"আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না": বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল

  • সানজানা চৌধুরী
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রতি প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপন ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ছবির উৎস, BTV

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রতি প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপন ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রতি প্রচারিত একটি সরকারি প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞাপনটির একটি জায়গায় বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমানে কোন ফকির মিসকিন নেই।

বিজ্ঞাপনের শুরুতেই দেখা যায় হামিদ নামে এক ব্যক্তি গ্রামের রাস্তা দিয়ে প্রাণপণে ছুটছেন। এবং তাকে হৈ হৈ করে তাড়া করছেন গ্রামের একদল নারী পুরুষ।

সেই গ্রামেরই এক প্রবীণ ব্যক্তি দুই পক্ষের পথরোধ করে এই তাড়া করার কারণ জানতে চান।

এসময় এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, গ্রামের আরেক ব্যক্তি জহির তার প্রয়াত বাবা মায়ের স্মরণে ফকির মিসকিন খাওয়াতে চান। এজন্য তিনি হামিদকে পাঠিয়েছেন তাদেরকে দাওয়াত করতে। এতে তারা অপমানিত হয়েছেন।

"আমরা কি ফকির মিসকিন নাকি?" পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ওই নারী।

পরে ভিড় থেকে আরেক ব্যক্তি জানান, তারা আগে ফকির মিসকিন থাকলেও এখন আর নেই। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষ।

সরকার তাদের ঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ, জায়গা জমি, পুকুর দেয়ার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া সেইসঙ্গে উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে জানান তারা।

সেখানে একটি সংলাপ ছিল যে, "আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না।"

সবশেষ তারা জানান, "এইদেশে ফকির মিসকিন খুঁজতে আহে। বাংলাদেশ আর সেই দেশ নাই।"

তথ্য মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন বিজ্ঞাপনটি প্রচার করে।

এটি মূলত সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে একটি উন্নয়ন মূলক বিজ্ঞাপন।

যেখানে বলা হয়েছে যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে এরইমধ্যে আড়াই লাখ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আরও এক লাখ পরিবারের পুনর্বাসনের কার্যক্রম চলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া:

বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু নিয়ে এরইমধ্যে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

অনেকে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করতেও বাদ রাখেননি।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিজস্ব ফেসবুক পেইজে গিয়ে দেখা যায় ভিডিওটি গত বৃহস্পতিবার আপলোড করা হয়েছে।

এবং এরইমধ্যে এর ভিউয়ার সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেয়ার হয়েছে সাত হাজার বার। এছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে এই বিজ্ঞাপনটি নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকেও আপলোড করেছেন।

এছাড়া কমেন্ট পড়েছে এক হাজারেরও বেশি। তবে বেশিরভাগ কমেন্টেই এই বিজ্ঞাপনের দাবির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন ইউজাররা।

আরও পড়তে পারেন:

এ ব্যাপারে রাফিউল ইসলাম তার কমেন্টে বলেন "বাংলাদেশে ফকির মিসকিন নাই তাহলে কুরবানির চামড়ার টাকা দিলাম কাকে? ফকির মিসকিনের অংশটা নিলো কারা?"

মারলিন নামে এক ইউজার বলেন, "নাই তো একেবারেই নাই, তাই তো ইফতারি নিতে গিয়ে চাপা পড়ে মরে, মাংস নিতে লাইন দিয়ে মারামারি করে মরে।"

ছবির উৎস, বিটিভির ফেসবুক পাতা থেকে

ছবির ক্যাপশান,

বিটিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে নানা ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ফেসবুক ইউজাররা।

তাহমিদুল ইসলাম লিখেছেন, "আজকে মসজিদের সামনে যাদের দেখলাম. তারা কারা? আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ভিক্ষা করতে আসছে?"

মোহাম্মদ মুন্না এমএন প্রশ্ন তুলেছেন এসব প্রকল্প পরিচালনার ওপর।

তিনি বলেন, "তথ্য মন্ত্রণালয় এটা কেমন ভিডিও তৈরি করলো, যার কোন সার্থকতা নেই। সরকার ফকির মিসকিন দূর করার জন্য কাজের প্রকল্প হাতে নিলেও তা সঠিকভাবে পরিচালিত হয়না বলে এখনও হাজার হাজার ফকির মিসকিন আছে।"

এছাড়া অনেককেই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যায়, তাদের একজন হলেন, মোরশেদ আলম।

তিনি জানান, "সাইকেল চালাচ্ছিলাম, ভিডিওটা দেখে খাদে পড়ে গেলাম। উদ্ধারকারীরা আমাকে উদ্ধার করতে এসে ভিডিওটা দেখল। তারাও হাসতে হাসতে খাদে পড়ে গেল।"

ছবির উৎস, বিটিভির ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া

ছবির ক্যাপশান,

বিটিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে নানা ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ফেসবুক ইউজাররা।

সাইদুল ইসলাম নীরব লিখেছেন, "ভিডিওটা দেখে আমি বেহুশ হয়ে ছিলাম দুই ঘণ্টা। পরে অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা হাতে একটি হাহা বিয়্যাক্ট দিলাম। এখন আমি আগের চাইতে অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।"

আশিকুর রহমান ইমনের লেখা কমেন্টটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, "বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় বিটিভিকে আবারও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। অনেকদিন পর আমার মনেহল আমি আবার ছোটবেলার আলিফ লায়লা দেখছি। ধন্যবাদ।"

দেশে ফকির মিসকিন নেই এই দাবির পক্ষে দ্বিমত পোষণ করলেও দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য শুভকামনা জানাতে দেখা যায় কয়েকজনকে। তাদেরই একজন, মানজুর ই খোদা।

তার ইংরেজিতে লেখা কমেন্টটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, "ইনশাল্লাহ খুব শিগগিরই এমন একটা সময় আসবে যেদিন আমাদের দেশ ফকির মিসকিনমুক্ত হবে। তবে দুর্ভাগ্যবশত আমার দেশে এখনও অনেক ফকির রয়েছে। যেকোনো জুম্মার দিন ঢাকার যেকোনো মসজিদের সামনে মানুষ প্রতিদিন এমন অনেককে দেখতে পান। আশা করি সরকার তাদের সবার পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। দারিদ্র দূরীকরণে সরকার যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এজন্য তাদের শুভকামনা।"

ছবির উৎস, বিটিভির ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া

ছবির ক্যাপশান,

বিটিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে নানা ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ফেসবুক ইউজাররা।

এই কমেন্টের জবাবে এহসানুর রহমান জনগণের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তিনি লিখেছেন, "আমি আপনার সঙ্গে একমত। বাংলাদেশের বয়স ৪৭ বছর। এখন দেশের মানুষকে সুযোগ সুবিধা দেয়ার সময় এসেছে। স্বাধীনতার পর পর ১৯৮০ সালে সরকারের উচিত ছিল স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করা। এখন সময় এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। হ্যাঁ, এটা আমাদের দেশ, জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে এবং সরকারকে সাহায্য করতে আমাদের সবার চেষ্টা করতে হবে।"

তবে বিজ্ঞাপনটির দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাদেরই একজন জুলফিকার হাসান পিয়াস।

তিনি বলেন, "দেশের অর্থনীতি কতোটা এগিয়ে গেছে তা অর্থনীতি বোঝেন বা অর্থনীতি বিষয়ে সামান্য জ্ঞান আছে অথবা নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা চিন্তা থেকে যেকোনো সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পারেন। অথচ আমাদের দ্বিধাবিভক্ত সমাজ সেখানেও খুঁজে পেয়েছে হাসির খোরাক। দু:জনক ছাড়া আর কিছুই নয়।"

ছবির উৎস, বিটিভির ফেসবুক পাতা থেকে

ছবির ক্যাপশান,

বিটিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে নানা ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ফেসবুক ইউজাররা।

এই বিজ্ঞাপনের প্রচার ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশের টেলিভিশনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুনুর রশিদ জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনটি প্রচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এর পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।

বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু বাস্তবতাকে সমর্থন করে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে এবিষয়ে তারা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।