বাংলাদেশে রেল লাইনের লেভেল ক্রসিং-এর মরণফাঁদ বন্ধ হয় না কেন?

রেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ মানুষের অসচেতনতা।
Image caption রেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ মানুষের অসচেতনতা।

বাংলাদেশে গত ক'দিনে রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুর একাধিক ঘটনার পর তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একটি ঘটনায় মোবাইল ফোনে সেলফি তুলতে গিয়ে, ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইনে হাঁটতে গিয়ে চলন্ত ট্রেনে কাটা পড়ে এক বাবা ও তার দুই মেয়ে মারা গেছে।

রেলসূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৩০৩ জনের। যার মধ্যে ২৩৮ জন পুরুষ ৬৫ জন নারী। গত বছর মৃত্যু হয়েছে ৮১২ জনের।

এ ধরণের দুর্ঘটনার পেছনে মানুষের অসচেতনতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দুষছে রেলওয়ে পুলিশ।

তেজগাঁও রেলক্রসিং এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক গেটম্যানরা সতর্কীকরণ সাইরেন বাজালেও তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই মানুষের।

অনেকেই মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে লেভেল ক্রসিং ক্রস করে রেললাইন পার হয়ে যান। এমন এক পথচারীকে প্রশ্ন করলাম তিনি কেন এতো ঝুঁকি নিয়ে পার হলেন।

তিনি বললেন, "অনেক সময় তো দুর্ঘটনা ঘটে। সব সময় মানুষের দেখেশুনে চলা উচিত। এখন থেকে সতর্ক হয়ে চলবো।"

তবে মানুষের এ ধরণের অসচেতনতার কারণে প্রায়ই সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে বিভিন্ন দুর্ঘটনার খবর।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সবচেয়ে বেশি রেল দুর্ঘটনা ঘটে ঢাকা-কমলাপুর-টঙ্গি রুটে।

মঙ্গলবার ফেনীর মহেশপুরে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হন এক বিদ্যুৎকর্মী।

এর আগে সোমবার বিকেলে নরসিংদীর রায়পুরা আমিরগঞ্জ রেল ব্রিজে সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে বাবাসহ দুই মেয়ে নিহতের ঘটনা ঘটে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরেও ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোডে রেল লাইনের উপরে বসে সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান এক যুবক।

এসব দুর্ঘটনার পেছনে মূলত অচেতনতাকে দায়ী করেন তেজগাঁও রেলগেটের গেটম্যান ওয়াহিদুল্লাহ হোসেন, "একটু আগে একটা মোটর সাইকেলকে বললাম পার না হতে। উনি শুনলেন না পার হয়ে গেলেন। এখানে আমরা কি বলব? এখন মানুষের জীবনের চাইতে সময়ের মূল্য বেশি।"

সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-কমলাপুর-টঙ্গি রুটে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে মানুষকে সজাগ করে তুলতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসেই রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৩০৩ জনের

এ ব্যাপারে ঢাকা রেলওয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশফাকুল আলম জানান, "ট্রেনে কাটা পড়ার অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে মোবাইল ফোনে গান শোনা, সেলফি তোলা এবং ফোনে কথা বলতে রেললাইন ধরে হাঁটা বা পার হওয়ার কারণে।"

"রেল লাইনে এভাবে কাটা পড়ে হতাহতের ঘটনা কমাতে রেল কর্তৃপক্ষ ও রেলপুলিশ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও মানুষ এতে গুরুত্ব না দেয়ায় দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছেনা।এক্ষেত্রে রেল পারাপারের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে।"

রেল পুলিশ মানুষকে সচেতন করার জন্য প্রচারণা চালালেও এ বিষয়ে মানুষের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

"রেলে দুর্ঘটনা ঠেকাতে পুলিশের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করা হয়। প্রচারণা চালানো হয়। তবে এখানে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যুক্ত হতে পারলে, মানুষকে আরো বেশি সচেতন করা যেত।"

রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, রেলপথের দু'পাশে ১০ ফুট করে ২০ ফুট এলাকায় চলাচল আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওই সীমানার ভেতর কেউ প্রবেশ করলে তাকে গ্রেফতারের বিধান রয়েছে।

এমনকি এই সীমানার গবাদিপশু প্রবেশ করলে সেটা বিক্রি করে এর অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিনা পরোয়ানায় দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাখেন।

Image caption দেশের রেলপথগুলো অরক্ষিত থাকায় দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছেনা।

সেক্ষেত্রে দোষ প্রমাণ হলে দায়ী ব্যক্তিকে সাত বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

তবে জনসংখ্যার তুলনায় লোকবল যথেষ্ট না থাকায় বাস্তবে আইনের এসব বিধান কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ বলে জানান জিআরপি থানার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশফাকুল আলম।

"আমাদের দেশের রেলপথগুলো অরক্ষিত। এই বিশাল এলাকাজুড়ে প্রতিটি পয়েন্ট আসলে চাইলেও নজরদারিতে আনা সম্ভব না। এক্ষেত্রে জন সচেতনতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।"

সারাদেশে মোট রেলপথ ২৮৭৮ কিলোমিটার। লেভেল ক্রসিং রয়েছে ২৫৪১টি। যার মধ্যে অবৈধ রেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১৩০০টি।

অথচ এসব লেভেল ক্রসিংয়ে রেলরক্ষী রয়েছে মাত্র ২৪২টিতে।

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশ রেলওয়েতে কেন ১৪ হাজার পদ খালি?

ঢাকা-কলকাতা ট্রেন যাত্রায় তিন ঘণ্টা সময় কমবে

প্রকাশ্যে মলত্যাগ: দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেল ট্রেন

সম্পর্কিত বিষয়

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর