ভারতের আসাম থেকে ৪০ লাখ অবৈধ বিদেশি এখন কোথায় যাবে?

এরকম ৪০ লাখ মানুষের নাগরিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়। ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption এরকম ৪০ লাখ মানুষের নাগরিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে জাতীয় নাগরিক তালিকার চূড়ান্ত খসড়া থেকে ৪০ লক্ষ লোকের নাম বাদ পড়ার পর তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

কেন্দ্রীয় সরকার যদিও মুখে বলছে, এখনই তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তারা আপিল করার যথেষ্ট সুযোগ পাবেন - মমতা ব্যানার্জির মতো আসামের প্রতিবেশী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মতো অনেকেরই আশঙ্কা যে আসামে অত্যাচারের মুখে পড়ে এই লক্ষ লক্ষ মানুষ পালাতে বাধ্য হবেন।

ভারতে পর্যবেক্ষকরাও মনে করছেন, এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা সম্ভব নয় - আর তাদের কাউকেই বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোও যাবে না।

এই পরিস্থিতিতে রাতারাতি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করছে?

আসলে আসামে নাগরিক তালিকা বা এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে চল্লিশ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ল, তারা স্বাধীন ভারতে এখন কীভাবে থাকবেন তার কোন স্পষ্ট উত্তর নেই।

পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তাদের শুধু এটুকু আশ্বাস দিয়েছেন, এখনই অত ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, "কেউ কেউ অযথা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন - অপপ্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই ভয়ের কোন কারণ নেই!"

"কেউ যদি ঠিকমতো কাগজপত্র না-দিতে পারেন তারা আবার সেই সুযোগ পাবেন, এমন কী চূড়ান্ত তালিকাতে নাম না-থাকলেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে যেতে পারবেন। আর এর মাঝে তাদের ভয়-ভীতি দেখানোর কোনও প্রশ্নই ওঠে না।"

আসাম লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি - যার দল আজ এই ইস্যুতে পার্লামেন্টও অচল করে দিয়েছে - তিনি কিন্তু আশঙ্কা করছেন, আসাম থেকে এবার এই মানুষগুলোকে বিতাড়নের চেষ্টা হবে।

Image caption অনেকেই বলছেন, এটি নৈরাজ্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্র।

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশীদের ঠেকানোর ডাক নাগাল্যান্ডের নেতার

আসামে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ ৪০ লাখ মানুষ

কলকাতায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, "তাদের ওপর যে কী অত্যাচার চলবে, আর কী হবে আমরা জানি না। কিন্তু সেটা ভেবেই আমরা খুব বিচলিত। আসলে দেশে থেকে যারা আজ দেশেই রিফিউজি হয়ে গেল, তারা তো আমাদেরই ভাইবোন - তাই আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।"

"এটা আসলে বাঙালি খেদাও চলছে। আর শুধু বাংলাভাষীরাই বা কেন, বিহারি খেদাও-ও চলছে। আর এতে সবচেয়ে বিপদে পড়বে বাংলাদেশও। কারণ পুশব্যাক যদি করতে চায়, আর বাংলাদেশ তাদের নিতে না চায়, তাহলে এই লোকগুলো যাবে কোথায়?"

মিস ব্যানার্জি তার সঙ্গে আরো যোগ করেছেন, "এত বড় একটা জিনিস করার আগে সরকার কি একবারও ভেবেছে এই চল্লিশ লক্ষ লোক কোথায় যাবে?"

সরকার যে আসলেই খুব একটা কিছু ভাবেনি, মোটামুটি সেই একই ধারণা পোষণ করেন দিল্লির ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের ফেলো পুষ্পিতা দাসও।

ড: দাস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "এখনও অবধি সরকারি নীতি খুবই অস্পষ্ট - আমরা বিশেষ কিছু জানি না, এমন কী সরকার কী করবে নিজেও জানে কি না সন্দেহ! তাদের প্রস্তুতি বলতে এটুকুই যে এই লোকগুলোকে হয়তো ডিটেনশন সেন্টারে আটক করা হবে।"

"কিন্তু মুশকিল হল - এত লক্ষ লক্ষ লোককে সেন্টারে আটক রাখা সম্ভবই নয়। কেন্দ্র যদিও মুখে বলে যাচ্ছে আমরা ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করতে আসামকে টাকা দিয়েছি, রাজ্য সরকার বানাবে ইত্যাদি ইত্যাদি - কিন্তু বাস্তবতা হল এত বিপুল সংখ্যক লোককে আপনি কীভাবে সেন্টারগুলোতে রাখবেন?"

আসামে যারা এনআরসি তালিকাভুক্ত হতে পারছেন না, তাদের সাধারণভাবে অবৈধ বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাংলাদেশে তাদের ফেরত পাঠানোর যে কোন সম্ভাবনাই নেই, সেটাও স্পষ্ট করে দিচ্ছেন ড: দাস।

"বাংলাদেশ পরিষ্কার বলে দিয়েছে এরা তাদের লোক নয় - তারা নিতেও পারবেন না। অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে ভারত সরকারও বন্ধু-প্রতিম বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছে এনআরসি নিয়ে তারা এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের সমস্যা হয়। ফলে আমরা ডিপোর্ট করতে পারব না - এটাই পরিষ্কার কথা!" বলেন তিনি।

"সুতরাং আমার মনে হয় খুব সম্ভবত প্রথমে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তারপর ধীরে ধীরে যেভাবে ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে পরে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এদের ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। দশ-বারো বছর হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু পরে এরা অ্যামনেস্টি বা সাধারণ ক্ষমা পেয়ে ভারতের নাগরিক হয়ে যাবেন।"

"আবার এটাও হতে পারে যে তাদের ধীরে ধীরে আসাম থেকে সরিয়ে অন্য সব রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হল, যাতে এই সমস্যার চাপটা একা আসামকে সামলাতে না হয়," বলছিলেন দিল্লির নামী থিঙ্কট্যাঙ্কের গবেষক পুষ্পিতা দাস।

Image caption নাগরিকত্বের এই প্রশ্নটি আসামের মানুষদের জন্যে বহুদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ।

তবে এগুলো সবই সম্ভাবনা মাত্র - আর তার বাস্তবায়নে অনেক সময়ও লাগবে।

কিন্তু এই মুহূর্তে আসামে যাতে কোনও দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়িয়ে না পড়ে, রাজ্য সরকারের প্রধান দুশ্চিন্তা সেটাই।

মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল তালিকা প্রকাশের পর পরই জানান, আসাম তার শান্তি ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য এখনও বজায় রাখবে বলেই তিনি আশাবাদী।

"পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকাই আমরা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। তারা যেভাবে যেভাবে বলবেন, আমরাও সেই অনুযায়ী চলব," বলেছেন তিনি।

আসামে এনআরসি তৈরির উদ্যোগ যে তাদের নয় - বরং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই - কেন্দ্রের ও আসামের বিজেপি সরকার সে কথা বারেবারেই বলেছে।

তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের নিয়ে কী করা হবে, সে ব্যাপারেও যে তারা এখন শীর্ষ আদালতের কাঁধেই বন্দুক রাখতে চাইছেন সেটা পরিষ্কার।

বিবিসি বাংলার আরো খবর:

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
রাজশাহীতে প্রতিবাদ জানিয়ে কেন্দ্রে অবস্থান বিএনপি মেয়র প্রার্থীর

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর