বাংলাদেশে নির্বাচনকে সামনে রেখে বাম দলগুলোর দিকে হাত বাড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ?

সিপিবি সহ আটটি বাম দল নতুন জোট করেছে সম্প্রতি ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সিপিবি সহ আটটি বাম দল নতুন জোট করেছে সম্প্রতি

ঢাকায় হঠাৎ করেই মঙ্গলবার দুপুরে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)কার্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বেশ কিছুক্ষণ কথাও বলেছেন দলটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে। যদিও উভয়পক্ষই বলছেন এটি 'নিছক রাজনৈতিক সৌজন্যতা', 'আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোন বৈঠক নয়'।

তবে এ নিয়েই কৌতূহলী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলগুলো। প্রশ্ন উঠেছে ১৪-দলীয় জোট বা মহাজোটের বাইরে থাকা দলগুলোকে লক্ষ্য করে আলাদা করে কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কি-না ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে।

মি: কাদের অবশ্য সিপিবির বৈঠকের মধ্যে কোন রাজনৈতিক মেরুকরণ থাকাকে উড়িয়ে দিয়েছেন।

নিজেই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে এটা সৌজন্য সাক্ষাতই ছিলো এবং ফোনে সৌজন্য কথা হয়েছে তার সাথে বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকীর সাথেও।

কিন্তু এগুলো কি নিতান্তই সৌজন্য সাক্ষাত বা কথাবার্তা ?

এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলছেন, এর সাথে নির্বাচন বা রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, "বিএনপি নির্বাচনে না আসার ভুল এবার করবে কি-না জানিনা। তবে আমরা চাই একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।"

সেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সিপিবি বা সিপিবির নেতৃত্বে সম্প্রতি যে বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠিত হয়েছে সেই জোটকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে নেয়ার কোনো তৎপরতা শুরু হয়েছে কি-না তা নিয়েও নানা আলোচনা শোনা যাচ্ছে ওবায়দুল কাদেরর সিপিবি অফিসে যাওয়ার পর থেকেই।

তবে জোটের সমন্বয়ক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলছেন, আওয়ামী লীগ তার অবস্থানে থেকে সে চেষ্টা করতেই পারে।

"নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে বেশি দলকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা সরকারি দল করবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের জোট আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কারও সাথেই যাবেনা।"

তিনি বলেন, "নির্বাচন নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিবো পরিস্থিতি আলোকে।"

একই ধরণের কথা বলেছেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

তিনি জানান, ওবায়দুল কাদেরের সাথে তাদের পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন নিয়ে নানা গল্প হয়েছে তাদের কার্যালয়ে।

রাজনীতি, নির্বাচন কিংবা জোট মহাজোট নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমরা তো বিরোধী জোট। আমরা বর্তমান দু:শাসনের অবসান চাই, পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপির দু:শাসন আসুক সেটাও চাইনা।"

আরো পড়ুন:

দিল্লিতে এরশাদ: ভারতের কাছে তার গুরুত্ব কী

তৃণমূলের পার্টি অফিসের ভেতরে কালীমন্দির কেন?

অভিযোগ, পাল্টা-অভিযোগে সরগরম রাজশাহী

ছবির কপিরাইট FACEBOOK
Image caption দলীয় সভানেত্রীর সাথে ওবায়দুল কাদের। তার সিপিবি অফিসে যাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে

তারপরেও বাম দল বা জোট নিয়ে এতো আলোচনা কেন?

আওয়ামী লীগের সাথে বাম দলের ইস্যুভিত্তিক ঐক্য বা জোট নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বামপন্থী দলের সাথে ঐক্য করেছে দলটি । এমনকি বর্তমান সরকারেও আছেন বামপন্থী কয়েকজন নেতা ও দল।

এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ বা সিপিবি যাই বলুক আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের জোটকে আরও সম্প্রসারণ করতে চায় আওয়ামী লীগ।

তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটে কাউকে নেয়া হলে সেটি হবে জোটের শরীকের মতামতের ভিত্তিতেই বা যথেষ্ট যাচাই বাছাই করেই।

যাদের ১৪-দলীয় জোটে নেয়া হবেনা তাদের মহাজোটে নেয়া হবে যাতে করে ১৪ দলীয় জোটও অক্ষুণ্ণ থাকে আবার মহাজোটের আকারও বাড়ানো যায়।

এখন ওবায়দুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন নেতা সিপিবির নেতৃত্বে সম্প্রতি যে জোট গঠন হয়েছে তাদের নেতাদের সাথে একটি সুসম্পর্ক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন ওই একই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই।

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দৃঢ়তার সাথেই বলছেন আওয়ামী লীগের সাথে কোনো জোট করার চিন্তাই তাদের নেই, বরং কার্যকর বিরোধী দল হিসেবেই ভূমিকা পালন করে যাবেন তারা।

কারা আছে সিপিবি জোটে?

গত ১৮ই জুলাই আত্মপ্রকাশ করা নতুন বাম গণতান্ত্রিক জোট নামে যে জোট আত্মপ্রকাশ করেছেন তাতে আছে আটটি রাজনৈতিক দল, যার সবগুলো বামপন্থী ঘরানার দল হিসেবেই পরিচিত। জোটে আছে - সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন ও বাসদ (মার্ক্সবাদী। এর মধ্যে কয়েকটি দলের আগেও আওয়ামী লীগের সাথে একসাথে আন্দোলন ও নির্বাচন করার অভিজ্ঞতাও আছে।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেয়নি সিপিবি। ওই নির্বাচনটি বর্জন করেছিলো বিএনপি তার সমমনা দলগুলো।

এবারও যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয় সেক্ষেত্রে এসব দলকে নির্বাচনে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও সিপিবি সভাপতি বলছেন তারা এবারও দরকার হলে ভোট করবেন, আবার দরকার হলে ভোট বর্জন করবেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption নানা ইস্যুতে সক্রিয় থাকলেও বাংলাদেশে বাম দলগুলোর ভোট ও প্রভাব দুটোই অনেক কমেছে। তারপরেও বিএনপি নির্বাচনে না এলে এসব দলেরও গুরুত্ব বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে

বাংলাদেশে বাম দলগুলোর শক্তি আসলে কতটা ?

সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা রাশেদ খান মেননসহ আরও কয়েকজন। নৌকা প্রতীক না পেলে তাদের জয়ের সম্ভাবনা সামনে কতটুকু আছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ পেয়েছিলো বামপন্থীরা। পরের নির্বাচনগুলোতে তা আরও কমে আসে।

নিজেদের মধ্যে অতিমাত্রায় বিরোধ, সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ নানা কারণে বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব এখন আর তেমন একটা নেই।

নির্বাচন কমিশনে বামপন্থী বলে পরিচিত এমন নিবন্ধিত দল আছে দশটি আর এর বাইরে নাম শোনা যায় আরও অন্তত পনেরটি দলের।

আবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটে আছে দশটির মতো দল যারা বাম ঘরানার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটেও আছে দুটি বাম ঘরানার দল।

এসবের বাইরে এখন বাম ঘরানার দুটি জোট সক্রিয়- একটি সম্প্রতি গঠিত হওয়া বাম গণতান্ত্রিক জোট আর আরেকটি হলে জাতীয় মুক্তি জোট যাতে আছে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণ ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে সরকারের বাইরে থাকা বাম দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

কিন্তু এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নে এসে শেষ পর্যন্ত ছোটো খাটো সব দল বা জোটেরই নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে মনে করা হচ্ছে, বিশেষ করে কোনো কারণে যদি বিএনপি এবারও নির্বাচনে অংশ না নেয়।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাইফুল হক বলছেন এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা তারা মোটেও উড়িয়ে দিচ্ছেননা, যদিও তারা এখন এসব নিয়ে ভাবতে রাজী নন বলেই বলছেন তিনি।

যদিও আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির কয়েকজন নেতার মতে বাম ঘরানার অধিকাংশ দলের সাথেই যোগাযোগ শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশেই, যাতে করে সব দলের নির্বাচনে আসার একটা আবহ আগেই তৈরি করা যায়।

আর এসব কারণেই সৌজন্য সাক্ষাত বলা হলেও হঠাৎ করে ওবায়দুল কাদেরের সিপিবি অফিসে যাওয়া এবং অন্য বাম নেতাদের সাথে সাক্ষাত বা ফোনে কথা বলার ঘটনা নিয়ে নানা হিসেব নিকেশ চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর