ইথিওপিয়া ও এরিত্রিয়ার মধ্যে চলা যুদ্ধ কেন আফ্রিকার অসমাপ্ত যুদ্ধ?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ১৯৯৮ সালের ৬ই মে শুরু হয়েছিলো সেই যুদ্ধ।

দুই দশক আগে আফ্রিকার সবচাইতে দরিদ্র দুই দেশ ইথিওপিয়া ও এরিত্রিয়ার সীমান্তে শুরু হয়েছে ভয়াবহ এক যুদ্ধ।

মাত্র দু বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়।

২০০০ সালে দু দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও সীমান্তে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা রয়েই গেছে।

কিন্তু এক সময় দু পাশের মানুষজন বেশ আনন্দ নিয়ে মেলামেশা করতো।

এখন বন্ধ সীমান্ত খোলার অপেক্ষায় তারা। ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী শহর আদিগ্রাত।

আরো পড়ুন:

বিবিসি তদন্ত: নাইজেরিয়ায় কফ সিরাপ নেশার মহামারী

এইডস রোগ ঠেকাতে এক লাখ পুরুষের খতনা

বছর কুড়ি আগে শহরটি ছিল ইথিওপিয়ার সবচাইতে দ্রুত উন্নয়নশীল আর প্রাণবন্ত একটি শহর।

এরিত্রিয়ার গা ঘেঁষা এই শহরটিকে এখন একেবারে ভিন্ন একটি এলাকা মনে হয়। শহরের বাসিন্দা মালাকো ডেস্টাম।

তিনি বলছিলেন, "আমার মনে আছে বড় বড় বাসে করে অনেক মানুষ এরিত্রিয়ার আসমারা থেকে এখানে আসতো। এখানে হোটেল আর রেস্টুরেন্ট ব্যবসা দারুণ জমজমাট ছিল। তরুণ প্রজন্ম ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। ভালই রোজগার ছিল তাদের। আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার সেই শহরটি এখন মৃতপ্রায়"

১৯৯৮ সালের ৬ই মে শুরু হওয়া যুদ্ধই তার কারণ।

তেল নেই অথবা হিরের খনিও নেই এমন একটা শহর বাদমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয়েছিলো সেই যুদ্ধ।

কিন্তু যুদ্ধের আগে দিনকাল একেবারে অন্যরকম ছিল দুধারের মানুষের জন্য।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption রাস্তাটি রয়ে গেছে কিন্তু এর গন্তব্যে যাওয়া সীমান্ত বহু বছর ধরে বন্ধ।

মালাকো মৃতপ্রায় আদিগ্রাত শহরে তার ছোট মোবাইল যন্ত্রাংশের দোকানে বসে যে গান শুনছিলেন তা এরিত্রিয়ার এক শিল্পীর।

সীমান্তের এপারে ইথিওপিয়াতে এখনো এরিত্রিয়ার গান বেশ জনপ্রিয়।

তার মনে আছে কিভাবে এরিত্রিয়ার রুটি দিয়ে সকালের নাস্তা করতো তার পরিবার।

ছুটিতে তারা এরিত্রিয়া বেড়াতে যেতেন। সে এখন ইতিহাস।

শহরের অল্প বয়সী ছেলেরা এখন ভাল চাকরীর আশায় অন্যত্র চলে গেছে। মালাকো তবুও রয়ে গেছেন।

তিনি বলছিলেন, "আমি এখন বড় হয়েছি। নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি। আমার কাছের সবচাইতে বড় শহর এরিত্রিয়ার আসমারা। কিন্তু তবুও আমাকে মালপত্র আনতে আদ্দিস আবাবা পর্যন্ত যেতে হয়"

আদিগ্রাত থেকে আসমারা যাওয়ার একটিই রাস্তা। সেটি এখনো রয়ে গেছে।

রাস্তাটির দু পাশের মানুষজনের মধ্যে এক সময় বিয়ে হতো। আত্মীয়রা এপাশ থেকে ওপাশে দাওয়াতে যেতেন।

কিন্তু সেই রাস্তাটি ধরে আসমারা যাওয়ার সীমান্ত দু দশক ধরে বন্ধ রয়েছে।

৭০ বছর বয়সী আব্রাহাত বাহারাম সেই দিনগুলো স্মরণ করছিলেন।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের মধ্যস্থতায় দুদেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিলো।

তিনি বলছেন, "আমরা সকালের দিকে কফি খেতাম। তারপর আসমারা চলে যেতাম। সেখানে দুপুরের খাবার খেতাম তারপর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম। সে এক দারুণ সময় ছিল। আমাদের মধ্যে ভালবাসা আর ভ্রাতৃত্ব-বোধ ছিল"

আব্রাহাত এখানে একটা বড় হোটেলের মালিক ছিলেন।

বহু যায়গা থেকে সেখানে অতিথিরা আসতেন। এখন আর তারা আসেন না।

এখন সেখানে রয়েছে শুধু একটা সস্তা পানশালা।

এরিত্রিয়াতে আব্রাহাতের অনেক আত্মীয় রয়েছে। যাদের সাথে তার বহুদিন দেখা নেই।

এরিত্রিয়ান প্রতিবেশীদের সাথে জীবনের অর্ধেকের বেশিরভাগ সময় তার খুব শান্তিতে কেটেছে।

দু পাশের ভাষা ও সংস্কৃতিও একই। আদিগ্রাতের মানুষজন আসমারা সীমান্ত খুলে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

আদিগ্রাতের বাসিন্দা ইথিওপিয়ার জনপ্রিয় শিল্পী কাসাউন উল্ডোগিওরগিস তাদের একজন।

তিনি মনে করেন, "আমার চারপাশে এমন কেউ নেই যারা আশাবাদী নয়। এখানে যত মানুষ আছে তারা সবাই ইথিওপিয়া ও এরিত্রিয়ার মধ্যে শান্তি ও ভাল সম্পর্ক আশা করে। আমি হলফ করে বলছি দু দেশের মধ্যে শান্তি ফিরে আসবে"

ইথিওপিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদও এমন কথাই বলেছেন।

তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে শীঘ্রই দু দেশের সম্পর্ক শান্তির পথে মোড় নেবে।

ইথিওপিয়ার আদিগ্রাত আর এরিত্রিয়ার আসমারার মানুষজন অপেক্ষায় আছেন কবে সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখবেন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

১২ বছরে ৩০০ মৃত্যুদণ্ডের সাক্ষী যে নারী

ভ্লাদিমির পুতিন: গোয়েন্দা থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট

নির্বাচনী বছরে কেন ভারতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা

সম্পর্কিত বিষয়