বাংলাদেশে যেভাবে শুরু হলো মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান

ইয়াবার চালানসহ আটক সন্দেহভাজন চোরাচালানী (ফাইল ফটো) ছবির কপিরাইট র‍্যাব
Image caption ইয়াবার চালানসহ আটক সন্দেহভাজন চোরাচালানী (ফাইল ফটো)

বাংলাদেশে মাদক চোরাচালানী এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু হয়েছে তা হঠাৎ করেই হয়নি। এর পেছনে রয়েছে মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করার জন্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভিপ্রায়।

এই অভিযানের পটভূমি ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম বিবিসিকে বলছিলেন, এ বছর অন্তত তিনটি বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলেছিলেন। তার ধারাবাহিকতাতেই এ অভিযান চলছে।

মাদকের সামাজিক ঝুঁকি বর্ণনা করে এইচ. টি. ইমাম বলেন, মাদক পাচারের সাথে মানব পাচার এবং বেআইনি অস্ত্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। প্রথমে আসে মানব পাচার, মানব পাচারের হাত ধরে আসে মাদক পাচার, এবং এই দুটিকে রক্ষা করার জন্য বেআইনি অস্ত্র আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই অভিযানের সাফল্য বর্ণনা করে মি. ইমাম জানান, অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম ১৮ দিনে ২২০০ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট এবং বিচারিক আদালতে ৬০০ জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে মোট ৪৮৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তিনি জানান, অভিযানের প্রথম ১৮ দিনে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ জন।

তবে বেসরকারিভাবে মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে এপর্যন্ত ৩৮জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আরো পড়ুন:

'ডাকি নিই যাই আমার স্বামীরে তারা মারি ফেলিসে'

সীমান্ত থেকে মাদক যেভাবে ঢাকায় যায়

'টেলিফোন করলেই পৌঁছে যায় ইয়াবা'

কীভাবে বুঝবেন আপনার সন্তান মাদকাসক্ত কিনা

Image caption এইচ. টি. ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

কিন্তু কেন এই অভিযান এর আগে শুরু হয়নি এবং আওয়ামী লীগের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে কেন এই অভিযান? এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগের মেয়াদ এখনই শেষ হয়ে যায়নি।

"মাদক সমস্যা একটি রোগের মতো। রোগ যখন চরম আকার ধারণ করে তখন সবার টনক নড়ে। তাই একে এর বেশি বাড়তে দেয়া যায়না।"

তবে মি. ইমাম উল্লেখ করেন, মাদক-বিরোধী অভিযানে সাফল্য না এলে আগামী নির্বাচনে ওপর তার মারাত্মক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অভিযান চালানো হচ্ছে কি না, এই সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন।

এই অভিযানে এপর্যন্ত যারা নিহত হয়েছে, তাদের মধ্যে একজনও নিরপরাধ মানুষ নেই, এটা কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আসামী নিহত হওয়ার প্রতিটি ঘটনার পর পরই মামলা দায়ের করা হয়।

"এর ওপর তদন্ত চলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহি করতে হয়," তিনি বলেন, "যে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দিয়েছেন তাকেও রিপোর্ট পাঠাতে হয়। পোস্ট মর্টেম হয়।"

তবে মি. ইমাম উল্লেখ করেন, কাউকে যদি অন্যায়ভাবে গুলি করা হয়, তাহলে তার আত্মীয় স্বজন সুবিচারের জন্য আইনের আশ্রয় চাইতে পারেন।

Image caption কোরান শরীফের ভেতরে বহন করে আনা ইয়াবা।

কিন্তু মাদক চোরাচালানী বা ব্যবসায়ী হোক, কিংবা মাদক ব্যবহারকারীই হোক, সংবিধানে সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এবং সংবিধান অনুযায়ী সবার কী ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নেই? এই প্রশ্নের জবাবে এইচ. টি. ইমাম জানান, ২২০০ জনকে আদালতের মাধ্যমেই বিচারে মুখোমুখি করা হয়েছে। ছয়শো জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারীকেও স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, "তবে যদি কোন ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে, কোন নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে যদি এরকম হয়ে তাকে, তাহলে অবশ্যই তার বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। তেমন ঘটনা ঘটলে সরকার অবশ্যই তা দেখবে।"

বিরোধীদল বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে মি. ইমাম জানান, আওয়ামী লীগের ভেতরে কেউ যদি মাদকের সাথে যুক্ত থাকে তাকেও ছাড় দেয়া হবে না বলে শেখ হাসিনা মুক্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, চলতি বছরের গোড়া থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। জানুয়ারি মাসে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার মধ্যে মাদককে গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

Image caption ইয়াবা, বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত মাদক।

তিনি বলেন, "এরপর পুলিশের দ্বিতীয় আরেকটি অনুষ্ঠানে এবং তৃতীয়বার গত মাসে সারদায় পুলিশ ট্রেনিং একাডেমীতে ভাষণেও তিনি মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।"

গত ১১ই মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে ভাষণ দেয়ার সময় শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের পাশাপাশি মাদক সমস্যা থেকে ছাত্র সমাজকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।

মি. ইমাম বলছিলেন, "ঐ ভাষণেই তিনি জানান যে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তিনি ইতোমধ্যেই র‍্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।"

Image caption বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ।

গত ৩রা মে র‍্যাব সদর দফতরে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদের মতো সমস্যার মোকাবেলায় র‍্যাব যেমন সাফল্য দেখিয়েছে, তেমনি মাদক চোরাচালানী বা মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে র‍্যাব কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঐ বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, মাদক তৈরি, বিক্রি, পরিবহন এবং সেবনের সাথে যারা জড়িত তাদের সবাই সমানভাবে দোষী বলে প্রধানমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন।

মূলত এর পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর এই বিশেষ অভিযান শুরু হয়।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

'রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা হিন্দুদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে'

যে দশটি প্রাণঘাতী রোগ সম্পর্কে না জানলেই নয়

'হাসপাতালে যেতে রাজী হয়নি মুক্তামণি'