দক্ষিণ কোরিয়ায় 'স্পাইক্যাম মহামারী': গোপনে তোলা ছবির বিরুদ্ধে ব্যাপক নারী বিক্ষোভ

মেয়েরা সারাক্ষণ আতংকে থাকে কে কখন গোপনে স্পাইক্যামে ছবি তুলছে তা নিয়ে। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মেয়েরা সারাক্ষণ আতংকে থাকে কে কখন গোপনে স্পাইক্যামে ছবি তুলছে তা নিয়ে।

স্পাইক্যাম বা গোপন ক্যামেরায় মেয়েদের ছবি এবং ভিডিও তোলার বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। শনিবার রাজধানী সওলে এর বিরুদ্ধে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নারী বিক্ষোভ হয়েছে।

তথাকথিত স্পাইক্যাম ভিডিও নিয়ে রীতিমত আতংক তৈরি হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের মধ্যে। স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে, টয়লেটে বা চেঞ্জিং রুমে হরহামেশাই গোপনে মেয়েদের ছবি বা ভিডিও স্পাইক্যামে রেকর্ড করছে পুরুষরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার আইনে পর্নোগ্রাফি বিতরণ করা নিষিদ্ধ। অথচ এসব ছবি বা ভিডিও আবার শেয়ার করা হচ্ছে অনলাইনে। এরকম ঘটনার শিকার মেয়েদের কাহিনী প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে।

বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এর বিরুদ্ধে রীতিমত গণবিক্ষোভে নেমেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা। শনিবার রাজধানী সওলের বিক্ষোভে প্রায় ৫৫ হাজার নারী যোগ দেন বলে জানাচ্ছেন বিক্ষোভের আয়োজকরা। এদের বেশিরভাগই টিনএজার, যারাই কিনা এরকম স্পাইক্যাম পর্নোগ্রাফির শিকার হয় বেশি।

"আমি আর আমার বন্ধুরা সারাক্ষণ কিন্তু এই স্পাইক্যামের আতংকে থাকি। যখনই কোন পাবলিক টয়লেটে যাই, কোন দেয়ালে বা কোন ছিদ্রের মধ্যে বা দরোজায় কোন সন্দেহজনক কিছু লুকোনো আছে কিনা, তা খেয়াল রাখতে হয়", বলছিলেন ২২ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী।

"দক্ষিণ কোরিয়া এখন কী ধরনের একটা দেশে পরিণত হয়েছে? এখানে মেয়েরা এখন প্রস্রাব পর্যন্ত করতে যেতে পারে না, তাদের আতংকে থাকতে হয় যে কেউ গোপনে তাদের ভিডিও করছে কিনা।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption গোপনে ছবি তোলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে যোগ দেন হাজার হাজার নারী।

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রসর প্রযুক্তির দেশগুলির একটি বলে গর্ব করে। দুর্দান্ত গতির ব্রডব্যান্ড থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক স্মার্টফোন, সবকিছুতেই এগিয়ে তারা। পাঁচ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষের হাতেই আছে স্মার্টফোন।

কিন্তু এই প্রযুক্তিই আবার সর্বনাশ নিয়ে এসেছে তাদের জন্য। সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তিকে এক শ্রেণীর মানুষ গোপনে মেয়েদের ছবি বা ভিডিও তোলার কাজে ব্যবহার করছে।

২০১০ সালে যেখানে 'স্পাইক্যাম অপরাধের' সংখ্যা ছিল ১১০০, গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ছ হাজারে। এসব অপরাধের শাস্তি বড় জোর জরিমানা বা স্থগিত জেলবাস, যাকে নারী অধিকার গোষ্ঠীগুলো একেবারেই লঘুদন্ড বলে বর্ণনা করছে।

স্পাইক্যাম অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা মূলত পুরুষ। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, স্কুল শিক্ষক, ডাক্তার থেকে শুরু করে গির্জার পাদ্রি, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ অফিসার এমনকি বিচারক পর্যন্ত রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এই স্পাইক্যামের ব্যাধি এতটাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে সরকার নিয়ম করেছে, সেখানে যেসব স্মার্টফোন বিক্রি হবে, সেগুলোতে ক্যামেরায় ছবি বা ভিডিও তোলার সময় শাটারে জোরে শব্দ হতে হবে।

কিন্তু তাতেও ফল হচ্ছে না। অনেকে স্মার্টফোনে অ্যাপস ডাউনলোড করে এই শব্দ 'মিউট' করে দিচ্ছে। এছাড়া আরও অনেক অত্যাধুনিক ক্যামেরার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। চোখের চশমা, সিগারেটের লাইটার, ঘড়ি, গাড়ির চাবি, এমনটি গলায় পরা টাইয়ের মধ্যে পর্যন্ত লুকিয়ে রাখা যায় এই ক্যামেরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন গত মে মাসে এই স্পাইক্যাম মহামারির বিরুদ্ধে কঠোর সাজার বিধান করার আহ্বান জানান।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর