শান্তি পুরষ্কারের জন্য ইয়াজিদি নারী নাদিয়া মুরাদ আর রেপ সার্জন ডেনিস মুকওয়েগেকে কেন বেছে নিল নোবেল কমিটি?

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে মিস মুরাদ এবং ডা. মুকওয়েগে 'গুরুত্বপূর্ণ অবদান' রেখেছেন: নোবেল কমিটি। ছবির কপিরাইট EPA
Image caption নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে মিস মুরাদ এবং ডা. মুকওয়েগে 'গুরুত্বপূর্ণ অবদান' রেখেছেন: নোবেল কমিটি।

চলতি বছর যারা নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছেন তাদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইস্যুটি আবার সামনে চলে এসেছে।

শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী নাদিয়া মুরাদ এবং ডেনিস মুকওয়েগে দুজনেই সংঘাতের সময় ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন।

মিস মুরাদ একজন ইরাকি ইয়াজিদি যাকে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা ধর্ষণ ও নির্যাতন করেছিল। পরে তিনি ইয়াজিদিদের মুক্তির প্রতীকে পরিণত হন।

ডা. মুকওয়েগে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের একজন গাইনোকলজিস্ট।

তিনি এবং তার সহকর্মীরা মিলে হাজার হাজার ধর্ষিতা নারীর চিকিৎসা করেছেন।

চলতি বছর ৩৩১ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয়া হয় এবং তাদের মধ্য থেকে নোবেল কমিটি এই দুজনকেই পুরষ্কারের জন্য বেছে নেয়।

নাদিয়া মুরাদ এবং ডেনিস মুকওয়েগেকে পুরষ্কার-বিজয়ী ঘোষণা করে নোবেল কমিটির প্রধান বেরিট রিস-অ্যান্ডারসেন বলেন, "ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাদের প্রচেষ্টার জন্য দু'জনকে এই পুরষ্কার দেয়া হয়েছে।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption নাদিয়া মুরাদ ইরাকের ইয়াজিদি জনগণের মুক্তির প্রতীকে পরিনত হয়েছেন।

আরও পড়তে পারেন:

মিরসরাইয়ে বিস্ফোরণে দু'জন নিহত, র‍্যাব বলছে জঙ্গি

মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার একের পর এক অভিযোগ আসছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে

নোবেল শান্তি পুরষ্কার ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে মনে করেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিন।

"এই পুরষ্কারের মাধ্যমে এই অপরাধ শুধু স্বীকৃতিই পাবে না," তিনি বিবিসিকে বলেন, "এর মাধ্যমে এই ইস্যুটিতে সারা বিশ্বের নজর পড়বে এবং ধর্ষণের শিকার নারীদের বেদনা সবাই উপলব্ধি করতে পারবে।"

এই বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ এবং সর্ব-সম্প্রতি মিয়ানমারের মতো দেশে যারা আন্দোলন করছেন তারাও অনুপ্রাণিত হবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং দু'লক্ষেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব ধর্ষণের জন্য যারা দায়ী তাদের বিচারের দাবি নিয়ে আন্দোলন চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

কিন্তু এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে কী সারা বিশ্বে সংঘাতের সময় ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার রোধে কোন আইন তৈরি সম্ভব হবে?

ড. জিয়াউদ্দিন মনে করছেন, সেটা হলেও যে কালই হবে, এমন সম্ভাবনা নেই।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ডা. মুকওয়েগে কঙ্গোতে হাজার হাজার ধর্ষিতা নারীকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।

তবে নোবেল পুরষ্কারের মধ্য দিয়ে এবিষয়ে আন্দোলন আরও বেগবান হবে এবং বিশ্বের বিবেক নড়েচড়ে বসবে।

"যে অপরাধগুলো মামলার পর্যায়ে রয়েছে, বা যেগুলো নিয়ে মামলা হতে পরে, প্রতিটা ক্ষেত্রেই সেসব অপরাধের যে একটা জেন্ডার আসপেক্ট (লিঙ্গ বৈশিষ্ট্য) রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এখন প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই তা বিবেচনা করছে।"

যৌন-দাসী হিসেবে নাদিয়া মুরাদকে বিক্রি করা হয়

ইরাকে যুদ্ধ চলার সময় নাদিয়া মুরাদকে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা তিন মাস আটকে রাখে এবং যৌন-দাসী হিসেবে ব্যবহার করে।

এসময় তার ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হয় এবং দাসী হিসেবে বেশক কয়েকবার তাকে বিক্রি করা হয়।

দু'হাজার চৌদ্দ সালের নভেম্বর মাসে আইএস-এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নাদিয়া মুরাদ ইয়াজিদি জনগণের মুক্তির আন্দোলনে সামিল হন।

তিনি মানব পাচারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। এবং ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে কঠোর শাস্তির দাবি জানাতে থাকেন।

Image caption বিবিসির সাংবাদিকরে সাথে নাদয়িা মুরাদের সাক্ষাতকারের ওপর টুইটার পোস্ট।

বিবিসি ফারসি বিভাগের সাংবাদিক নাফিসা কো‌নাভার্দ ইসলামিক স্টেট-এর হাত থেকে মুক্তির কিছুদিন পর নাদিয়া মুরাদের সাথে দেখা করেন।

সেদিনের সেই সাক্ষাতের একটি ছবি তিনি টুইটারে পোস্ট করেন।

সেখানে সাক্ষাৎকারে তার পরিচয় প্রকাশ করা হবে কি না, তা জানতে চাইলে মিস মুরাদ বলেছিলেন: "না, আমি চাই সারা বিশ্ব দেখুক আমাদের কী হাল হয়েছে।"

নাদিয়া মুরাদ ২০১৬ সালে ভাকলাভ হাভেল মানবাধিকার পুরষ্কারও অর্জন করেন। পরের বছর তিনি মানব পাচারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত পদে মনোনীত হন।

রেপ সার্জন ডেনিস মুকওয়েগে ৩০,০০০ ধর্ষিতার সেবা করেছেন

ডেনিস মুকওয়েগে কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ধর্ষিতা নারীদের সেবা দিয়ে আসছেন।

তিনি এবং তার সহকর্মীরা এপর্যন্ত ৩০,০০০ ধর্ষিতা নারীর চিকিৎসা করেছেন।

ধর্ষণের সময় একজন নারীর দেহে যেসব ক্ষত তৈরি হয় তার চিকিৎসার জন্য ডা. মুকওয়েগেকে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।