ভারতে পুলিশের এনকাউন্টারে যে মৃত্যু নিয়ে তোলপাড় চলছে

বন্দুকযুদ্ধের পর অস্ত্র উদ্ধার করছে পুলিশ। ছবির কপিরাইট Hindustan Times
Image caption বন্দুকযুদ্ধের পর অস্ত্র উদ্ধার করছে পুলিশ।

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার সিনিয়র একজন কর্মীকে পুলিশ মাঝরাতে রাস্তায় গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনা নিয়ে ভারতে এখন তোলপাড় চলছে।

ওই ব্যক্তি নাকি দু'জন পুলিশ-কর্মীর মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে তাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, তাই আত্ম-রক্ষার্থে গুলি চালায় - এমনটাই বলা হয়েছিল প্রথমে।

সেই সূত্রেই এমন এক তথ্য সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে গত ২০ বছরে এক হাজারেরও বেশী মানুষ পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুক-যুদ্ধ বা এনকাউন্টারে মারা গেছেন।

এনকাউন্টারে মৃত্যুর দেশব্যাপী পরিসংখ্যান প্রায় তিন হাজার।

মানবাধিকার কর্মী আর আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কথিত এনকাউন্টার-মৃত্যু আসলে বিচার-বহির্ভূত হত্যা।

উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্ণৌতে কয়েকদিন আগে পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন অ্যাপেল স্টোরের ম্যানেজার বিবেক তিওয়ারী।

তার বিধবা স্ত্রী কল্পনা তিওয়ারী প্রশ্ন তুলেছিলেন, "পুলিশ বলেছিল গাড়ি থামাতে, তা-ও যদি সে না থামিয়ে থাকে, গ্রেপ্তার করা হল না কেন! যে নারীর সঙ্গে অনৈতিক অবস্থায় ছিল বলে সন্দেহ করেছিল পুলিশ, তিনি আমার স্বামীর সহকর্মী। রাত হয়ে যাওয়ায় তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। যদি মেনেও নিই সে অনৈতিক কিছু করছিল, সেটা কি সরাসরি বুকে গুলি চালানোর মতো অপরাধ?"

পুলিশ পরে অবশ্য স্বীকার করেছে, যে পুলিশ কর্মী গুলি চালিয়েছিলেন। তার পিস্তলটিও বেআইনি ছিল।

এই ঘটনাটা নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়েছে, কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, গত ২০ বছরে শুধু ওই উত্তরপ্রদেশ রাজ্যেই এক হাজারেরও বেশী মানুষ এনকাউন্টারে মারা গেছেন।

সারা দেশে যত মানুষ এনকাউন্টারে মারা গেছেন, তার ৩৪ শতাংশই ওই একটা রাজ্যে।

মানবাধিকার সংগঠন রাইটস এন্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপ বলছে, এনকাউন্টারে মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯৮-৯৯ সালে ৮৫টি কথিত এনকাউন্টার মৃত্যু হয়েছিল, ২০১৭-১৮ সালে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ১৫৫-তে।

রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপের পরিচালক সুহাস চাকমা বলেছেন, "এই ঘটনাগুলো প্রায় সবই বিচার বহির্ভূত হত্যা।"

"পুলিশ সবসময় বলে থাকে ওদের ওপরে হামলা করার পরেই নাকি তারা একমাত্র গুলি চালায়। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। শুধু উত্তরপ্রদেশের কথাই যদি ধরা যায়, সেখানে তো কোনও জঙ্গি কার্যকলাপ নেই, তাহলে কারা পুলিশকে আক্রমণ করছে? এটা যদি কাশ্মীর হতো বা উত্তরপূর্বাঞ্চল হতো বা মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা হত, একটা যুক্তি থাকত। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে কেন সবচেয়ে বেশি এনকাউন্টার হবে?"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

আরো পড়তে পারেন:

কয়েকটি গ্রামের নারীদের সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে মোবাইল অ্যাপ

মোবাইলের সামনে শিশুদের কত সময় থাকা উচিৎ?

অল্পের জন্য সংঘর্ষ এড়ালো চীনা ও মার্কিন রণতরী

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে যে পরিসংখ্যান জমা পড়েছে, সেটাও যে সম্পূর্ণ নয়, তা বোঝাই যায়, কারণ ২০ বছরে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে এনকাউন্টারে মাত্র দশজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, আবার দিল্লিতে ৬৪টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এনকাউন্টারে মৃত্যুর সংখ্যার বিচারে কাশ্মীরের পরই আসামের স্থান।

কলকাতার ন্যশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক সরফরাজ আহমেদ খান বলছিলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশকে গুলি চালানোর অধিকার দিয়েছে আইন।

তিনি বলেন, "এনকাউন্টার বলে পৃথক কোনও শব্দ নেই। তবে দুটোভাবে এর স্বপক্ষে যুক্তি দেওয়া যেতে পারে আইন অনুযায়ী।"

"প্রথমত, পুলিশের ওপরে যদি কোনও দুষ্কৃতি গুলি চালায়, এবং সেই আক্রমণের ফলে পুলিশের মৃত্যু হতে পারে, তাহলে আত্ম-রক্ষার্থে গুলি চালানো যায়। দ্বিতীয়ত আইন বলে দিয়েছে পুলিশ কোন কোন ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ করতে পারবে। সেখানেও কিন্তু প্রতিপক্ষ কীভাবে আক্রমণ করছে, তার ওপরেই কিন্তু নির্ভর করছে পুলিশ কতটা বলপ্রয়োগ করবে," বলেন মি. খান।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এনকাউন্টারে মৃত্যুর তদন্ত হয়তো শুরু হয়, কিন্তু নিহতের পরিবার সুষ্ঠু বিচার পায় না।

সুহাস চাকমার কথায়, বিচার বা তদন্তের ক্ষেত্রে প্রথম যেটা প্রয়োজন, তা হল সাক্ষী। কিন্তু সেটাই পাওয়া যায় না।

"এমন সময়ে প্রায় প্রতিটি এনকাউন্টার হয়, বা যে জায়গায় হয়, সেখানে কোন সাক্ষীই থাকে না। উত্তরপ্রদেশের কথাই যদি ধরি, অনেকগুলো তথাকথিত এনকাউন্টার হয়েছে ভোর চারটে থেকে ছটার মধ্যে। চারপাশে কোনও সাক্ষী নেই। পুলিশই সাক্ষ্য দেয়। তাহলে ন্যায় বিচার কীভাবে আশা করবেন আপনি?"প্রশ্ন মি. চাকমার।

সরফরাজ আহমদ খান বলছেন, "একদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্র-যন্ত্রেরই একটা অংশ হত্যা করছে, আবার তাদেরই অন্য একটি অংশ সঠিক তদন্ত করবে, এটা কি আশা করা যায়?"

"হত্যার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সে তো রাষ্ট্র-যন্ত্রের অংশ। আবার তদন্তকারীও পুলিশ অফিসার, বিচারের ক্ষেত্রেও সরকারী উকিল - তিনিও রাষ্ট্রের অংশ। উল্টোদিকে নিহতের পরিবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রান্তিক মানুষজন। রাষ্ট্রের সঙ্গে তো অসম লড়াই লড়তে হচ্ছে তাকে," বলছিলেন মি. খান।

এনকাউন্টার মৃত্যু এবং তার সুষ্ঠু বিচার প্রসঙ্গে কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজী হন নি।

তবে পুলিশ সবসময়ে একটাই যুক্তি দিয়ে থাকে, যে নিহতেরা হঠাৎ করে পুলিশকে আক্রমণ করেছিল অথবা তারা পুলিশের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল, সেজন্যই গুলি চালাতে হয়েছে।

কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে কখন কোথায় এনকাউন্টার হবে, সেটা আগে থেকেই জেনে গিয়ে কী করে সংবাদমাধ্যমকে খবর দিয়ে দেয় পুলিশ?

এই প্রশ্নের জবাব কখনই পাওয়া যায় না....