বাংলাদেশে চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রস্তাবে সরকারের অনুমোদন

কোটার কারণে মেধাবীরা সুযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছিলেন বিক্ষোভকারীরা ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption কোটার কারণে মেধাবীরা সুযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছিলেন বিক্ষোভকারীরা

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলে সচিব কমিটির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারের মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকারি চাকরির একাংশ অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য বাতিল করা হয়েছে। তবে নিচের দিকের পদের জন্য এই কোটা পদ্ধতি বহাল থাকবে।

"আমরা আজ কালের মধ্যেই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিবো। তারপরেই জনপ্রশাসন প্রজ্ঞাপন জারী করবে। ওই দিন থেকেই এটি কার্যকর হবে," বলেন মিঃ আলম।

তবে কোটা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলনকারীদের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহবায়ক হাসান আল মামুন জানিয়েছেন, সচিব কমিটির সুপারিশগুলো বিস্তারিত দেখে তারা তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

আরো পড়ুন:

কোটা সংস্কার: আন্দোলনের নেপথ্যে কী ঘটছে

যে কারণে কোটা আন্দোলন নিয়ে আবার উত্তেজনা

কোটা বাতিল হয়ে গেছে, আর হা-হুতাশ নয়: শেখ হাসিনা

গ্রেফতার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন 'কোটা' নেতারা

যেভাবে দানা বাঁধে কোটা আন্দোলন

মূলত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন জোরালো হতে শুরু করে যা এপ্রিলে এসে তীব্র হয়ে ওঠে।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের নিয়মিত সংঘর্ষ হতে শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় উপাচার্যের বাসভবনে ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে।

ওই ঘটনার পর ব্যাপক পুলিশ অভিযান চালানো হয় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption কোটা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

এ আন্দোলনের মুখেই গত ১১ই এপ্রিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যদিও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।

তবে গত ১২ই জুলাই তিনি আবার সংসদে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ থাকায় সেটি সরকারের পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

এরপর তা নিয়ে আবারো বিতর্ক তৈরি হয়।

এরপর আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে।

কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে 'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ' নামে ১৭১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

এই কমিটির আহবায়ক ছিলেন হাসান আল মামুন। আর বাকি ১৭০ জনই যুগ্ম আহবায়ক। তাদের সাতজনই পরে আটক হয়ে জেলে গিয়েছিলেন। তারা এখন জামিনে রয়েছেন।

Image caption ব্যানার এভাবে দাবি তুলে ধরেছিলেন আন্দোলনকারীরা

সচিব কমিটি গঠন

বছরের শুরু থেকে কয়েকমাস ধরে নানা কর্মসূচি পালনের পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে কোটা সংস্কারের জন্য মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমকে আহবায়ক করে ২রা জুলাই সাত সদস্যের সচিব কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

ওই কমিটিকে প্রথমে পনের দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও পরে সে সময় বাড়ানো হয়।

পরে গত ১৩ই অগাস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে জানান যে সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা তুলে দিয়ে মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে সুপারিশ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

গত ২৬শে সেপ্টেম্বর কোটা পর্যালোচনা কমিটির মুখপাত্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিধি) আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন সচিব কমিটির সুপারিশ আজকের মন্ত্রীসভা বৈঠকে তুলে ধরার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সরকারি চাকরিতে কোটা কতটা?

বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে এখন সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা রয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা পুরো কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করলেও কোটার একটি বড় অংশ, অর্থাৎ ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য সংরক্ষিত থাকায় সেটিই সবচেয়ে বেশী আলোচনায় এসেছে।

এর বাইরে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, অনগ্রসর জেলার বাসিন্দাদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য এক শতাংশ কোটা বর্তমান ব্যবস্থায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

এই ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতেই বেশ কয়েক মাস ধরে আন্দোলন করেছিলো শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারীদের দাবি কী ছিলো?

'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ'এর ব্যানারে যে পাঁচটি বিষয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে সেগুলো হল -

  • কোটা-ব্যবস্থা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা (আন্দোলনকারীরা বলছেন ৫৬% কোটার মধ্যে ৩০ শতাংশই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ। সেটিকে ১০% এ নামিয়ে আনতে হবে)
  • কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া
  • সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়স-সীমা- ( মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরীর বয়স-সীমা ৩২ কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০। সেখানে অভিন্ন বয়স-সীমার দাবি আন্দোলনকারীদের।)
  • কোটায় কোনও ধরনের বিশেষ পরীক্ষা নেয়া যাবে না ( কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকরির জন্যে আবেদনই করতে পারেন না। কেবল কোটায় অন্তর্ভুক্তরা পারে)
  • চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।