মৃত্যুর পরিসংখ্যান: জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কী হয়

ইংল্যান্ডের একটি খ্রিষ্টান কবরস্থান। চার্চ অব ইংল্যান্ডের অধিনস্থ কবরস্থানগুলোর অর্ধেকগুলোতেই এখন নতুন কবর দেওয়ার জায়গা নেই। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ইংল্যান্ডের একটি খ্রিষ্টান কবরস্থান। চার্চ অব ইংল্যান্ডের অধিনস্থ কবরস্থানগুলোর অর্ধেকগুলোতেই এখন নতুন কবর দেওয়ার জায়গা নেই।

মানুষের গড় আয়ু ক্রমাগত বাড়ছে, বেশিদিন বেঁচে থাকছে তারা, কিন্তু তাতে মৃত্যু শুধুই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

একইসাথে, মানুষের আয়ু যত বাড়ছে শেষ বয়সে অনেকটা দিন তাদের অসুস্থ জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এজন্য, কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান এখন বয়স্ক মানুষদের মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করছে - শেষ জীবনে তাদের কী ইচ্ছা, কোথায় তারা মৃত্যুবরণ করতে চায়, মৃত্যুর পর তাদের শবদেহ সৎকার নিয়ে তাদের কী ইচ্ছা ইত্যাদি বিষয়।

'এন্ড অব দি লাইফ কেয়ার চ্যারিটি' নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান বলছে, "মৃত্যু নিয়ে খোলাখুলি কথা বললে মানুষ যেভাবে মৃত্যুবরণ করতে চায় সেই ইচ্ছা পূরণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।"

"স্বজনদের জন্যও এটা বড় ধরণের এক আত্মতৃপ্তি। তাদের প্রিয়জনের ইচ্ছামত সব হয়েছে, এটা ভেবে তারা স্বস্তি বোধ করে।"

কোথায় হবে মৃত্যু?

একের পর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিংহভাগ মানুষ নিজের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে মানুষের মৃত্যুবরণের সম্ভাব্য জায়গা এখন হাসপাতাল।

গত বছর ইংল্যান্ডে যত মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই হয়েছে হাসপাতালে। ২৫ শতাংশেরও কম মৃত্যু হয়েছে বাড়িতে। আর বাকিটা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।

শবদেহের কী হয়?

কোথায় মৃত্যু হবে শুধু সেই ইচ্ছা ছাড়াও মৃত্যুর পর তার শবদেহের সৎকার কীভাবে হবে - ব্রিটেনে বহু মানুষ এখন তাও আগে থেকে বলে যান।

১৯৬০ এর দশকে এসেই ব্রিটেনে কবর দেওয়ার চেয়ে দাহ বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দাহ প্রথার জনপ্রিয়তা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

সেই থেকে এদেশে ৭৫ শতাংশ মৃতদেহ দাহ করা হয়। ২০১৭ সালে এসে দাহ করার পরিমাণ আরো বেড়ে গেছে - ৭৭ শতাংশ।

যদিও দাহ'কে সবচেয়ে পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়, এই প্রথারও খরচ রয়েছে। জ্বালানি প্রয়োজন হয়, এবং পোড়ানোর ফলে পরিবেশে কার্বন-ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ হয়।

ছবির কপিরাইট LEON NEAL
Image caption লন্ডনের একটি ক্রিমেটোরিয়াম। ব্রিটেনে ৭৫ শতাংশ মৃতদেহের সৎকার হয় দাহ করে। (ফাইল ছবি)

গ্রিন কবরস্থান

ব্রিটেনে এখন শত শত "গ্রিন" অর্থাৎ প্রাকৃতিক কবরস্থান রয়েছে যেখানে কফিন বা শবাধার তৈরি হতে হবে এমন সামগ্রী দিয়ে যা একসময় মাটির সাথে মিশে যাবে। এছাড়া কবরের ওপর ইট বা পাথরের কোন স্মৃতিফলক বসানো যাবেনা। বদলে, চাইলে স্বজনদের কবরের ওপর একটি গাছ পোঁতার অনুমতি দেওয়া হয়।

এসব প্রাকৃতিক কবরস্থানগুলোর সমিতি বলছে, "বর্তমানে বহু মানুষ জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি পরিবেশের ওপর তার মৃত্যুর প্রভাব নিয়েও চিন্তাভাবনা করছে।"

এসব প্রাকৃতিক কবরস্থানে, কবর বেশি গভীর করা হয়না। ফলে, মরদেহ দ্রুত পচে মাটির সাথে মিশে যায় এবং এই কবর থেকে অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে মিথেন বা গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরিত হয়।

'পানি-দাহ' সৎকার

এখন পরিবেশ সচেতন কিছু মানুষ সৎকারের নতুন এক বিকল্পও গ্রহণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যানাডা'র কিছু এলাকায় এই পরিবেশ-বান্ধব তথাকথিত 'পানি-দাহ' প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।

পটাসিয়াম হাইড্রোক্সাইড দিয়ে একটি ক্ষারের দ্রবণ তৈরি করে শবদেহ তার ভেতরে রাখা হয়। মাংস গলে শুধু কঙ্কাল থেকে যায়। সেই কঙ্কাল শুকিয়ে গুড়ো করে, চাইলে তা স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ব্রিটেনেও এমন এক পানি-দাহ কর্মসূচি চালুর অনুমোদন দিলেও তা পরে স্থগিত করা হয়। কারণ, পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শবদেহ থেকে নিঃসরিত তরল পদার্থ পানি-সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে মিশে যেতে পারে।

যারা দাহ করার ইচ্ছা পোষণ করে যান, তারা বা তাদের স্বজনরা শবদেহের ছাই কী হবে সেই ইচ্ছাও জানাতে পারেন - ছাই দিয়ে ভাইনাইল রেকর্ড তৈরি করে ঘরে রাখা, কাঁচের পেপার ওয়েটের ভেতর ছাই ভরে রাখা অথবা আতস বাজিতে ভরে তা আকাশে ছড়িয়ে দেওয়া।

মৃত্যুর খরচ

ব্রিটেনে প্রথাসিদ্ধ কবর দেওয়ার চেয়ে দাহ বা পোড়ানোর খরচ কম। জায়গা যত কমছে, কবরের খরচ তত বেড়ে যাচ্ছে।

আসলে যে পন্থাতেই সৎকার হোক, খরচ দিন দিন বাড়ছে।

সৎকারের বীমা বিক্রি করে এমন একটি বীমা প্রতিষ্ঠান -সানলাইফ- বলছে গত ১০ বছরে মৃতদেহ সৎকারের খরচ ৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

প্রধান কারণ, কবরের জায়গার দাম বাড়ছে। তাছাড়া, মরদেহ সৎকারে সরকারের পক্ষ থেকে যে ভর্তুকি দেওয়া হতো, তাও কমিয়ে দেওযা হচ্ছে।

ব্রিটেনে ৪৫টি জেলায় (কাউন্টি)তে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারগুলোর অধীনস্থ কবরখানাগুলোতে আর জায়গা থাকবে না।

এছাড়া, গির্জা পরিচালিত কবরস্থানগুলোর অর্ধেকগুলোতেই নতুন কবর দিতে দেওয়া হচ্ছেনা।

ছবির কপিরাইট Christopher Furlong
Image caption ইংল্যান্ডের হাডার্সফিল্ড শহরে একটি মুসলিম কবরস্থানে দাফন (ফাইল ছবি)

মুসলিম কবরখানাগুলোর চিত্র

লন্ডনের উত্তর-পূর্বের একটি এলাকায় 'গার্ডেন অব পিস' নামে একটি মুসলিম কবরখানার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর বলছেন- মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে, এবং মুসলিমরা দাহ করেনা

ইহুদিরাও দাহ করেনা।

ইহুদিদের সৎকার সংক্রান্ত সামাজিক একটি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র ডেভিড লিবলিং বলছেন, বিভিন্ন জায়গায় ইহুদি কবরখানার জায়গা বাড়াতে নতুন জমি কেনা হচ্ছে।

মৃত্যুর পর ডিজিটাল প্রোফাইলের কী হবে?

মৃত্যুর পর মৃতের সোশ্যাল মিডিয়াতে তার প্রোফাইলের কী হবে - তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

ব্রিটেনে ডিজিটাল লেগাসি এ্যাসোসিয়েশন (ডিএলএ) নামে একটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল উইল তৈরির একটি গাইডলাইন তৈরির বিষয়ে আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করছে, যাতে মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল বা 'ডিজিটাল সম্পদে'র (যেমন-মিউজিক লাইব্রেরি) কী হবে তা নিয়ে কেউ উইল করতে পারেন।

ডিএলএ'র এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ মানুষ চায় প্রিয়জনের মৃত্যুর পর তারা যেন তার সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোফাইলে ঢুকতে পারে।

তবে সমীক্ষায় অংশ নেওয়া একজনও বলেনি যে তারা মৃত্যুর পর অন্য কাউকে তার ফেসবুক বা গুগলের ডিজিটাল প্রোফাইলে ঢোকার অধিকার দিয়ে যেতে চায়।

ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট-ধারী কারো মৃত্যু হলে , স্বজনরা মৃতের পেজটিকে একটি মেমোরিয়াল পেজ হিসাবে রেখে দেওয়ার অনুরোধ করতে পারেন। অন্যদিকে, টুইটার মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাকটিভেট বা বন্ধ করার ব্যাপারে স্বজনদের অনুরোধ রক্ষা করে।