বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত: বিএসএফের হাতে যে কারণে কমছে বাংলাদেশী হত্যা

সীমান্তে বিএসএফের সৈন্য।
Image caption সীমান্তে বিএসএফের সৈন্য।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আগামী ১৩ই জুলাই শুক্রবার তিনদিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে যাচ্ছেন।

এসময় তার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে। ঢাকার বাইরে রাজশাহীতেও যাবেন তিনি।

কর্মকর্তারা বলছেন, সেখানে তিনি দু'দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করবেন।

ধারণা করা হচ্ছে, মি. সিং-এর এই সফরকালে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও নারী শিশু পাচারের মতো অপরাধ, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হতে পারে।

ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন এক সময়ে বাংলাদেশে যাচ্ছেন যখন বিএসএফের সৈন্যদের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কমে গেছে।

বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় একটি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র বলছে, এবছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত গত ছয় মাসে সীমান্তে বিএসএফের হাতে শারীরিক নির্যাতনে তিনজন নিহত হয়েছে এবং গুলিতে কেউ নিহত হয়নি।

কিন্তু ২০১৭ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছিল ২৫ জন। তাদের মধ্যে ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বিএসএফের জওয়ানদের গুলিতে। ২০১৬ সালে নিহত হয়েছে ৩০ জন এবং ২০১৫ সালে ৪৬ জন।

তবে এবছর যে তিনজন নিহত হয়েছে তারা ঠিক কী ধরনের নির্যাতনে মারা গেছে সেসব কারণের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বলা প্রয়োজন যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব পরিসংখ্যান তৈরি করে।

ছবির কপিরাইট ASK
Image caption আইন ও শালিস কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে সীমান্ত হত্যার খবর।

আরো পড়তে পারেন:

পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দুরা ভারত ছাড়ছেন কেন

হোয়াটসঅ্যাপ ভাইরাল মেসেজে ধরা পড়লো ধর্ষণকারী

দ্বিতীয় সেমিফাইনাল: এগিয়ে ইংল্যান্ড না ক্রোয়েশিয়া?

বাংলাদেশের অন্য আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারও বলছে, এবছর সীমান্তে বিএসএফের হাতে তিনজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। কিন্তু গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৯২। ২০১৬ সালে ৮৭ এবং ২০১৫ সালে নিহত হয়েছিল ১৩২ জন।

কিন্তু আইন ও শালিস কেন্দ্র এবং অধিকারের এই পরিসংখ্যানের মধ্যে একটা বড় রকমের পার্থক্য চোখে পড়ে। এই অমিলের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট এবং তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই তারা তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেন থাকেন। তারা চেষ্টা করেন, যতোটা সম্ভব প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সীমান্ত-হত্যা বন্ধের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারত দুটো দেশের ইতিবাচক অবস্থানের কারণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য রকমের উন্নতি ঘটেছে।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এব্যাপারে ভারত সরকারের মনোভাবেরও বড়ো রকমের পরিবর্তন ঘটেছে।

এবিষয়ে একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন তিনি- মাস দুয়েক আগে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িতে ২০ বছরের এক তরুণ বিএসএফের ছররা গুলিতে আহত হয়েছিলেন। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আইন ও শালিস কেন্দ্র বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগ করে। তখন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন থেকে তাদেরকে বলা হয়েছে যে ভারত সরকার ওই তরুণের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।

শীপা হাফিজা বলেন,"আহত যুবককে ভারতে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজেদের খরচে চিকিৎসা দিতে রাজি হয়েছে ভারত সরকার। এখন তার পাসপোর্ট তৈরির কাজ চলছে।"

সীমান্ত পরিস্থিতির এই উন্নতির পেছনে কী কাজ করেছে জানতে চাইলে শীপা হাফিজা বলেন, বিএসএফের সৈন্যদের হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিকদের নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো খুবই সোচ্চার।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ সরকার এসব সংগঠনের কথায় কান দিয়ে বিষয়টি ভারত সরকারের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

"তবে এই বিষয়টি যাতে শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটার প্রতিফলন ঘটতে হবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতিমালাতেও। তা নাহলে ভারত কিম্বা বাংলাদেশ - যে কোন দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিস্থিতি আবারও আগের পর্যায়ে চলে যেতে পারে," বলেন শীপা হাফিজা।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং

বাংলাদেশ সরকারও বলছে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর গুলিতে এখন আর কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কমিয়ে আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, "বিএনপির আমলে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকট আকার ধারণা করেছিল। কিন্তু এর পরে আমাদের সরকারের আমলে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দু'দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছি।"

ভারত সরকারও বলছে যে তাদের বাহিনীর সৈন্যদের হাতে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে না।

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিএসএফের মহাপরিচালক কে. কে. শর্মা কয়েক মাস আগে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ভারতীয় সৈন্যরা এখন আর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না।

"প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার কারণে আমাদের জওয়ানদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। চোরাকারবারিরা জানে যে বিএসএফের সৈন্যরা গুলি করবে না, তাই তারা আমাদের উপর আক্রমণ করছে। কিন্তু তারপরেও বিএসএফ তাদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না। কারণ এই অস্ত্র আর ব্যবহার করা হবে না এটা আমাদের সরকারে সিদ্ধান্ত।"

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সীমান্ত প্রায় ২৫০০ মাইল লম্বা। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম আর ভারতের অংশে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য মতে, ভারত সরকার সীমান্তে ২০০০ মাইলেরও বেশি লম্বা কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করেছে। এই বেড়ার উচ্চতা প্রায় তিন মিটারের মতো।

অধিকার বলছে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিএসএফের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বহুদিনের। তার মধ্যে রয়েছে নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের গুলি করে হত্যা, নির্যাতন এবং অপহরণ। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক চুক্তিরও লঙ্ঘন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সীমান্তে সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বিশ্বের রক্তাক্ত সীমান্তগুলোর একটি উল্লেখ করে অধিকারের মানবাধিকার কর্মীরা এও বলছেন, শুধু তাই নয়, বিএসএফের জওয়ানরা অনেক সময় অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকেও বাংলাদেশী নাগরিকদের উপর হামলা চালায় ও তাদেরকে অপহরণ করে থাকে।

অধিকারের হিসেবে অনুসারে ২০০০ সালের পর থেকে গত ১৮ বছরে বিএসএফ সৈন্যদের হাতে ১,১৩৬ জন নিহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে ২০০৬ সালে, ১৫৫ জন।

অধিকার বলছে, বিএসএফের হাতে গত ১৮ বছরে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১,৩৬০ আর সবচেয়ে বেশি অপহরণ হয়েছে ওই একই বছরে (২০০৬), ১৬০টি। তারপরে ২০১৩ সালে, ১২৭টি।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর