বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে যা আছে

ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কথা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কথা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইনের একটি খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

আগামী সংসদ অধিবেশনে এই আইন পাশ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এই আইন পাশ হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের প্রতি ইঙ্গিত করে মি: কাদের বলেন, "তাদের যে দাবিগুলো, সেসব দাবির সমাধান এ সড়ক পরিবহন আইনের মধ্যে আছে। এই যে রাস্তায় পাখির মতো, মাছির মতো মানুষ মরার প্রবণতা এটার উপর একটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ হবে।"

তবে সড়ক পরিবহন আইনে কী আছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি মি: কাদের।

আইনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো:

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের বিশৃঙ্খল চলাচল

গত বছরের মার্চ মাসে সড়ক পরিবহন আইনটির খসড়া অনুমোদন করেছিল মন্ত্রীসভা।

এরপর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য।

দীর্ঘ ১৪ মাস পরে ছাত্র বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে আইন মন্ত্রণালয় সেটির ভেটিং শেষ করেছে।

মন্ত্রীসভায় যখন আইনটির খসড়া অনুমোদন করা হয়েছিল তখন মন্ত্রীপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের যে বিষয়গুলো জানিয়েছিলেন তার কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো।

১. প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্সে পেতে হলে অষ্টম শ্রেনি পাশ করতে হবে। আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন প্রয়োজন ছিল না।

২. চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে।

৩. গাড়ি চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। অবশ্য একই বিধান আগেও ছিল।

৪. গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

৪. চালকদের পয়েন্ট কাটার বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট বিয়োগ হবে এবং এক পর্যায়ে লাইসেন্স বাতিল হবে।

৫. ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

৬. গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে প্রস্তাবিত আইনে।

৭. বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণে কিংবা প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর কারণে মৃত্যু ঘটালে তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

৮. নতুন আইনে সড়কে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো বা রেস করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানারও বিধান রাখা হয়েছে।

৯. আইনে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকার জরিমানা হতে পারে এবং এক্ষেত্রে পরোয়ানা ছাড়াই চালককে গ্রেপ্তারও করা যাবে।

১০. লাইসেন্স-বিহীন গাড়ি চালানোসহ নানা অপরাধে এই আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও, দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যু বা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার ফৌজদারি আইনেই হবে।

আরো পড়ুন:

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র বিক্ষোভে অচল ঢাকা

সব দাবী মেনে নিয়েছি, শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাপটে যাত্রীরা অসহায়

'চালকদের নিয়ে আইন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কম ভূমিকা রাখবে'

এ আইনে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে?

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন এ আইনে সড়কের শৃঙ্খলা ফিরবে না।

"গণ-পরিবহনে কোন আইন দরকার নাই। এটা একটা পরিকল্পনা। বিজ্ঞান বলে পরিকল্পনাটা এমন হতে হবে যাতে সেটি হয় স্ব-নিয়ন্ত্রিত এবং বেশিরভাগই মানতে বাধ্য হবে। এবং বাকি কেউ যদি অপরচুনিস্ট (সুযোগ সন্ধানী) হয়, তাহলে আইন দিয়ে তাকে শাসন করতে হবে।"

অধ্যাপক হক বলেন, পরিকল্পনাতেই আসল 'গলদ' রয়েছে। তিনি বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার জন্য আইন প্রণয়নের চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদল বেশি প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বর্তমান সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা 'বিশৃঙ্খল এবং উচ্ছৃঙ্খল' অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

"আগে গুলশান এলাকায় ১১-১২টি পরিবহন কোম্পানি সেবা দিত। আমাদের প্রয়াত মেয়র ঢাকা চাকা নামে একটা পরিবহন কোম্পানি চালু করে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে চালকরা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে, যাত্রীর দিকে তাকায় না। এবং সুশৃঙ্খলভাবে সেটি চলে।"

তিনি বলেন, গণ-পরিবহন নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে শুধু আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমস্যার কোন সমাধান হবে।

অধ্যাপক হক প্রশ্ন তোলেন, "গণ-পরিবহনের সিস্টেমটা এতো বেশি অপরিকল্পিত যে এখানে হান্ড্রেট পার্সেন্ট যদি ভুল থাকে, তাহলে আপনি শাসন করে কতটুকু উন্নতি করতে পারবেন?"

তিনি বলেন সমগ্র ঢাকার বাসগুলোকে যদি একটি কোম্পানির আওতায় আনা যায় তাহলে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব বন্ধ হবে।

পরীক্ষামূলক-ভাবে এ পদ্ধতি গুলশান এবং হাতিরঝিল এলাকায় সফল হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ ব্যবস্থা ঢাকা শহরে যেদিন থেকে চালু হবে ঠিক তার পরদিনই শহরের রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে অধ্যাপক হক বলেন।

এজন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন: কে কীভাবে দেখছেন?

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর