কার্ল মার্ক্সই কি প্রথম রোবটের উত্থানের কথা বলেছিলেন?

ক্রমশই বাড়ছে অটোমেশন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ক্রমশই বাড়ছে অটোমেশন

চুল কাটার জন্যে ব্রিটেনের একটি সেলুনে বুকিং চলছে। কাস্টমারের পক্ষ হয়ে সেলুনে ফোন করেছে একটি রোবট।

সেলুনে যে ফোন রিসিভ করছে সেটিও একটি রোবট। দুটো রোবটের মধ্যে কথা হচ্ছে। তারা ঠিক করে নিচ্ছে কোনদিন কখন লোকটি চুল কাটাতে আসবেন।

এই যন্ত্রটির নাম গুগল ডুপ্লেক্স। ঠিক মানুষের মতো করেই কথা চালিয়ে যেতে পারে যন্ত্রটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন পৌঁছেছে এই পর্যায়ে।

সেলুনে ক'দিন আগেও এই বুকিং নেওয়ার কাজটি করতো একজন অফিস সহকারী। কিন্তু ওই সেলুনে তার চাকরি চলে গেছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে।

কমিউনিস্ট দার্শনিক কার্ল মার্ক্স, এ মাসেই যার দুশোতম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে, তিনি বলেছিলেন যে একদিন এ ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়বে।

বিবিসি বাংলার আরো খবর:

"উৎপাদন ব্যবস্থায় যখন যন্ত্রপাতি যুক্ত হবে তখন শ্রমের ধরনেও নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। যন্ত্রপাতির এই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠার চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে যন্ত্রের গতি যার মাধ্যমে সে নিজেকেই চালিত করতে পারে, এবং তার সাথে বুদ্ধিমত্তাও। শ্রমিকরা এখানে শুধু একটি যন্ত্রের সাথে আরেকটি সংযোগ স্থাপন করছে।"

ব্রিটেনে হাটফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রমিক ও বিশ্বায়ন বিভাগের অধ্যাপক আরশেলা হিউজ বলছেন, কার্ল মার্ক্স বিষয়টিকে খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

"যন্ত্রপাতি এমন একটা বাড়তি বিষয় যোগ করে যে তখন আর শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে না। আবার যদি কোন শ্রমিক না থাকে তখন সেটা কোন বাড়তি মূল্যও যোগ করে না। কারণ, কার্ল মার্কস বলেছেন, এই শ্রমিক শোষণের মধ্য দিয়েই মুনাফা অর্জিত হয়," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

কার্ল মার্ক্স বেঁচে থাকলে এ মাসে তাঁর বয়স হতো দুশো বছর।

এখন প্রত্যেকটি কোম্পানি যদি তাদের শ্রমিকদের হটিয়ে এসব যন্ত্রপাতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাহলে প্রতিযোগিতার জন্যে তাদেরকে সবসময় আধুনিক যন্ত্রটি কিনতে হবে।

১৯৩০ এর দশকে আরেক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স বলেছিলেন, মানুষ তার বেশিরভাগ কাজই যন্ত্রের কাছে হস্তান্তর করে সপ্তাহে হয়তো ১৫ ঘণ্টার মতো কাজ করবে।

কিন্তু ব্রিটেনে বামপন্থী একটি মিডিয়া গ্রুপের গবেষক এলানা পেনি বলছিলেন, যন্ত্রপাতির ব্যবহার এতো বেড়ে যাওয়ার পরেও বেশিরভাগ মানুষেরই অবসর কেন বাড়েনি।

তিনি বলেন, "কথা হচ্ছে- এই অবসর সময় কিভাবে ভাগাভাগি হচ্ছে। কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের শুরু থেকেই মানুষের অবসর ছিলো। তারপর শিল্পকলা, বিজ্ঞান এবং মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে আছে শ্রেণী ব্যবস্থা। এক শ্রেণীর মানুষ অন্য শ্রেণীর মানুষের জন্যে কাজ করছে।"

"প্রযুক্তি কি করছে সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই প্রযুক্তির মালিকানা কার হাতে। কার্ল মার্ক্সও বলেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উৎপাদন পদ্ধতির মালিকানা," বলেন তিনি।

অনেকে মনে করেন, রোবট যখন সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে তখন বেকারত্বের হার গিয়ে পৌঁছাবে ৭০ শতাংশে। কিন্তু কিংস কলেজের অধ্যাপক জনাথন পোর্টার এনিয়ে মোটেও চিন্তিত নন।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান,

রোবটের সঙ্গীত পরিচালনা

"গত তিনশো বছর ধরেই প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটেছে। লোকজন সবসময়ই বলে এসেছে যে এর ফলে বেকারত্বের সৃষ্টি হবে কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি।"

"তবে আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে- খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ এসব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি তৈরি করছে আর বৃহৎ অংশটি জড়িত অদক্ষ কাজের সাথে। এসব কাজের চাহিদা কম হওয়ায় তাদের মজুরিও কম। সেকারণে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই প্রযুক্তি কারা নিয়ন্ত্রণ করছে সেটা।"

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি ফেসবুকের মতো সোশাল মিডিয়া থেকে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার কেলেঙ্কারি থেকে বোঝা যাচ্ছে, ঊনবিংশ শতকে কার্ল মার্ক্সের শ্রেণীভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা একবিংশ শতাব্দীতেও কতোটা প্রাসঙ্গিক।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: