গ্রাম বাংলার বিজয়িনী: 'কত সাপ ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেই'

শ্রীলা মজুমদার ছবির কপিরাইট শ্রীলা মজুমদার

ভারতের এখন সবচেয়ে নতুন গর্বের বিষয় হলো নৌ-বাহিনীর ছয়জন মহিলা অফিসার তারিণী নামক পালতোলা জাহাজ ভাসিয়ে প্রায় সারা বিশ্ব ভ্রমণ করলো। তাদের পেছনে ছিল পরমাণু শক্তিধর দেশ ভারত।

পালতোলা জাহাজে কোন ইঞ্জিন থাকে না কিন্তু ব্যাকআপ হিসাবে ঐ জাহাজে ইঞ্জিন ছিল, যাতে বিপদে পড়লে তারা ইঞ্জিনের সাহায্য নিতে পারে। সাথে স্যাটেলাইট ফোন ছিল, ইন্টারনেট ছিল, এমনকি ওরা ওয়াটসঅ্যাপ করছিল, সাথে ছিল লাইফ বোট।

ওরা মাঝে মধ্যে যে বিপদে পড়েনি তা নয়, কিন্তু এতগুলো রক্ষা কবচ ছিল যে কোন বিপদই ওদের ছুঁতে পারেনি।

ওরা গোয়া থেকে যাত্রা শুরু করে এবং নিরাপদে গোয়ায় ফিরে আসে। তারপর এই বিজয়িনীদের নিয়ে শুরু হয় সম্বর্ধনার পালা।

মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রতিটি খবরের কাগজের শিরোনামে এদের ছবি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ছয়জন জলকন্যাকে অভিনন্দন জানান।

ছবির কপিরাইট Hindustan Times
Image caption লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রতিভা জামওয়াল: পালতোলা জাহাজ তারিণী করে ভারতীয় নৌ-বাহিনীর যে ছয়জন মহিলা অফিসার বিশ্ব ভ্রমণ করলেন, তাদের একজন।

এবার আপনাদেরকে বাংলার এক জলকন্যার গল্প বলি।

একবার আমি এবং অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটা যাত্রা পালায় অভিনয় করেছিলাম। সারা পশ্চিম বাংলায় এমন কোন জায়গা ছিল না যেখানে আমরা শো করিনি। সেবার আমরা দক্ষিণ-চব্বিশ পরগণায় প্রচুর শো করি। ঐ অঞ্চলে শো থাকলে অনেক আগে বাড়ি থেকে বেরুতে হয় কারণ সড়ক পথে যাবার পর খানিকটা জলপথে যেতে হয়।

ধরুন নামখানা ৮ নং ঘাট পর্যন্ত গাড়ি গেল বা কাকদ্বীপ পর্যন্ত গাড়ি গেল বা ধরুন এইরকম আরও কিছু পয়েন্ট পর্যন্ত গাড়ি যায় তারপর বড় বড় সব নদী। তখন ভুটভুটি চেপে যেখানে যেখানে শো আছে সেখানে যেতে হয়।

এরকমই একটা শো'তে গেছি, তখন তিনটে বাজে। আমাদের একটি বাড়িতে বসতে দিয়েছে কমিটির কর্মকর্তারা। আমাদের দেখেই বাড়ির মেয়ে বৌ'রা কেউ মুড়ি মাখতে বসলো, কেউ চা বসিয়ে দিল।

একজন তো জাল নিয়ে ছুটলো নদীতে মাছ ধরতে। কিছুক্ষণ পরে সে বেশকিছু ছোট মাছ নিয়ে ফিরল। তৎক্ষণাৎ সেই মাছ কেটে ভাজা করে মুড়ির সঙ্গে আমাদের পরিবেশন করলো।

আমি বৌ'টিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, "কতটা জলে নামলে?"

ও বললো , 'হাঁটু জল, তবে এত পাঁক যে কোমর পর্যন্ত ডুবে যায়!"

আমি বললাম, "তোমার সাপের ভয় নেই?"

ও বললো- "কত সাপ তো পায়ে জড়িয়ে ধরে। ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেই।"

বললাম, "এত সাহস তোমার?"

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption বন্যার সাথে লড়াই: গ্রাম বাংলার নারীরা তারিণীর ইউনিফর্ম পরা মহিলাদের থেকে কোন অংশে কম না।

আমার কথা শুনে এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বললো- "প্রাণ বাঁচাতে এখানকার মানুষ যে কী করে আপনাদের কোন ধারণা নেই! আমাদের এই গ্রামের মেয়ে ফুলি কয়েকটা গ্রাম পরে তার বিয়ে হয়েছে, বর্ষাকাল, সারারাত ধরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়েছে, ভোরবেলা ফুলি টের পেল নদী ভেসে জল উঠোন ছাপিয়ে ঘরে ঢুকছে। বাড়ির মানুষ যে যার মত প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ গাছে উঠে পড়েছে। ঘরে শুধু ফুলি আর তার ছোট বাচ্চা।

সে তখন পুরুষের মত কাছা দিয়ে শাড়ি পরে, ঘাড়ের ওপর উপরে বাচ্চাকে ভালো করে গামছা দিয়ে বেঁধে সাঁতার কাটতে শুরু করে। সাঁতার কাটতে কাটতে বিদ্যাধরী নদী পার করে ডাঙায় উঠে। নদীতে কত সাপ, কত কুমীর সব ভয় উপেক্ষা করে ফুলি নিজে ও তার বাচ্চার প্রাণ বাঁচায়।

এই বিজয়িনী গল্প শোনার পর তাকে কি আপনারা একবারও কুর্ণিশ করবেন না? আমার তো মনে হয় ফুলির ঐ কৃতিত্ব ঐ ইউনিফর্ম পরা নৌ-বাহিনীর মহিলা অফিসারদের থেকে কোন অংশে কম নয়, বরং বেশি।

যেমন তারিনীর মহিলাদের নিয়ে দেশে এত নাচানাচি হচ্ছে তেমনি বায়ু সেনাতে (ভারতীয় বিমান বাহিনী) মহিলাদের অগ্রগতির প্রশংসাও খবরের শিরোনামে। আগে শুধু পুরুষরা ফাইটার পাইলট হতো। এখন মহিলারাও ফাইটার পাইলট হচ্ছে।

যদি যুদ্ধ বাধে তবে ঐ মহিলা ফাইটার পাইলট শত্রু দেশে বোমা মেরে আসবে। অনেকেই মনে করছেন যে এই মহিলারা পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এই মহিলা ফাইটার পাইলটরা কি সত্যি নারী শক্তির প্রতীক?

লক্ষ্মীমণি হেব্রম

এবার আমি অন্য এক মহিলার গল্প শোনাই।

ঝাড়গ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, 'বেলপাহাড়ি'। পাঠশালায় পড়াশোনা চলছে। ভেতরে বাচ্চারা নামতা পড়ছে- দুই এক্কে দুই, দুই দুগুণে চার, তিন দুগুণে ছয়...।

বাচ্চারা এক সময় থেমে যায়। কিন্তু বাইরে থেকে একটি মেয়ের আওয়াজ আসে চার দুগুণে আট, পাঁচ দুগুণে দশ... আওয়াজ শুনে মাস্টারমশাই বাইরে এসে দেখে জানালার ধারে একটি মেয়ে মন দিয়ে নামতা পড়ছে।

মাস্টারমশাই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো, তুই এখানে কি করছিস। মেয়েটি বললো আমি রোজ এখানে ছাগল চরাতে আসি। ছাগলগুলো মাঠে চরাতে দিয়ে এখানে বসে পড়াশোনা করি। আমার খুব পড়ার ইচ্ছে, কিন্তু বাবা বলে মেয়েদের পড়তে নেই।

শুনে মাস্টারমশাই বললো, এখন থেকে তুই ক্লাসের ভেতর এসে বসবি। তোর বইখাতা সব আমি দেব। আর তোর বাবার সংগেও কথা বলবো।

সেই থেকে মেয়েটি রোজ ছাগল আর বই খাতা নিয়ে স্কুলে আসে, মাঠে ছাগল ছেড়ে দিয়ে ক্লাসে আসে, তারপর স্কুল ছুটির পর ছাগল নিয়ে বাড়ি যায়।। এই করে মেয়েটি প্রাইমারী স্কুল শেষ করে।

এরপর মাস্টার মশাইয়ের সাহায্যে পায়ে হেঁটে পাঁচ মাইল দূরে সদর হাইস্কুলে যায়।

তারপর হাইস্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তি হয় এবং গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়িয়ে কলেজের খরচ চালায়। অবশেষে সে হয়ে উঠে ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার (বি-ডি-ও) । তার নাম লক্ষ্মীমণি হেব্রম।

ওকে নিয়ে ফিল্ম ডিভিশন একটা স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবি বানায়। তাতে আমি লক্ষ্মীমণি হেব্রমের চরিত্রে অভিনয় করি।

লক্ষ্মী আর ফুলি, এরা কি নৌবাহিনীর ঐ বিজয়িনীদের বা বায়ুসেনার ফাইটার পাইলটদের থেকে কোনো অংশে কম?

(শ্রীলা মজুমদার একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী যিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় সিনেমা নিয়ে লেখা-লেখি করেছেন।)

সম্পর্কিত বিষয়

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর