এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

আবু সাইয়ীদ: চলচ্চিত্র নির্মাতা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা আবু সাইয়ীদ। তার প্রথম ছবি আলাউদ্দিন আল-আজাদের গল্প অবলম্বনে একটি শর্ট ফিল্ম 'আবর্তন'।

তার পর গত আড়াই দশকে তিনি একাধিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং বহু টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন।

আবু সাইয়ীদের জন্ম বগুড়ায়। স্কুল জীবন থেকেই তিনি সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হন, তখনকার সিনেমা পত্রিকা 'চিত্রালী' বা 'পূর্বাণী' এগুলো পড়তেন তিনি, মনে করতেন এক সময় চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত হবেন - তবে পরিচালক হবেন এটা ভাবেন নি।

তবে কলেজে উচ্চ-মাধ্যমিক পড়ার সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একটি শর্টফিল্ম করবেন, বন্ধুবান্ধবদের কাছে সে কথা ঘোষণাও করে দেন।

"সেটা ১৯৮৭ সালের কথা। এ নিয়ে হাসাহাসিও হয়েছে। আমি একটা ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র, ফিল্ম সম্পর্কে কোন পড়াশোনা নেই, কোনদিন কোন শুটিংও দেখিনি, কিছুই না - তারপরও এমন একটা কথা বলা - কিন্তু আমি মনে মনে পরিকল্পনা করতে লাগলাম।"

"তখনকার দিনে ভিএইচএস ক্যাসেট এসেছে, ভিসিপিতে দেখা যেতো। আমাদের বাড়িতে দেখার ব্যবস্থা ছিল না, অন্যদের বাড়িতে গিয়ে পছন্দের ছবিগুলো দেখতাম, সত্যজিৎ রায়ের বা মৃণাল সেনের ছবি - এসব দেখতাম। ঋত্বিক ঘটকের ছবি তখন দেখা হয় নি।

"আর কিছু চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রপত্রিকা পড়তাম চলচ্চিত্রপত্র, ধ্রুপদী ঢাকা থেকে বেরুতো - আর ছিল কোলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা। ধীরেশ ঘোষের একটা বই ছিল 'চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিচালনা' - তিনি একসময় পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ছিলেন। এই বইটা আমার খুব কাজে দেয়। একটা ছবির চিত্রনাট্য থেকে শেষ পর্যন্ত - শট ডিভিশন, সম্পাদনা , সাউন্ড মিক্সিং কাকে বলে, কিভাবে হয় - সবকিছুই বইটিতে ছিল। তা ছাড়া ছিল বিভিন্ন নির্মাতার কাজের বিশ্লেষণ। এইভাবে ছবি দেখে এবং বই পড়েই আমার সিনেমা সম্পর্কে ধারণাটা তৈরি হয়। "

"তা ছাড়া আমি নিজে নিজেই বিভিন্ন গল্প বা কবিতা থেকে চিত্রনাট্য তৈরি করতাম, কিভাবে তার চিত্রায়ন হতে পারে, 'কিনু গোয়ালার গলি' কোন দৃশ্য দিয়ে শুরু হতে পারে, একটা গলি, নাকি একটা টিকটিকি - এসব চিন্তা আমার মধ্যে কাজ করতো।"

"আমি স্টিল ফটোগ্রাফিও করতাম, থার্টি ফাইভ বা ওয়ান টুয়েন্টি মিলিমিটার ক্যামেরায় - সেটা কিন্তু ফটোগ্রাফার হবার জন্যে না। ফিল্ম করতে হলে ফটোগ্রাফি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ এজন্যই আমি এটা করতাম। তখনকার দিনে এটা একটা ব্যয়বহুল ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমার পরিবার থেকে সাহায্য-সহযোগিতা আমি পেয়েছি। "

"এর পর আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আলাউদ্দিন আল-আজাদের গল্প 'ছাতা' নিয়ে আমি আমার প্রথম শর্ট ফিল্ম করবো। এক্ষেত্রেও আমি আমার পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছি। আমি যাই করতাম, বাবা সেটাতে উৎসাহ দিতেন। মা-র কিছুটা আপত্তি থাকলেও বাধা কখনো দেন নি। ছবির জন্য লাখখানেক টাকার মধ্যে আমার বোনের বান্ধবীর বড় ভাই রাকিব রাশেদীন - তার বাবা ৩৫ হাজার টাকা দেন, আর পারিবারিকভাবে ৬৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করি। এই ছবির কাজের জন্য ঢাকায় আসার পর আমি আলমগীর কবির এবং অন্যান্যদের যে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি তা আমার জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। "

প্রথম দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি 'আবর্তন' এবং 'ধূসর যাত্রা' মুক্তি পাবার পর আবু সাইয়ীদ টিভির জন্য একাধিক টেলিনাটক নির্মাণ করেন।

"টিভির জন্য কাজ করার সময় তেমন অসুবিধা হয় নি। বরং পরিচালক হিসেবে আমি যা আয় করতাম তা আমার জীবিকানির্বাহ ছাড়াও আমার চলচ্চিত্র করার কাজেও সহায়ক হয়েছে।"

আবু সাইয়ীদ তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি 'কিত্তনখোলা' নির্মাণ করেন ২০০০ সালে। এর পর থেকে এ পর্যন্ত আটটি পূর্ণদৈর্ঘ ছবি নির্মাণ করেছেন তিনি।

তিনি স্বীকার করেন যে বাংলাদেশে একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে যে সব সমস্যা তাকে প্রথম দিকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, তা এখনো কেটে যায় নি। এখনো এরকম চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং তা দেখানোর উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠে নি।

"সিনেপ্লেক্স নামের উদ্যোগটা ভালো, কিন্তু তা যদি বাংলাদেশের সব শহরে গড়ে উঠতো তাহলে তা স্বাধীন নির্মাতাদের ছবি দেখানোর অনেক সুবিধে হতো।"

চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজের দেশ-সমাজ-সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আবু সাইয়ীদ সচেতন।

"কোনটা উচিৎ কোনটা অনুচিত তা নিয়ে নিজের মধ্যে আমার একটা সেল্ফ-সেন্সরশিপ কাজ করে। আর সিনেমার কাছে বা দেশ-সমাজের কাছে দায়বদ্ধতা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিছক বাণিজ্যিক কারণে বা জনপ্রিয়তার কারণে আমি কোন কিছু করতে চাই না" - বলেন আবু সাইয়ীদ।

আবু সাইয়ীদের সাম্প্রতিকতম ছবি "একজন কবির মৃত্যু" সম্প্রতি কোলকাতায় চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

'সংযোগ' নামে আরেকটি ছবির কাজ তিনি শুরু করেছেন 'ক্রাউড ফান্ডিং' - এর মাধ্যমে।