বাংলাদেশে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে কি প্রতিকার আছে?

সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজেও ভুল চিকিৎসায় শিশুমৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজেও ভুল চিকিৎসায় শিশুমৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সম্প্রতি রাইফা নামের একটি শিশুর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা এবং অবহেলার অভিযোগ এনেছেন তার অভিভাবকরা।

ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিরও বৃহস্পতিবারই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ই উঠেছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী রোগী বা তাদের পরিবার কতটা প্রতিকার পায়?

গলায় ব্যথা আর ঠাণ্ডার সমস্যা নিয়ে রাইফাকে চট্টগ্রামের ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বৃহস্পতিবার। কিন্তু পরদিন রাতেই সে মারা যায়।

শিশুটির বাবা রুবেল খানের অভিযোগ: এ সময় তিনি চিকিৎসকদের অবহেলার শিকার হয়েছেন।

রুবেল খান বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "বৃহস্পতিবার একটি আইসক্রিম খাওয়ার পর রাইফার গলায় ঠাণ্ডার সমস্যা তৈরি হয়। কিছু খেতে পারছিল না। তখন তাকে আমরা ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যাই, যাতে সেখানে তাকে স্যালাইন দেয়া হয়।"

তিনি জানান, চিকিৎসকরা তাকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পর থেকেই রাইফা দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে। চিকিৎসকদের তা জানালে তারা গুরুত্ব দেননি। বরং সেটি অব্যাহত রাখেন।

পরদিন রাতের এক পর্যায়ে তাকে সিডিল সাপোজিটর দেয়া হয়। এরপরেই রাইফার খিঁচুনি উঠে যায়।

আমাদের পেজে আরও পড়ুন :

বাংলাদেশে উবার, পাঠাওসহ অন্যান্য অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং নিরাপত্তা: যা জানা জরুরি

ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৪৩ অল আউট : কী বলছে বাংলাদেশ?

বিশ্বকাপ ফুটবল উগান্ডানদের জন্য এখনো আতঙ্কের

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার তদন্তের আশ্বাস দিচ্ছে বিএমডিসি

মি. খান বলছেন, "এ সময় শিশু বিশেষজ্ঞকে ডেকেও তার কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সও মেয়েটিকে ভালো করে দেখেননি। রাইফা নিস্তেজ হয়ে পড়তে শুরু করলে তাকে নিয়ে সিসিইউতে যাই, সেখান থেকে আমাদের এনসিসিইউতে পাঠানো হয়। এ সময় মেয়েটিকে অক্সিজেন দিয়ে তারা দেখলে হয়তো সে বেঁচে যেতো।"

রাইফার মৃত্যুতে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা আর অবহেলার অভিযোগ এনেছেন রুবেল খান।

এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন দেয়ার কথা রয়েছে।

আরেকজন রোগী বলছিলেন, তাকে বাংলাদেশের একজন নামী চিকিৎসক তিন মাসের আয়ু বেঁধে দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিবেশী একটি দেশে চিকিৎসার পর তিনি এখন পুরোপুরি সুস্থ রয়েছেন।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এর আগেও ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ উঠেছে এবং অনেক সময় রোগীর স্বজনদের বিক্ষোভের ঘটনাও দেখা গেছে।

সম্প্রতি অনিয়ম, রোগ নির্ণয়ে ক্রুটির কারণে বেশ কয়েকটি নামী হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে জরিমানাও করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের রোগনির্ণয় প্রতিবেদনে ক্রুটি রয়েছে।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা স্বজনরা কতটা আইনি প্রতিকার পান?

ছবির কপিরাইট ফোকাসবাংলা
Image caption বাংলাদেশের একটি সরকারি হাসপাতালে শিশুদের ওয়ার্ড

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন প্রতিকার হয় না, কারণ চিকিৎসা ভুল না সঠিক সেটি অনেক সময় আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, ''প্রতিকার পেতে হলে আগে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে এই চিকিৎসাটি ভুল ছিল আর অন্যভাবে করলে সঠিক হতো। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন চিকিৎসক আরেকজনের বিরুদ্ধে সেই সাক্ষ্য দিতে চান না।''

তিনি বলছেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় কেউ এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে বাংলাদেশের চিকিৎসা ও দন্ত পরিষদে (বিএমডিসি) অভিযোগ জানাতে পারেন। তারা তদন্ত করে চিকিৎসকের সনদ স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।

কিন্তু সমস্যা হলো, সেখানেও বড় ধরনের অবহেলার বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার করা হয়নি। আবার চিকিৎসকদের নানা সংগঠন শক্তিশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও বড় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সনদ প্রদান ও তত্ত্বাবধানের গভর্নিং বডি বাংলাদেশ চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসা পরিষদ বা বিএমডিসি।

সংস্থাটি বলছে, অভিযোগ পাওয়ার পর তারা বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সনদ বাতিল বা স্থগিত করেছেন।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption অভিযুক্ত ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শাস্তিরও নজির আছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে

তবে শুধুমাত্র লিখিত অভিযোগ পেলেই তারা নিজে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারেন, নাহলে তারা কোন পদক্ষেপ নিতে পারেন না।

বিএমডিসির রেজিস্টার ড. এম জাহেদুল হক বসুনিয়া বলছেন, "আমাদের এখানে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। কোন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা সেই কমিটিতে পাঠিয়ে দেই। তারা সেটি তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া বা না নেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেন।"

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের একজন অধ্যাপক ও শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে চিকিৎসা সংক্রান্ত অবহেলার অভিযোগ এই কমিটিতে প্রমাণিত হওয়ার তাদের রেজিস্ট্রেশন তিন থেকে ছয়মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।

যদিও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের তুলনায় এ ধরনের উদাহরণ খুবই কম।

ড. বসুনিয়া বলছেন, "গণমাধ্যম বা অন্যকোন মাধ্যম থেকে বিএমডিসির সরাসরি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। শুধুমাত্র লিখিত ও বিস্তারিত অভিযোগ পেলেই আমরা সেটি তদন্ত করতে পারি।"

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর আগেও নানা ঘটনায় কমিটি হয়েছে, অনেকক্ষেত্রে প্রতিবেদনও জমা হয়েছে। কিন্তু বড় কোন শাস্তির উদাহরণ তৈরি হয়নি, ফলে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ ওঠাও বন্ধ হয়নি।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর