রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮: খেলা শেষে জাপান সমর্থকরাই পরিষ্কার করলো স্টেডিয়াম

স্টেডিয়ামে জাপান সমর্থক। ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption স্টেডিয়ামে জাপান সমর্থক।

বিশ্বকাপে উত্তেজনাপূর্ণ কোন ম্যাচ শেষ হওয়ার পর গ্যালারির আসনগুলোতে সাধারণত উচ্ছিষ্ট খাবার, গ্লাস, কাপ, বোতল, প্লাস্টিক ও কাগজের ঠোঙ্গা বা প্যাকেট ইত্যাদি আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতেও রাশিয়ায় মাঠের একই অবস্থা ছিল জাপান ও কলম্বিয়ার ম্যাচের পর। জাপান সমর্থকদের আনন্দ উল্লাস করার কারণ ছিল যেহেতু তারা ২-১ গোলে জিতেছে। দক্ষিণ আমেরিকার কোন দলের বিরুদ্ধে এটাই জাপানের প্রথম জয়।

খেলার মাঠে কলম্বিয়াকে ধরাশায়ী করার পর জাপানের সমর্থকরা কিন্তু গ্যালারিতে শুধু আনন্দ উল্লাসেই মেতে থাকেনি, বরং তারা গ্যালারি পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে যান। স্টেডিয়ামের ভেতরে দর্শকদের সারিতে ও আসনে যেসব আবর্জনা ছিল সেগুলো তারা নিজেরাই পরিষ্কার করতে শুরু করে।

এসময় তাদের হাতে ছিল ময়লা কুড়িয়ে নেওয়ার বড় বড় ব্যাগ। খেলা শেষ হওয়ার পর তারা ঘুরে ঘুরে ময়লা আবর্জনা এসব ব্যাগে ভরে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করতে থাকেন। তাদের কথা হলো- "ভেতরে ঢুকে আমরা স্টেডিয়ামটিকে যে অবস্থায় পেয়েছি, এটিকে আমরা সেরকমই রেখে যেতে চাই।"

জাপানি ফুটবল সমর্থকরা যে এধরনের কাজ এই প্রথম করেছে তা নয়। এর আগেও বিভিন্ন খেলার পরে তারা দল বেঁধে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেছে।

আরো পড়তে পারেন:

সেনেগালের যে গোলটি নিয়ে বিতর্ক

বিশ্বকাপ ২০১৮: রাশিয়ার জন্মহার বাড়াবে ফুটবল?

রাশিয়ায় এখন পর্যন্ত নজর কেড়েছেন কারা

'হিজাবের নিচে বই খাতাপত্র লুকিয়ে রাখতাম'

ঠাণ্ডা থাকতে গিয়ে বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা

"এটা তো শুধু ফুটবল সংস্কৃতির অংশ নয়, এটা জাপানি সংস্কৃতিরই অংশ," বিবিসিকে একথা বলেছেন ফুটবল সাংবাদিক স্কট ম্যাকিনটার, যিনি জাপানেই থাকেন। বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে তিনি এখন রাশিয়ায়। গতকালের ময়লা পরিষ্কারের অভিযান দেখে তিনি মোটেও বিস্মিত হননি।

"অনেকেই বলে থাকেন যে ফুটবল হচ্ছে সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ ফুটবল দেখে বোঝা যায় কার সংস্কৃতি কেমন। জাপানি সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আছে সেটা নিশ্চিত করা। সব ধরনের খেলাধুলাতেই দর্শকরা একই আচরণ করে থাকে। ফুটবলেও একই রকম," বলেন তিনি।

শৈশব থেকেই এই অভ্যাস

সেনেগালের সমর্থকদেরকেও এবারের বিশ্বকাপে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। তবে জাপানিরাই এই কাজটি শুরু করেছিল এবং এজন্যে তারা আজ বিখ্যাত।

বিদেশি যেসব দর্শক সেদিন খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন তাদের অনেকেই জাপানিদের এই উদ্যোগে সেদিন অবাক হয়েছেন।

"তাদের কেউ কেউ হয়তো আসনের উপর খাবারের প্যাকেট কিম্বা বোতল রেখে যেতে পারেন। তখন জাপানিরা পেছন থেকে তাদের কাঁধে টোকা মেরে বলবে তাদের দায়িত্ব এসব আবর্জনা পরিষ্কার করা কিম্বা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া," বলেন মি. ম্যাকিনটার।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption জাপানিদের আনন্দ উল্লাস।

এই অভ্যাস জাপানিদের মধ্যে গড়ে উঠে তাদের শৈশব থেকেই।

"স্কুলে ছেলেমেয়েদেরকে যেসব আচরণ শেখানো হয়, স্টেডিয়ামে তার কিছুটা অংশ আমরা দেখতে পাই। জাপানের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরাই তাদের স্কুলে ময়লা পরিষ্কার করে থাকে," বলেন ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্কট নর্থ।

"শিশু বয়স থেকে বারবার এই কাজটির উপর জোর দেওয়ার কারণে এটি বেশিরভাগ লোকেরই আচরণের ভেতরে ঢুকে যায়," বলেন তিনি।

"আবর্জনা পরিষ্কার করা এবং এসবের রিসাইক্লিং-এর ব্যাপারে জাপানিরা অত্যন্ত সচেতন। বিশ্বকাপেও জাপানিরা এই কাজটা অত্যন্ত গর্বের সাথে করেছে। সোশাল মিডিয়াতে এসব ছবি, ভিডিও পোস্ট করে তারা তাদের সেই গর্ব বাকি বিশ্বের সবার সাথে শেয়ার করে নিয়েছে," ব্যাখ্যা করেন অধ্যাপক নর্থ।

সাংবাদিক স্কট ম্যাকিনটার বলেন, "বিশ্বকাপ দেখতে বিভিন্ন দেশের মানুষ একটা জায়গায় জড়ো হয়- এটা একটা দারুণ ঘটনা। এখান থেকে একজন মানুষ আরেকজনের কাছে এরকম অনেক কিছু শিখতে পারে, বিনিময় করতে পারে তাদের চিন্তাভাবনা এবং অভিজ্ঞতাও। এটাই হলো ফুটবলের সৌন্দর্য।"

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর