'এটাই মোদির নৃশংস নতুন ভারত': গোরক্ষকদের পিটুনিতে মুসলিম যুবক হত্যা নিয়ে রাহুল গান্ধীর টুইট

ভারত গো-রক্ষক রাহুল গান্ধী মোদি ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সড়ক পাহারা দিচ্ছে গো-রক্ষকদের একটি দল

ভারতে রাজস্থানের আলোয়াড়ে কথিত গোরক্ষকদের হাতে রাকবর খান নামে এক মুসলিম যুবককে পিটিয়ে মারার ঘটনায় যেভাবে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে ঘন্টার পর ঘন্টা দেরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী।

'এটাই এখন মোদির নৃশংস নতুন ভারত' - বলে টুইটারে মন্তব্য করেন রাহুল গান্ধী।

এরপর তাকেও অবশ্য বিজেপি নেতাদের কাছ থেকে পাল্টা শুনতে হয়েছে - কংগ্রেস 'শকুনের রাজনীতি' করছে ও 'ঘৃণার বেসাতি' করছে।

এভাবে একের পর এক মানুষ পিটিয়ে মারা আর সেই সব ঘটনায় প্রশাসনিক নির্লিপ্ততাকে কেন্দ্র করে দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যে বিরাট তোলপাড় চলছে, তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।

যেমন রাজস্থানের একজন বিজেপি বিধায়ক রাজা সিং। নিজের গোশালায় দাঁড়িয়ে শাসক দলের এই জনপ্রতিনিধি এদিন 'বাইট' দিয়েছেন, "গরু বাঁচাতে গিয়ে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে গেলে মিডিয়া এমন ভাব করে যেন ভূমিকম্প হয়ে গেছে।"

"কিন্তু রাকবর খানের মতো লোকেদের হত্যা কেন হচ্ছে সেটা কেউ ভেবে দেখে না! এখন তো আমরা জানছি তার বিরুদ্ধে আগেও গরু পাচারের অভিযোগ ছিল!"

যে দেশে নির্বাচিত এমএলএ-রা প্রকাশ্যে এভাবে একটা হত্যাকান্ডের হয়ে কার্যত সাফাই দেন, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সেটাকেই আজ বর্ণনা করেছেন 'মোদীর নতুন ভারত' বলে।

জবাবে দেশের অর্থমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল তাকে বলেছেন 'ঘৃণার সওদাগর', আর এক ক্যাবিনেট মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি পরামর্শ দিয়েছেন যার পরিবার চুরাশির শিখ-বিরোধী দাঙ্গা কিংবা ভাগলপুর ও নেলির গণহত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছে তারা এবার 'শকুনের রাজনীতি' বন্ধ করুক।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

কেন ভারতে গো-রক্ষার নামে মানুষ হত্যা বন্ধ হচ্ছেনা?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption রাহুল গান্ধী

এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে যেটা দেখা যাচ্ছে, তা হল রাজস্থান-হরিয়ানা সীমান্তের ওই এলাকায় একের পর এক মুসলিমকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে।

"প্রথমে শুরু হয়েছিল পহেলু খানকে দিয়ে। তারপর জুনেইদ, ওমর আর এখন এই রাকবর খানকে পিটিয়ে মারা হল। এক বছরের মধ্যে এটা ওখানে চার নম্বর এই ধরনের ঘটনা", সদ্য আলোয়াড় থেকে ফিরে বলছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা সালমান রাভি।

তিনি আরও জানাচ্ছেন, হরিয়ানার মেওয়াট অঞ্চলের এই মুসলিমরা মূলত পশু খামারি - গরু-মোষের দুধ বেচেই তারা সংসার চালান এবং রাকবর খানও এক সঙ্গীকে নিয়ে সে কাজেই আলোয়াড় থেকে দুটো গরু আনতে গিয়েছিলেন।

"তারা যখন গরুদুটোকে হাঁটিয়ে নিয়ে রামগড়ের লালওয়ান্ডি জঙ্গল দিয়ে আসছিলেন, তখন মাঝরাতের দিকে সেখানে আগে থেকে বসে থাকা ছ-সাতজনের বাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও ফায়ারিং করতে শুরু করে", বলছিলেন সালমান রাভি।

গত কয়েক বছর ধরেই এভাবে রাস্তায় ওঁত পেতে থেকে কথিত গোরক্ষক বাহিনী খামারিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে বলে একের পর এক অভিযোগ আসছে।

রাজস্থানের কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলটের মতে, একটা সভ্য দেশে এভাবে কিছুতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না।

তিনি বলছেন, "কেউ যদি আইন ভাঙে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে, পুলিশ-প্রশাসন-আদালত আছে। কিন্তু নিছক সন্দেহের বশে একটা লোককে দিনেদুপুরে পিটিয়ে মেরে ফেলাটা যেন রুটিনে পরিণত হয়েছে - আর প্রশাসন পুরোপুরি হাত তুলে নিয়েছে।"

এদিকে গণপিটুনিতে জখম রাকবর খানকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে পুলিশ তাদের গরুগুলোকে গোশালায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে, এমন কী নিজেরা চা খেতে গিয়েও ইচ্ছে করে দেরি করেছে বলে এখন অভিযোগ উঠছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতে গরুর মাংস রাখা বা বিক্রি করা নিয়ে বহু আক্রমণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে মুসলিমদের ওপর

সালমান রাভি বলছিলেন, "আমার কাছে এফআইআরের প্রতিলিপি আছে। তাতে পুলিশ নিজেই লিখেছে, গণপিটুনির খবর পেয়ে তারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছয় তখন রাত ১২টা বেজে ৪১ মিনিট। রাকবর খান অচেতন হয়ে পড়ে থাকলেও তখনও তার দেহে প্রাণ আছে। পুলিশ সেখান থেকে দুজন হামলাকারীকে আটকও করে।"

"তবে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ যখন রাকবর খানকে হাসপাতালে নিয়ে যায় ততক্ষণে ভোর চারটে বেজে গেছে। মাত্র চার কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে যেতে কেন প্রায় চার ঘন্টা লাগল তার কোনও উত্তর নেই। অথচ ওই হাসপাতালের ডাক্তাররাই বলছেন, আরও আগে আনা হলে রাকবর খানকে হয়তো বাঁচানো যেত!"

রাকবর খানকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। রাজস্থান পুলিশ এখন গোটা ঘটনার নিয়মমাফিক তদন্ত করছে।

এদিকে কলকাতায় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি শনিবার এমনও অভিযোগ করেছেন, হিন্দুত্বের নামে বিজেপি এভাবেই সমাজে সহিংসতার বিষ ছড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, "এই যে বিজেপি নিজেদের হিন্দু বলে, এরা কোন হিন্দু? ঘৃণা ছড়ানো হিন্দু না কি তালিবানি হিন্দু?"

"ওরা যা খুশি তাই বললেই হল? আমি তো বলি ওরা হল তরোয়াল হিন্দু, বন্দুক হিন্দু! এর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মকে বিজেপি অসম্মান করছে", গোরক্ষার নামে মানুষ মারার প্রসঙ্গ টেনে সেদিন বলেছিলেন মিস ব্যানার্জি।

বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা অবশ্য বলছেন, ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা হল চুরাশির শিখ-বিরোধী দাঙ্গা।

যে কংগ্রেস সেই কান্ড ঘটিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে অন্তত তারা কোনও 'শান্তির বাণী' শুনতে প্রস্তুত নন, এ কথা তারা বলছেন প্রকাশ্যেই!

বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

হলি আর্টিজান: চার্জশিটে অভিযুক্ত ৮, নেতৃত্বে রোহান

'জিতলে আমি জার্মান, হারলে বিদেশি': ওজিল

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে 'নজিরবিহীন যুদ্ধের' হুঁশিয়ারি

সম্পর্কিত বিষয়