি' এখনো অবশ্য স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যদিকে কুওমিনটাং পার্টি (কেএমটি) চায় মূল চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ।

সম্পর্কিত বিষয়