যৌন হয়রানি ঠেকাতে নারীদেরকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাবে কলকাতার পুলিশ

কলকাতার পুলিশ বলছে, তারা এখন নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখাবে। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption কলকাতার পুলিশ বলছে, তারা এখন নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখাবে।

ভারতের কলকাতা শহরে যেসব নারী গণ-পরিবহনে যাতায়াত করেন, তাদের কাছে যৌন হেনস্থা প্রায় নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। শুধু যে ভিড়ে ঠাসা গণ-পরিবহনে এটা হয়, তা নয়। ট্যাক্সি বা অ্যাপ-ক্যাব থেকে শুরু করে অটোরিকশাতেও নারীদের যৌন হেনস্থার ঘটনা সামনে আসছে নিয়মিত।

আগে নারীরা চুপচাপ মেনে নিলেও আজকাল বাড়ছে প্রতিবাদ। এখন কলকাতার পুলিশ বলছে, এধরনের পরিস্থিতিতে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন একজন নারী, সেই পাঠ দেবেন তারা।

বাসে-ট্রামে বা ট্রেনে কোন না কোনভাবে যৌন হেনস্থার শিকার হন নি, এমন নারী অন্য অনেক শহরের মতো কলকাতাতেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত গণ পরিবহন- তিনচাকার অটোরিকশাতেও নারী যাত্রীরা মাঝে মাঝেই হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।

তাদেরকে হেনস্থা যেমন হতে হয় সহযাত্রী পুরুষদের দ্বারা, তেমনি চালকদের বিরুদ্ধেও নারী যাত্রীদের যৌন হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকদিন আগে এক সহযাত্রীর দ্বারা অটোরিকশায় হেনস্থার শিকার হয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী স্নেহা নন্দী।

বান্ধবীর সঙ্গে ডিনার সেরে বাড়ি ফেরার সময়ে যখন যাদবপুর থানার ঠিক সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, এক ব্যক্তি তাদের সিগারেট খাওয়া নিয়ে কটাক্ষের মধ্যে দিয়ে হেনস্থার শুরু। পরে সেই হেনস্থাকারী জোর করে উঠে পরেছিলেন একই অটোরিকশায়।

সেদিনের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মিস নন্দী বিবিসিকে বলেন, "ওই লোকটিকে কয়েকবার বারণ করেছিলাম অসভ্যতা করতে। সে শোনে নি। উল্টে আমরা যে অটোতে উঠলাম, একরকম জোর করেই সে-ও উঠে পড়লো। খুব খারাপভাবে গায়ে হাত দিচ্ছিল। একটা সময়ে চালক তাকে সামনে নিজের পাশে নিয়ে যান। সেখান থেকেও সে সমানে কটু কথা বলে চলেছিল।"

আরো পড়তে পারেন:

নারীরা শহরে কতটা নিরাপদ বোধ করেন?

বিবিসি বাংলার সংবাদদাতার চোখে খুলনা নির্বাচন

'৩৫ মিনিটেই বিল পাস হয় বাংলাদেশের সংসদে'

বাংলাদেশে রোজা পালনকারীর জন্য জরুরী ১১টি পরামর্শ

বাংলাদেশে পাস্তুরিত দুধে যেভাবে জীবাণু ঢুকছে

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption কলকাতা শহরে সম্প্রতি এরকম কয়েকটি যৌন হয়রানির ঘটনার পর এনিয়ে নারীরা সরব হয়েছেন।

"যখন সে বলে যে আমাদের মতো বেশ্যা মেয়েদের সঙ্গে নাকি এরকম ব্যবহারই করা উচিত, তখন আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। পুলিশের একটা জীপ দেখে আমরা চেঁচামেচি করি। তখন অটো-চালক ওই লোকটিকে নামিয়ে দেয়। আমরাও নামি," বলেন তিনি।

তিনি জানান, রাতের বেলায় দুটি মেয়েকে রাস্তায় চেঁচামেচি করতে দেখেও প্রথমে কেউ এগিয়ে আসে নি। এমনকি পুলিশও নয়। অনেকক্ষণ পরে পুলিশ ওই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায় থানায়।

দিন কয়েক আগেই চলন্ত বাসে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুন করার ঘটনা মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী করে এক ছাত্রী। সেই ভিডিও দেখে এক মধ্য বয়সী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

গত রবিবার দক্ষিণ কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গড়িয়াহাট থেকে রাত সাড়ে দশটার দিকে অটোয় উঠে তিন সহযাত্রীর দ্বারা শারীরিকভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছে এক নারীকে।

এক পর্যায়ে তিনি চলন্ত অটো থেকে লাফ দিয়ে নেমে তারপরে থানায় অভিযোগও জানিয়েছেন। এখনও সেই অটোটিকে চিহ্নিত করা যায় নি, ধরা যায় নি হেনস্থাকারীদেরও ।

ওই অঞ্চলের অটোরিকশাগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় যে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত শ্রমিক ইউনিয়ন দ্বারা, তার সাধারণ সম্পাদক দেবরাজ ঘোষ বলছিলেন, "যৌন হেনস্থা তো কেউই মেনে নেবেন না, আমরাও খুব কড়া এ ব্যাপারে। তবে এটাও ঘটনা যে এই কলকাতা শহরেই নারীরা কিন্তু সামনের সীটে চালকের পাশে বসেই যাতায়াত করেন। ট্যাক্সিতে কিন্তু সেটা কখনও করতে দেখবেন না। তারা নিরাপদ মনে করেন বলেই তো চালকের পাশে বসেন। ঠিকই মাঝে মাঝে অভিযোগ ওঠে। সেগুলো বিক্ষিপ্ত ঘটনা। কার মনে যে কী আছে, সেটা তো আগে থেকে জানা যায় না। তবে অভিযোগ পেলেই আমরা তাদের শাস্তি দিই চালকদের।"

এবার আর পুলিশ বা অটো ইউনিয়নের শাস্তি দেওয়ার ওপরে যাতে নির্ভর না করতে হয়, ঘটনাস্থলে নিজেরাই যাতে আত্মরক্ষা করতে পারেন নারীরা, সেটাই শেখানো হবে শনিবার থেকে।

যৌন হেনস্থার হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল হিসাবে মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ আজকাল অনেক স্কুল কলেজেই দেওয়া হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption শুধু বাসে ট্রেনে নয়, অটোরিকশা কিম্বা ট্যাক্সিতেও যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের এধরণের প্রচেষ্টা কতটা সুফল দেবে? নারী আন্দোলনের নেত্রী শ্বাশতী ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কলকাতা পুলিশের এই উদ্যোগকে নিশ্চয়ই স্বাগত জানাব। তবে একই সঙ্গে এটাও বলব যে নারীরা সেটা বাস্তবে কতটা ব্যবহার করতে পারবে, সেই মানসিক জোরটাও তৈরি করা দরকার। হেনস্থা তো তাদেরই করা হয়, যে নারী আত্মরক্ষা করতে পারবে না বলে হামলাকারী মনে করে! নারীরাও যদি এবার পাল্টা আঘাত করতে পারে, তাহলে হয়তো হেনস্থার ঘটনা কমবে।"

"পুলিশের আরও একটা বিষয়ের ওপরে নজর দেওয়া দরকার - যৌন হয়রানি বা হেনস্থার ঘটনা নিয়ে থানায় গেলে সেগুলো যেন গুরুত্বসহকারে দেখা হয়," বলেন তিনি।

তবে নিজেই যৌন হয়রানির শিকার হওয়া ছাত্রী স্নেহা নন্দী বলছিলেন, আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর আগে প্রয়োজন লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্য সচেতনতা তৈরি করা। সেটা যেমন প্রয়োজন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, তেমনই প্রয়োজন পুলিশের মধ্যেও, বলেন তিনি।