বাংলাদেশের খুলনা সিটি নির্বাচন থেকে কী পেতে চায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি?

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
Image caption খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান।

খুলনা সিটি নির্বাচন: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভাগীয় শহর খুলনায় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।

কাগজে-কলমে এটি একটি স্থানীয় নির্বাচন হলেও এ নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল এমনকি সাধারণ মানুষেরও তুমুল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয়ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য আর নানামুখী তৎপরতায় স্থানীয় নির্বাচনের গণ্ডি পেরিয়ে এর একটা জাতীয় চেহারা এখন দৃশ্যমান।

এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে নির্বাচনী এলাকার বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। এমনকি রাজধানী ঢাকাতেও এসে লেগেছে নির্বাচনের উত্তাপ।

আরো পড়ুন:

খুলনায় দুই দলের জনপ্রিয়তা দেখানোর লড়াই

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুর্ভাবনায় ভারত?

কিন্তু এই নির্বাচন নিয়ে এতো আগ্রহ কেন?

আর রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত: প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'ই বা কী অর্জন করতে চায় এই নির্বাচন থেকে?

রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় কথা হচ্ছিলো জেবু্ন্নেসা নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারীর সঙ্গে।

জীবনের আর সব ব্যস্ততার মধ্যেই রাজনীতির খবরও রাখেন তিনি। বলছিলেন, খুলনা নির্বাচন নিয়েও তার আগ্রহ আছে। কিন্তু কেন?

এমন প্রশ্নে জেবুন্নেসা বলছিলেন, "জাতীয় নির্বাচন তো এখন একেবারেই সামনে। অথচ দেশে একটা অশান্তি বিরাজ করছে। কেউ বলে অমুক দল ভালো, কেউ বলে তমুক দল ভালো। এখন খুলনায় যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়, তাহলে ঢাকায় থেকেও আমরা বুঝতে পারবো কোন দলের দিকে মানুষের সমর্থন বেশি। এই জন্যই এই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ।''

প্রায় একই রকম বক্তব্য কাপড় ব্যবসায়ী মোতাহার হোসেনরও।

তিনি বলছিলেন, ''জনগণ কোন দিকে মোড় নিতে চায়, সরকারি দলের পক্ষে থাকবে নাকি বিরোধী দলের পক্ষে যাবে সেটার পরীক্ষা কিন্তু এই নির্বাচনে হয়ে যাবে। কারণ, খুলনা একটা বড় শহর। আমাদেরও নিজস্ব মতামত আছে। কিন্তু অন্যরা কী ভাবছে সেটাও তো জানা দরকার। ''

বোঝা যাচ্ছে, দেশে এখন কোন দলের জনপ্রিয়তা বেশি সাদাচোখে সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তার একটা ধারণা পেতে চাইছেন সাধারণ মানুষ।

কিন্তু এই নির্বাচন থেকে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ঠিক কী অর্জন করতে চাইছে?

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption বিএনপি বলছে, খুলনা সিটি নির্বাচন গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের অংশ।

এ নির্বাচন এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন রাজনীতির মাঠে অনেকটাই কোণঠাসা সরকার বিরোধী দল বিএনপি।

দলটির শীর্ষ দুই নেতার একজন কারাগারে অন্যজন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে অবস্থান করছেন দেশের বাইরে।

এ সময় খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে জোরালো কোন আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারেনি দলটি।

এমন অবস্থায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপিকে কী সুবিধা এনে দেবে খুলনার সিটি নির্বাচন?

এমন প্রশ্নে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, "আমরা এখন গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে আছি। জনগণের মালিকানা কেড়ে নিয়ে ক্ষমতা দখলের যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এখানে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণকে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই। সেজন্যই দলের চেয়ারপার্সন কারাগারে থাকা সত্ত্বেও আমরা খুলনার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।''

বিএনপির কাছে এই নির্বাচন যখন তাদের ভাষায় গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ের অংশ আওয়ামী লীগ তখন একে দেখছে, উন্নয়ন ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে।

যদিও এই নির্বাচনের জয়-পরাজয় চূড়ান্তভাবে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয় বলেও মনে করেন দলটির অনেক নেতা।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগনের কাছে সরকারের উন্নয়নের বার্তা পৌছে দিতে চান তারা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলছিলেন, ''সম্প্রতি আমরা কুমিল্লা ও রংপুর সিটি নির্বাচনে হেরেছিলাম। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আমরা জনসমর্থন হারিয়ে ফেলেছি। আমরা খুলনা সিটি নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরত্বই দিচ্ছি। এই নির্বাচনটা আমাদের কাছেও একটা আন্দোলন।''

''গত ৯ বছরে দেশে যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, আমরা তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। জাতীয় নির্বাচনেও যেন ভোটারদের উপর এর একটা প্রভাব থাকে আমরা সে চেষ্টাই করছি।''

দুই দলের নেতাদের কথায় বোঝা যাচ্ছে, স্থানীয় এই নির্বাচনের মাধ্যমে মূলত: জাতীয় নির্বাচনের হিসেব-নিকেশেই করে নিচ্ছে প্রধান দুই দল।

এক্ষেত্রে একদল সামনে নিয়ে এসেছে উন্নয়নের শ্লোগান, অন্যদল প্রচার করছে তাদের ভাষায় গণতন্ত্রের সংকটের কথা।

Image caption খুলনা সিটি নির্বাচনে ভোটারদের লাইন।

কিন্তু যেভাবে দুই বিপরীতমুখী বক্তব্য নিয়ে তারা প্রচারণায় এসেছে তার যৌক্তিকতা কতটা?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসিম আখতার হোসাইন মনে করেন, জনগণ উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিভাজন চায় না।

''দেখা যাচ্ছে, একটি দল উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অপর দল গণতন্ত্রকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু আসলে দেশের মানুষের জন্য উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের মধ্যে তো কোন বিরোধ নেই। দুটিই সমানভাবে জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।''

''জনগণ গণতন্ত্রের মাধ্যমই উন্নয়নের পথে যেতে চান। যেহেতু এটা এখন একটা পাবলিক ডিসকোর্সের অংশ হয়ে গেছে, তাই ভোটাররা কোন শ্লোগানকে গ্রহণ করে, কী সিদ্ধান্ত দেয় এই নির্বাচনে তার একটা প্রতিফলন দেখা যাবে।''

এদিকে খুলনা সিটি নির্বাচনের পরই জুনের শেষে অনুষ্ঠিত হবে গাজীপুর সিটি নির্বাচন। এরপর রাজশাহী, সিলেট, বরিশালসহ আরো কয়েকটি সিটি নির্বাচন হওয়ার কথা।

ড. নাসিম আখতার হোসাইন মনে করছেন, এসব নির্বাচন জনপ্রিয়তা প্রমাণে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটা বড় পরীক্ষা। তবে একইসঙ্গে এটি নির্বাচনের কমিশনের যোগ্যতারও বড় পরীক্ষা নেবে।

নির্বাচনগুলো কেমন হবে, রাজনৈতিক দলগুলো কেমন আচরণ করবে, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন হবে তার উপরই নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নতুন কোন সংকট সৃষ্টি হবে নাকি সমাধান আসবে সে বিষয়টি।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বাংলাদেশে কি পাল্টে যাচ্ছে পরিবারের ধরণ?

শিশুদের কি রোজা রাখতে দেয়া উচিত?

একমাস রোজা রাখলে যা ঘটে আপনার শরীরে