মাসিক নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করছেন উগান্ডার পুরুষরা

মাসিক নিয়ে গ্রামের মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করে সবাইকে সচেতন করে তুলতে কাজ করছে গ্রামেরই কয়েকজন উদ্যোক্তা।
Image caption মাসিক নিয়ে গ্রামের মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করে সবাইকে সচেতন করে তুলতে কাজ করছে গ্রামেরই কয়েকজন উদ্যোক্তা।

মধ্য উগান্ডার গ্রাম পিজি। প্রত্যন্ত এই গ্রামটিতে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নানা ভ্রান্ত ধারণার প্রচলন থাকায় স্কুলগুলোর সকালের অ্যাসেম্বলিতে মেন্সট্রুয়াল হেল্থ বা মাসিক চলাকালীন পরিচর্যা নিয়ে প্রায়ই খোলামেলা আলোচনার ব্যবস্থা রাখা হয়।

১৪ বছর বয়সী জোসভিন্যা বুসি স্কুলের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী। সে জানায় মাসিকের সময়কার তার কিছু অভিজ্ঞতার কথা।

"মাসিক চলাকালীন আমার স্কুলে আসতে একদম ভালো লাগতো না। সে সময় আমার কাছে কোন প্যাড ছিলোনা। এজন্য ভয়ে থাকতাম, স্কুলে গেলেই বুঝি জামা কাপড় নষ্ট হয়ে যাবে। সবাই দেখে ফেলবে। খুব চিন্তা হতো। তবে পরীক্ষা বা অন্য সময় যখন স্কুলে আসতেই হতো, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। বসলে আর দাঁড়াতে চাইতাম না।"

জোসভিন্যার মতো এমন আরও অনেক মেয়ের মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছে গ্রামেরই বিভিন্ন বয়সী ছেলে-মেয়ে নারী-পুরুষ। তারা দলবেঁধে কেঁচি, সুই-সুতা, সুতির কাপড়, জীবাণুমুক্ত তুলা এবং কিছু অ্যাবজরবেন্ট বা শোষক উপাদান দিয়ে তৈরি করে স্যানিটারি প্যাড। যা কিনা স্বাস্থ্যসম্মত আবার দামেও সস্তা।

একটি ক্ষুদ্র স্থানীয় সংস্থা "মাউন্টেইনস অব হোপ" মাসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এই প্রকল্পটি শুরু করে।

Image caption গ্রামের বিভিন্ন বয়সীরা হাতে তৈরি করছে এসব স্যানিটারি প্যাডস।

তাদের লক্ষ্য উগান্ডার প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি পরিবার ও কমিউনিটিকে মাসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন করে তোলা। এমনটিই জানালেন প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা জেমস মালিঙ্গা।

তিনি জানান এই প্রকল্প চালু করতে গিয়ে তাকে কতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।

"আমাকে নিয়ে বেশিরভাগ পুরুষ একটা বিষয়ে নালিশ করতো যে আমি মেয়েলি বিষয়ে কেন কথা বলছি। এসবের সঙ্গে তো ছেলেদের কোন সম্পর্ক নেই। সে সময় আমি ধৈর্য্য ধরে তাদেরকে বুঝিয়েছি।

আমার বোন ও স্ত্রীদের পাশে আমাদেরকেই দাঁড়াতে হবে। মাসিকের সময় তাদের সাহায্য করতে হবে। বুঝতে হবে ওই বিশেষ দিনগুলোতে তাদের কি কি প্রয়োজন।

তবে অনেকেই বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেছিলো। তারপরও আমি সব উপেক্ষা করে এই প্যাড বানানো শুরু করি। কারণ এই কাজের মাধ্যমে আমি আমার মেয়ে আমার স্ত্রী বা আমার কোন বোনকেই সাহায্য করছি। এতে আপত্তি তোলার কি আছে?"

প্যাড বানানোর পর মিস্টার মালিঙ্গা এগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামের নারীদের কাছে দিয়ে আসেন এবং প্যাড ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রচারণা চালান।

Image caption "মাউন্টেইনস অব হোপ" এর প্রতিষ্ঠাতা জেমস মালিঙ্গা।

তবে মাসিক নিয়ে নিয়ে কমিউনিটির সামনে খোলামেলা কথা বলতে পারলেও পিরিয়ড বা মেন্সট্রুয়েশন এই শব্দগুলো স্পষ্টভাবে ব্যবহার করতে পারেননা তিনি।

কারণ উগান্ডার স্থানীয় ভাষায় এসব শব্দের অর্থ মানে "নিজের পায়ের আঙ্গুলে আঘাত করো"।

তাই মাসিক নিয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসা মানসিকতা পরিবর্তন আরও সময় সাপেক্ষ বলে মনে করেন এই সমাজকর্মী।

তবে মালিঙ্গার এমন প্রচারণার কারণে পিজি ও এর আশেপাশের গ্রামের এখন প্রায় সবাই মেন্সট্রুয়াল হাইজিনের প্রচারক হিসেবে কাজ করছে। তাদেরই একজন ১২ বছর বয়সী বালক ডানমু-চুঙ্গুজি। সে জানায়,

"প্যাড বানানোটা আমার জন্য অনেক জরুরি। কারণে এগুলো দিয়ে আমি আমার বোনদের সাহায্য করতে পারি। এছাড়া এসব বিক্রি করে বাড়তি উপার্জনও হয়।"

তিন মেয়ের মা জোসবিন সেকালুহু। মেয়েদের সবাই স্কুল শিক্ষার্থী। তিনি সবচেয়ে ভালো বোঝেন যে একটি মেয়ের ক্ষমতায়নের পেছনে মাসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কতো জরুরি।

Image caption উগান্ডার ৪০ লাখ স্কুল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাডস বিতরণ করা সরকারের একার পক্ষে বেশ কঠিন।

তিনি মনে করেন, একটি মেয়ের কাছে যদি মাসিকের প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য হয় তাহলে কোন বাঁধাই তার পথ আটকাতে পারবেনা। তিনি বলেন,

"যখন আমি ছোট ছিলাম তখন স্যানিটারি প্যাড কি জানতামই না।আমরা তখন পুরনো কাপড় ব্যবহার করতাম।

বারবার একই কাপড় ধুয়ে ব্যবহার করতে হতো। তবে এখন আমি জানি প্যাড কিভাবে তৈরি করতে হয়।

আমি যে কষ্ট করেছি, আমার মেয়েদের সেই কষ্ট হতে দেব না। তাদের যেন প্রতিদিন স্কুলে যেতে পারে। নিজ হাতে প্যাড তৈরি করতে পারায় আমার পয়সাও সাশ্রয় হচ্ছে।"

উগান্ডার ৪০ লাখ স্কুল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করা সরকারের একার পক্ষে বেশ কঠিন কাজ হলেও, মালিঙ্গা বা জোসবিনের মতো ছোট ছোট উদ্যোক্তারা নিজ কমিউনিটির প্রতিটি নারীর মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে যে কাজ করছে তা বদলে দিতে পারে একেকটি গ্রামের চিত্র।

আরো পড়ুন:

মাসিকের প্রথম দিনে যেখানে মেয়েদের ছুটি

নেপালে ঋতুস্রাবের সময় মেয়েদের ঘর ছাড়তে হয় কেন?

মাসিক বন্ধ হওয়া আর ধর্ষণই যেখানে নারীদের রুটিন