গুজবে কান দিয়ে কেন মানুষ পিটিয়ে মারা হচ্ছে?

ছবির কপিরাইট Hindustan Times
Image caption গণপিটুনির বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিবাদ

গত মাস দেড়েকের মধ্যে ভারতের নানা প্রান্তে ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে অন্তত ১৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

এই গুজব ছড়ানো হয়েছে হোয়াটস্অ্যাপের মাধ্যমে। একটি ভিডিয়ো ক্লিপ, কয়েকটি স্থির চিত্র আর সঙ্গে একটি মেসেজ - এইভাবেই গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে ছেলেধরারা ঘুরে বেড়াচ্ছে আপনার এলাকায়।

ওই মেসেজগুলি বিশ্লেষন করে দেখা গেছে যে সব রাজ্যেই সেগুলির বয়ান মোটামুটিভাবে একই রকম, শুধু স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে।

ভারতে ভুয়ো খবর আর ছবি বিশ্লেষণ করে, এমন একটি ওয়েবসাইট অল্ট নিউজ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে যে ওই ভিডিয়োটির উৎস পাকিস্তানে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ছেলেধরা আর শিশুচুরির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়তেই ওই ভিডিয়োটি বানিয়েছিল।

এখন ভারতে সেই ভিডিয়োটির একটি অংশ ছড়িয়ে দিয়ে ছেলেধরার ঘটনাগুলি সত্যি বলে প্রমাণ করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

আর তার ভিত্তিতেই অচেনা অজানা মানুষ দেখলেই গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে।

তবে গণপিটুনি শুধু যে ছেলেধরার গুজবে নয়, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা গরুর মাংস রাখার মতো গুজব ছড়িয়েও গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার ঘটনা হয়েছে ভারতে।

প্রবাদ আছে গুজবে কান দিতে নেই। কিন্তু কেন মানুষ গুজবে কান দেয় আর কেনই বা সেই গুজবের ওপরে ভরসা করে গণপিটুনি দিচ্ছে ভারতের কিছু মানুষ?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মহারাষ্ট্রের ধুলে-তে এখানেই পাঁচজনকে পিটিয়ে মেরেছিল উত্তেজিত জনতা

আমাদের পেজে আরও পড়ুন :

বাংলাদেশে উবার, পাঠাওসহ অন্যান্য অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং নিরাপত্তা: যা জানা জরুরি

ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৪৩ অল আউট : কী বলছে বাংলাদেশ?

বিশ্বকাপ ফুটবল উগান্ডানদের জন্য এখনো আতঙ্কের

কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, অতীতে যা পরিচিত ছিল প্রেসিডেন্সি কলেজ নামে, তার সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তণ প্রধান শমীত কর বলছিলেন, " আমাদের দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকা আছে যেখানে মানুষ এখনও আক্ষরিক অর্থেই কান দিয়ে পৃথিবীটা দেখে, অর্থাৎ, শোনা কথায় বড় বেশী বিশ্বাস করে। এটা একটা দীর্ঘকালীন অভ্যাস, তার ফলেই গুজবেও মানুষ কান দেয়। সেখান থেকেই সম্ভবত ওই কথাটার উদ্ভব, যে গুজবে কান দেওয়া।"

ক্রাউড সাইকোলজি, বা ভীড়ের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভারতের সমাজতত্ত্ববিদদের একাংশ বলছেন যে জনসমাগম বা ভীড় কাউকে গণপিটুনি দিচ্ছে, তার মধ্যে একটা হিরোগিরি বা দাদাগিরির চরিত্র লক্ষ্য করা যায়।

খাদ্য থেকে পোষাক - সব কিছুতেই তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আসতে চায়।

তারাই যেন আইনের নিয়ন্ত্রক। তারাই বিচার করে ফেলে কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক।

সমাজতত্ত্ববিদ শিব বিশ্বনাথন বিবিসিকে বলছেন, "এই ভীড় বা উত্তেজিত জনসমষ্টি একনায়কতন্ত্রেরই একটা বিস্তৃত লক্ষণ। সভ্য সমাজের মধ্যে যে চিন্তাভাবনার ক্ষমতা রয়েছে আর কথাবার্তার মাধ্যমে কোনও সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা রয়েছে, সেটা এই ভীড়ের মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দেয়। সাম্প্রতিক যেসব ঘটনা হয়েছে ভারতে, যেমন কাঠুয়ার শিশুধর্ষণ কান্ড বা মুহম্মদ আখলাখের হত্যা - সব ক্ষেত্রেই মোটামুটি এই তত্ত্বটি প্রযোজ্য। কিন্তু ছেলেধরার গুজবের ক্ষেত্রে ভীড়ের মনস্তত্ত্বের একটা একেবারে অন্য রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি।"

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption গণপিটুনির প্রায় সব ঘটনাতেই গুজব ছড়িয়েছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে

"অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন হিরোগিরি বা ক্ষমতাপ্রদর্শণ ভীড়ের মনস্তত্ত্বের একটা ব্যাখ্যা, এই ছেলেধরার গুজবের ক্ষেত্রে ব্যপারটা হচ্ছে আতঙ্কের কারণে। বাচ্চা চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়টা যে কোনও মানুষকেই নাড়িয়ে দেবে। তাই নিজের সমাজের বাইরের কাউকে, অচেনা ব্যক্তি দেখলেই তাকে সাজা দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছে এক শ্রেণীর মানুষ," বলছিলেন মি. বিশ্বনাথন।

অধ্যাপক শমিত কর বলছিলেন, "পশ্চিমবঙ্গে এর আগেও যেসব গণপিটুনির ঘটনা হয়েছে, সেগুলি আমি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেছি যে কোনও কারণে ভয়-ভীতির আবহাওয়াতে যদি মানুষের মনে হয় যে প্রশাসন বা পুলিশের কাছে গেলে সহায়তা পাবো না, তখনই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায় তারা। সেটা যতোই আমাদের অযৌক্তিক মনে হোক, ওই ভীত মানুষদের কাছে সেটাই তখন যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়।"

কেউ কেউ এই হিংসা ছড়ানোর ঘটনাগুলোকে ডিজিটাল হিংসা বলে বর্ণনা করছেন। তাঁরা মনে করছেন, ভীড়ের মনস্তত্ত্ব তো আগেও ছিল, গণপিটুনি আগেও হত। কিন্তু এখন ডিজিটাল ভারতে সেই মনস্তত্ত্বের সংজ্ঞাও পাল্টাচ্ছে।

"একদিকে রাস্তাঘাট বা পরিবহনের মতো প্রাথমিক পর্যায়ের উন্নয়নগুলো হয় নি বহু এলাকাতেই, কিন্তু সেইসব জায়গাতেও আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা পৌঁছিয়ে গেছে স্মার্টফোন ইত্যাদির মাধ্যমে। মানুষ তাই সোশাল মিডিয়ার ওপরেই ভরসা করছে কারণ ফিজিক্যাল যোগাযোগ ব্যবস্থা সেখানে অনুপস্থিত," বলছিলেন অধ্যাপক শমিত কর।