পোশাকখাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির কী প্রভাব পড়বে পোশাকশিল্পে?

নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয় বলে বলছেন শ্রমিক সংগঠনগুলো ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয় বলে বলছেন শ্রমিক সংগঠনগুলো

বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫০ শতাংশেরও বেশী পরিমাণে বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের মজুরি বোর্ড।

এই কাঠামো কার্যকর হলে সব ধরণের সুযোগ সুবিধাসহ শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হবে ৮হাজার টাকা, যেখানে শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি করেছিল ১৬ হাজার টাকা। শ্রমিকদের সংগঠনগুলো তাই স্বাভাবিকভাবেই বোর্ডের এই সিদ্ধান্তে অখুশী।

বাংলাদেশের একটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা মোশরেফা মিশু বলছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তুলনা করলে অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি যথেষ্ট কম।

মিজ. মিশু বলেন, "মূদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার মানের মত বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমরা সুপারিশ করেছিলাম মূল বেতন অন্তত ১০ হাজার টাকা করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এসব বিবেচনা করেই মজুরি ঠিক করা হয়। কিন্তু এবারে মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শ্রমিকদের দিকটা বিবেচনা করা হয়নি।"

ন্যূনতম মজুরির অঙ্ক নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন আরেকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা নাজমা আক্তারও। কিন্তু যদি এই প্রস্তাবিত কাঠামোই চূড়ান্ত রাখা হয় তাহলে শ্রমিকদের জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকারের আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মিজ. আকতার।

তিনি জানান এর আগে যতবারই শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়েছে, প্রতিবারই তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে মালিকদের পক্ষ থেকে।

মিজ. আক্তার বলেন, "প্রতিবারই দেখা যায় মজুরি বাড়ানো হলে শ্রমিকদের ওপর বেশী পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করার লক্ষ্য চাপিয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

গার্মেন্টস শিল্পে ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা

শ্রমিকরা চান ১২ হাজার, মালিকরা দিতে চান এর অর্ধেক

পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ কি কমেছে?

Image caption অর্থনীতিবিদরা বলছেন মজুরি বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টিকে থাকবে

তবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস মালিক সমিতির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের মতে মজুরি বৃদ্ধির হার আরো কম হওয়া উচিত ছিল।

মি. রহমান বলেন - সরকার, শ্রমিক ও ক্রেতাসহ সব পক্ষ সহায়তা না করলে অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

"সরকার কারখানা মালিকদের আর্থিক সহায়তা না দিলে, ক্রেতারা বর্ধিত দামে পণ্য না কিনলে আর শ্রমিকরা উৎপাদনশীলতা না বাড়ালে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে"- বলেন মি. রহমান।

অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য: মজুরি বৃদ্ধি কতটা বাস্তবসম্মত?

গার্মেন্টস মালিকরা মজুরি বৃদ্ধির সমালোচনা করলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মত অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন ন্যূনতম মজুরি আরো বেশী বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ছিল।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ও এই খাতের সাথে জড়িতদের জীবনযাত্রা নিয়ে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ, সিপিডি'র অর্থনীতিবিদদের পরিচালিত এক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে শ্রমিকদের মাসিক বেতন ১০ হাজারের বেশি করার সুপারিশ করা হয়।

সিপিডি'র অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মজুরি বাড়ানোর ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টিকে থাকবে।

মি. মোয়াজ্জেম বলেন, "মজুরি বাড়লেই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নষ্ট হবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।"

মি. মোয়াজ্জেম জানান - তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকখাতের কর্মীদের উৎপাদনশীলতা প্রতিবছর যে হারে বেড়েছে সে হারে মজুরি বৃদ্ধি করা হয়নি। কাজেই মজুরি বাড়লে প্রবৃদ্ধিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পরবে না।

এছাড়া মজুরি বাড়লে যে বাড়তি অর্থ শ্রমিকরা হাতে পায়, তা তাদের ও তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পেছনেই ব্যয় হয়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মজুরি বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে দেশের শ্রমশক্তিকে তৈরি করে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা

"মজুরি বৃদ্ধি প্রকারান্তরে আসলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শ্রমশক্তিকে তৈরি করে।"

শিল্পক্ষেত্রে বাংলাদেশে বহুমুখী পণ্যের বাজার তৈরি না হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ নিয়মিত সুষ্ঠুভাবে মজুরি বৃদ্ধি না হওয়া অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মন্তব্য করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

"উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন, নতুন পণ্য উৎপাদন করার বিষয়ে যে চাপ তৈরী হওয়ার কথা, নিয়মিত মজুরি বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে সেই চাপ তৈরি হয় না", বলেন মি. মোয়াজ্জেম।

এর কারণে উদ্যোক্তারা পুরোনো পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত হয়ে যান এবং পণ্যের উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

"বাংলাদেশে শিল্পায়নে বহুমুখীকরণ না হওয়ার অন্যতম কারণ ন্যূনতম মজুরি কম হারে বৃদ্ধি পাওয়া।"

পূর্ববর্তী মজুরি কাঠামোর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলে জানুয়ারি থেকে বর্তমান প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর:

শুধু আনন্দের জন্য যৌনমিলনের বিরোধী ছিলেন গান্ধী

'পদ্মার ভাঙন: পূর্বাভাস ছিল কিন্তু করা হয়নি কিছুই'

সম্পর্কিত বিষয়

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর