বাংলাদেশে পাস্তুরিত দুধে যেভাবে জীবাণু ঢুকছে

বাংলাদেশে আইসিডিডিআরবি-তে চিকিৎসারত এক শিশু ছবির কপিরাইট AFP
Image caption বাংলাদেশে এক গবেষণা বলছে পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশ জীবাণু সংক্রমিত

বাংলাদেশে ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানীরা তাদের এক গবেষণার ফলাফলে বলছেন বাণিজ্যিভাবে প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশের বেশি জীবাণু-সংক্রমিত এবং তা সরাসরি পান করার জন্য অনিরাপদ।

তারা দেখেছেন খামারে গাভী দোয়ানোর পর্যায় থেকে শুরু করে বিক্রির দোকান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দুধ মাইক্রোব বা অণুজীবাণু দ্বারা দূষিত, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের ১৮টি উপজেলা ও ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা প্রায় পাঁচশ পাস্তুরিত দুধের নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন তাতে ই-কোলাইসহ স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ মলবাহিত নানা ব্যাকটেরিয়া রয়েছে।

দুধ পাস্তুরিত করার প্রক্রিয়া কী?

দুধকে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সুনির্দিষ্ট সময় ধরে উষ্ণ করার পর তা দ্রুত ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় পাস্তুরায়ন।

সাধারণত দুধ গরম করা হয় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপাঙ্কে - তবে ৭০ ডিগ্রি তাপাঙ্কের উপরে। ৩০ সেকেণ্ডের কম দুধকে এই তাপমাত্রায় রাখার পর তা দ্রুত ঠাণ্ডা করে ফেলা হয় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পাস্তুরিত দুধকে সবসময় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা।

ফরাসী বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮৮০র দশকে তরল খাদ্যকে জীবাণুমুক্ত করার এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

কাঁচা দুধে খুব দ্রুত জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। দুধ একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উপরে পৌঁছলে নানাধরনের অণুজীবাণু তাতে দ্রুত বিস্তারলাভ করে।

পাস্তুরায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অণুজীবাণুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

বাংলাদেশি হিন্দুদের নিয়ে আপত্তি আসামে

বাংলাদেশে রোজা পালনকারীর জন্য জরুরী ১১টি পরামর্শ

জাপানে ২৫ সেকেণ্ড আগে ট্রেন ছাড়ায় শোরগোল

বাংলাদেশে সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে বাংলাদেশে অস্বাস্থ্যকর, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন একটা বড় সমস্যা।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক বলছেন গাভী দোয়ানোর সময় থেকে শুরু করে প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধ খদ্দেরদের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি ধাপে সংক্রমণ ঘটছে।

তিনি বলছেন বিষয়টিতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন এবং দুধ দোয়ানো থেকে শুরু করে দুধ কালেকশান কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া- সেন্টারে প্যাকটজাত করা - বাজারে নেয়া - অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত গোটা সরবরাহ চেইন তারা পরীক্ষা করে দেখছেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption গবেষণার ফলাফলে বলা হচ্ছে গাভী দোয়ানোর সময় থেকেই সংক্রমণ শুরু হচ্ছে

কীভাবে সংক্রমণ হচ্ছে?

আইসিডিডিআর,বি-র গবেষকরা তাদের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন দুধের খামার, আড়ত, হিমাগার, দুধ বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে।

সেসব নমুনায় খামারীদের কাছ থেকে নেয়া ৭২ ভাগ দুধই ছিল ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত।

আর শীতলীকরণ কারখানা বা হিমাগার ও আড়ত থেকে নেওয়া শতভাগ দুধেই কোন না কোনভাবে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়েছে।

এছাড়া গবেষণায় ব্যবহার করা পাস্তুরিত দুধের নমুনার মধ্যে ৩৭ ভাগ দুধ পাওয়া যায় ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত।

আইসিডিডিআর,বি-র সহযোগী বিজ্ঞানী ও ফুড মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির প্রধান এবং এই গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম তাদের প্রতিবেদনে বলেছেন, তাদের গবেষণাগুলোয় তারা দেখেছেন দুধের প্রাথমিক উৎপদানকারী পর্যায়ে এর দূষণের সাথে গরুর প্রজনন প্রক্রিয়া, গরুর দ্বারা উৎপাদিত দুধের পরিমাণ, দুধ দোয়ানোর সময়, এবং যিনি দুধ দোয়ান তার হাত ধোয়ার অভ্যাসের মতো বিভিন্ন বিষয় জড়িত।

তিনি বলছেন স্বাস্থ্যকরভাবে দুধ দোয়ানো, সংগ্রহ ও সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং পাস্তুরিত করার বিষয়ে যত্নবান হওয়া দরকার।

পানের জন্য দুধকে নিরাপদ রাখতে দুধ উৎপাদনের স্থান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পাস্তুরিত দুধকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শীতল রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।

আইসিডিডিআর,বি পরামর্শ দিয়েছে বাজারের পাস্তুরিত কাঁচা দুধে উচ্চমাত্রায় রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতির কারণে এসব দুধ খুব ভালোভাবে না ফুটিয়ে খাওয়া উচিত নয়।